
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপির উত্থান কেবল একটি রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখলের লড়াই নয়। এটি মূলত এই অঞ্চলের তাওহিদপন্থী মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এক গভীর, সুদূরপ্রসারী এবং আদর্শিক যুদ্ধের নীল নকশা। হিন্দুত্ববাদী দর্শনের মূলে যে ‘অখণ্ড ভারত’ বা আর্যাবর্তের বিষাক্ত কল্পনা প্রোথিত রয়েছে, তার প্রধান অন্তরায় হলো এই জনপদের কয়েক কোটি মুসলিমের অটল ঈমানি উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা মুসলিমদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যখন উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও শুভেন্দু অধিকারীর মতো কট্টরপন্থী নেতৃত্বের আসীন হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়, তখন বুঝতে হবে এটি মূলত সেই ‘অখণ্ড ভারত’ মিশনেরই একটি আগ্রাসী ও সামরিক ধাপ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় তিন কোটি মুসলিমের ওপর আজ যে নাগরিকত্ব হরণের খড়গ ঝুলছে, তা মূলত আসামের অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর এক জঘন্য অপচেষ্টা। এনআরসি (NRC) এবং সিএএ (CAA)-এর মতো বৈষম্যমূলক আইনগুলো কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এগুলো হলো পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন যাযাবরে পরিণত করার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। শরীয়াহর অকাট্য মানদণ্ডে, কোনো মুসলিমকে তার ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা কিংবা তার ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার হরণ করার চেষ্টা করা এক চরম পর্যায়ের ‘ফিতনা’ ও ‘জুলুম’। সুতরাং, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং এটি উম্মাহর আকিদা ও অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ঘোষিত একটি প্রকাশ্য যুদ্ধ। এই জুলুমের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং মাজলুমের পাশে থাকা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরজ।
এই আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী অপশক্তির আস্ফালন কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ মুসলিমদের জন্যই বিপজ্জনক নয়, বরং এটি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর এক বিশাল অশনি সংকেত। হিন্দুত্ববাদী শক্তির হোতারা যখন প্রকাশ্য জনসভায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করে কিংবা এদেশ থেকে গণ-আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতার মসনদে বসানোর স্বপ্ন দেখে, তখন তা আর নিছক রাজনৈতিক বক্তৃতা থাকে না। এটি মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মানচিত্র ও রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর এক সরাসরি কুঠারাঘাত। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে হিন্দুত্ববাদীদের একটি করদরাজ্য বা সেবাদাস রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং এই জনপদ থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলা। যখন সীমানার ওপার থেকে বাংলাদেশের সীমানা মুছে দেওয়ার স্লোগান ওঠে, তখন বুঝতে হবে শত্রুর টার্গেট কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়, বরং তাদের মূল টার্গেট হলো এদেশের তাওহীদি জনতা ও মুসলিম মিল্লাত।
মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের ন্যায়—যার এক অংশে ব্যথা হলে পুরো শরীর তা অনুভব করে। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের যে কৃত্রিম দেয়াল দিয়ে আমাদের বিভক্ত করে রাখা হয়েছে, তা মূলত ঈমানি ঐক্যকে দুর্বল করার এক শয়তানি চাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মুমিনদের ‘এক জাতি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং, পশ্চিমবঙ্গের মাজলুম মুসলিমের রক্ত আর বাংলাদেশের মুসলিমের অস্তিত্ব এক ও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। জাতীয়তাবাদের ভ্রান্ত ও সংকীর্ণ আকিদা থেকে বের হয়ে আজ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, শত্রু যখন মুসলিম নিধনের নীল নকশা তৈরি করে, তখন তারা কোনো পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে না, বরং তারা আমাদের শুধুমাত্র মুসলিম আইডেনটিটি দেখে। তাই এই কৃত্রিম কাঁটাতারের বেড়া মানসিক ও আদর্শিকভাবে উপড়ে ফেলে তাওহিদের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং শত্রুর প্রতিটি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সীসাঢালা প্রাচীর গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, জালিম ও কুফরী শক্তির সামনে মস্তক অবনত করা বা তাদের আধিপত্য মেনে নেওয়া মূলত ঈমানি পরাজয় ও আত্মসমর্পণের শামিল। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে কাফের ও জালিম শক্তির মোকাবিলায় সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি সঞ্চয় এবং ‘ইদাদ’ বা সর্বাত্মক প্রস্তুতির যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য। বর্তমান এই ভয়াবহ সংকটময় মুহূর্তে বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক, মানসিক, সামরিক এবং ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়া ফরজ। শত্রুর মোকাবিলায় সম্ভাব্য সকল প্রকার কৌশলগত ও প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছাড়া এই আধিপত্যবাদী উগ্র অপশক্তিকে থামানো সম্ভব নয়।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশ আজ যে উগ্রবাদী কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, তা থেকে বাংলাদেশও নিরাপদ নয়। এই আগ্রাসন রুখতে হলে কেবল মৌখিক বা লেখনীর প্রতিবাদই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন ঈমানি চেতনায় শাণিত চূড়ান্ত ও সম্মিলিত প্রতিরোধ। আজ যদি আমরা পশ্চিমবঙ্গের মাজলুম ভাইদের রক্ষায় এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে মাজলুমদের কাঠগড়ায় এবং মহান রবের দরবারে আমাদের চরম জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং, তাওহিদের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখতে এবং কুফরি শক্তির দর্প চূর্ণ করতে ইদাদ ও ঈমানি প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। এটিই উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র পথ।


