কুরবানীর হুকুম, গুরুত্ব ও ফজিলত

1
117

কুরবানী পৃথিবীর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাছাড়া কুরবানীর বিধান ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ আমল। যে আমল আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে চলে এসেছে। সূরা মাইদায় আদম আলাইহিস সালাম এর দু’সন্তানের কুরবানীর কথা এসেছে। তবে একেক নবীর শরীয়তে কুরবানীর বিধানে কিছুটা ভিন্নতা ছিল।

আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানী বলা হয়, আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার আশায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কুরবানীর নিয়তে উট, গরু-মহিষ ও ছাগল-ভেড়া জবাই করা। নিয়ত খালেছ করে শুধু আল্লাহর জন্য কুরবানী করা। কারণ আল্লাহ তায়ালার কাছে শুধু বান্দার তাক্কওয়াটাই পৌঁছাবে। পশুর গোশত, রক্ত আল্লাহ তায়ালার নিকট পৌঁছায় না। এ ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,

لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ سَخَّرَهَا لَکُمۡ لِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰی مَا هَدٰىکُمۡ ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۳۷﴾
”আল্লাহর কাছে কখনোও এগুলির গোশত এবং রক্ত পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া; এভাবে তিনি এগুলিকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এই জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আর সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদেরকে।”

হাদিসে কুরবানীর অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কুরবানীকারী কুরবানীর পশুর পশমের সমপরিমাণ সওয়াব অর্জন করে থাকনে। হাদিসে এসেছে-
যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, সাহাবায়ে কেরাম একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কুরবানী কী?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত। তাঁকে আবারো জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতে আমাদের কি সাওয়াব রয়েছে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, ‘কুরবানীর পশুর প্রতিটি লোমের পরিবর্তে নেকি রয়েছে।’ তাঁরা আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, ’পশম বিশিষ্ট পশুর বেলায় কী হবে? নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘পশমওয়ালা পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকি রয়েছে।’ সুবহানাল্লাহ! -মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ, হাদিস :২/৩১২৭।

ইসলামী শরীয়তে কুরবানীর যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূল সূত্র মিল্লাতে ইব্রাহিমীতে বিদ্যমান ছিল। কুরআন মাজীদ ও সহীহ হাদিস থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। এজন্য কুরবানীকে ‘সুন্নতে ইব্রাহিমী’ নামে অভিহিত করা হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের মধ্যে এই ইবাদত ধারাবাহিক চলমান রয়েছে এবং প্রতিবছর ‘শিয়ার’রূপে তথা ইসলামের একটি প্রকাশ্য ও সম্মিলিতভাবে আদায়যোগ্য ইবাদত হিসেবে আদায় করা হয়।

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দু’টি দুম্বা জবাই করেছেন। জবাইয়ের সময় সেগুলোকে কিবলামুখী করে বলেছেন-

اِنِّیْ وَجَّهْتُ وَجْهِیَ لِلَّذِیْ فَطَرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ حَنِیْفًا وَّ مَاۤ اَنَا مِنَ الْمُشْرِكِیْنَ اِنَّ صَلَاتِیْ وَ نُسُكِیْ وَ مَحْیَایَ وَ مَمَاتِیْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ لَا شَرِیْكَ لَهٗ ۚ وَ بِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ ، بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبرُ، اَللّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَّأُمَّتِهِ.
-সুনানে আবু দাউদ ৩/৯৫, হাদিস : ২৭৯৫; মুসনাদে আহমদ ৩/৩৭৫ হাদিস : ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস : ২৮৯৯

কুরবানীর শুরুতে তাঁর এই আয়াত ও দুআ পড়া থেকে প্রমাণ হয় কুরবানী খালিছ ইবাদত।

সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসের কিতাবে বহু সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহার দিন নামায পরবর্তী খুতবায় বলেছেন, এই দিনের প্রথম কাজ হল সালাত আদায় করা এরপর নহর তথা কুরবানী করা। যে সালাত আদায়ের পর নুসুক তথা কুরবানী করল তার নুসুক পূর্ণ হল এবং সে মুসলিমদের পথ অনুসরণ করল। আর যে সালাতের আগে যবেহ করল সেটা তার গোশতের প্রয়োজন পূরণ করবে, কিন্তু ‘নুসুক’ হিসেবে গণ্য হবে না।’

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم، إنه ليأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها، وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض، فطيبوا بها نفسا.

কুরবানীর দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানী করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কুরবানীকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানী কর। – জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৪৯৩

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে কঠোর ধমকি এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من وجد سعة لأن يضحي فلم يضح فلا يقربن مصلانا.

‘যার কুরবানীর সামর্থ্য আছে তবুও সে কুরবানী করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুসনাদে আহমদ ২/৩২১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৭৬৩৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত কুরবানী করেছেন, কোনো বছর বাদ দেননি। এমনকি তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আদেশ করেছেন যেন ইন্তেকালের পরেও তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করা হয়। আলী রা. প্রতি বছর নিজের কুরবানীর সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী করতেন। -মুসনাদে আহমদ হাদিস ৮৪৩, ১২৭৮, আবু দাউদ হাদিস ২৭৮৭

সুতরাং ঈদুল আযহা মুসলমানদের আনন্দের দিন। আরাফা দিবসের ব্যাপক মাগফিরাত, আল্লাহর দরবারে কুরবানী পেশ করার সৌভাগ্য এবং আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া কুরবানী থেকে মেহমানদারী লাভ ওই আনন্দের কারণ। এই তাৎপর্য অনুধাবন করে আল্লাহর জন্য কুরবানী দেয়া। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সামর্থ্যবানকে খালেছ নিয়তে কুরবানী করার তৌফিক দান করুন। কুরবানীর ফজিলত ও সওয়াব পাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন!

১টি মন্তব্য

  1. আসসালামু আলাইকুম,
    মুহতারাম ভাইয়েরা কেমন আছেন, আশাকরি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে সুস্থ ও নিরাপদে আছেন,
    মুহতারাম? গত কয়েকদিন থেকে আমাদের Dawahilallah ফোরামে কোনভাবেই ঢুকতে পারছিলাম ন,এমন কি আইপি এড্রেস দিয়েও না,
    প্রথমে ভেবেছিলাম যে,হয়ত আমার সমস্যা, কিন্তু এখন দেখি যে কোনভাবেই ঢুকা যাচ্ছিলো না..

    ফোরামের কি কোন সমস্যা হয়েছে ভাই ..?
    আশাকরি মেইলে রিপ্লাই দিবেন, ইনশাআল্লাহ.

    আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সবাইকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখুক…

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধফটো রিপোর্ট || আফগান জনগনের নিরাপদ ঈদ উদযাপনে সতর্ক অবস্থানে তালিবান
পরবর্তী নিবন্ধফটো রিপোর্ট || মালির উত্তরাঞ্চলে মুজাহিদদের সামরিক প্রশিক্ষণের দৃশ্য