
অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে গত ৩৭ বছরে দখলদার ভারতীয় বাহিনীর হেফাজতে নিখোঁজ হয়েছে হাজারও কাশ্মীরি। আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে নিখোঁজদের স্বজনেরা।
৩০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দখলদার ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর বিশ্বে সামরিক উপস্থিতি থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। অঞ্চলটিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে দখলদার ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। ১৯৮৯ সাল থেকে ভারতীয় বাহিনীর হেফাজতে অন্তত ৮ হাজার কাশ্মীরি নাগরিক নিখোঁজ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অসংখ্য গুম ও নিখোঁজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে স্থানীয় বাসিন্দা, একাধিক মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ।
কাশ্মীরের বিরুদ্ধে দখলদার ভারতীয় সরকারের একটি নীতি হলো সামরিক অভিযান জোরদার করা, হেফাজত ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’র আড়ালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানো। এছাড়া কাশ্মীরের অধিকাংশ নাগরিক মুসলমান হওয়ায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী আদর্শ লালনকারী ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার তাদের দমন-পীড়ন আরও বৃদ্ধি করেছে।
দখলদার বাহিনীর বিশেষ নজরদারি ও অভিযানের অন্যতম প্রধান টার্গেট হলো কাশ্মীরি তরুণেরা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তাদের স্বজনেরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কোনও সুরাহা পাননি। নিখোঁজদের অনেকেই পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তাই এসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনা শুধু ভুক্তভোগীর পরিবারকেই নয়, পুরো সমাজের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। ভারতীয় সামরিক বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী, বিশেষ টাস্কফোর্স এবং সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় হাজারও পরিচয়বিহীন কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয় অনুসন্ধান ও অধিকারকর্মীদের তদন্তে উঠে এসেছে, এসব কবরের অনেকগুলোই নিখোঁজ স্থানীয় বাসিন্দাদের হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
‘অর্ধবিধবা’ এবং ‘অর্ধ-এতিম’
দীর্ঘদিন ধরে চলা গুমের ঘটনা কাশ্মীরে নতুন সামাজিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘হাফ-উইডো’ বা ‘অর্ধবিধবা’ এবং ‘হাফ-অরফান’ বা ‘অর্ধ-এতিম’। স্বামী বা পিতার কোনও সন্ধান না পাওয়ায় বহু নারী ও শিশু বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু বিতর্কিত কঠোর আইনি ব্যবস্থার কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনও বিচার পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের স্বজনেরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি, রাস্তা কিংবা বিভিন্ন স্থান থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, অতঃপর তাদেরকে ভারতীয় বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে তাদের আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
২০১৯ সালের পর নিখোঁজ নারী ও কিশোরীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
২০১৯ সালে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরে নারী ও কিশোরীদের নিখোঁজের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জম্মু ও কাশ্মীরে প্রায় ১০ হাজার নারী ও কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে দখলকৃত জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৯ হাজার ৭৬৫ জন নারী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরীর সংখ্যা ১ হাজার ১৪৮।
১৯৯৭ সালে নিখোঁজ ব্যক্তির মৃত্যু সনদ দেওয়ার নির্দেশ
১৯৯৭ সালে সামরিক হেফাজত থেকে নিখোঁজ হওয়া আবদুল রশিদ ওয়ানির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু সনদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় একটি আদালত। চলতি বছরের জুলাইয়ে আদালত এই নির্দেশ দেয়। আদালত জানিয়েছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা তাকে হেফাজতে হত্যা করেছিল বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নিখোঁজের প্রায় ২৯ বছর পার হওয়ার পর আদালত এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। আইনের এত দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সমালোচকগণ।
২০২৬ সালে কুলগামে তিন যুবক নিখোঁজ
চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি কুলগাম জেলার কাজিগুন্ড এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ(২৫), শওকত আহমেদ(১৮) এবং মুখতার আহমেদ (২৪) একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বের হন। তারা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পূর্বেই নিখোঁজ হন।
এক মাস পর কুলগাম জেলার একটি খালের কাছ থেকে রিয়াজ ও শওকতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানটি তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। তাদের বাবা আল-জাজিরাকে বলেন, এটি কোনও দুর্ঘটনা ছিল না; বরং তার ছেলেদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
অবশ্য নিখোঁজ মুখতার আহমেদের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের মার্চে কাঠুয়ায় মোহাম্মদ দীন ও রেহমান আলী নামে আরও দুই কিশোর নিখোঁজ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুজ্জর সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক
কাশ্মীরের প্রত্যন্ত এলাকা বিশেষত গুজ্জর সম্প্রদায়ের মধ্যে দখলদার সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘিরে গভীর আতঙ্ক রয়েছে।
২০২০ সালে রাজৌরি জেলায় তিন তরুণ গুজ্জর শ্রমিককে অপহরণ ও হত্যা করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা। পুলিশ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় এবং তিন শ্রমিককে সাজানো বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করার অভিযোগ আনে। পরবর্তীতে সামরিক আদালত ওই কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সুপারিশ করে। তবে সর্বশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে আর্মড ফোর্সেস ট্রাইব্যুনাল ওই সাজা স্থগিত করে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে জামিন দেয়।
আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি
কাশ্মীরের বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেছে, ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরে বিভিন্ন বিতর্কিত কঠোর আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
এএফএসপিএ আইন অনুসারে, ‘অশান্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত অঞ্চলে সামরিক সদস্যদের ব্যাপক ক্ষমতা ও আইনি সুরক্ষা রয়েছে। এই আইনি কাঠামো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়াকে কার্যত কঠিন করে তুলছে। এ আইনের আওতায় ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরিদের তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং এমনকি হত্যা করতেও পরোয়া করছে না।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে কাশ্মীরিদের গুমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ভারতীয় সেনাদের আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানিয়েছে কাশ্মীরের বিভিন্ন সংগঠন।
সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ভারতীয় হেফাজতে নিখোঁজ হওয়া হাজারও কাশ্মীরির অবস্থান শনাক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে এবং তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হবে।
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/4m2j8nz4


