
পতিত স্বৈরাচার হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালেও তার আমলে গড়ে ওঠা ইসলামবিদ্বেষী সিস্টেম ও মুসলিমবিরোধী ন্যারেটিভ এখনও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়। সুযোগ পেলেই সেই ন্যারেটিভের অনুসারীরা মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, এমনকি তাদের হেয় করারও চেষ্টা করছে!
এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব কোনো কারণ ছাড়াই ক্লাসে নেকাব পরিহিত এক শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে মন্তব্য করে এবং এ সময় নেকাব পরা ওই ছাত্রী তাকে আক্রমণ করতে পারে দাবি করে শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে পেছনে বসতে বলে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও ওই শিক্ষিকার বাকবিতণ্ডা হয়। পরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ জানান।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সহপাঠী রাইসা মণি সুমি বুধবার নিজের ফেসবুক পোস্টে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ক্লাসের শুরুতে শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করে। একপর্যায়ে প্রথমে সামনের বেঞ্চে বসা নেকাব পরিহিত ওই শিক্ষার্থীর পর্দা নিয়ে মন্তব্য করে। ওই শিক্ষিকা বলে, পর্দা এভাবে করা হয় না এবং মুখ খোলা রাখা যায়; হাত-পা ঢাকার প্রয়োজন নেই। এরপর নেকাব পরা শিক্ষার্থী তাকে ‘ডিস্ট্র্যাক্ট’ করছে দাবি করে তাকে সামনে না বসে পেছনে বসতে বলে।
এ সময় রাইসা মণি সুমি এর প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থী তার নিজস্ব মাজহাব অনুযায়ী এভাবে পর্দা করতে পারেন। এতে তাসনীম সিরাজ তার ওপর চড়াও হয় এবং সে কোনো মাজহাব মানে না বলে মন্তব্য করে। তর্কের একপর্যায়ে ওই শিক্ষিকা দাবি করে, একটি বিতর্কে সে মাওলানা মামুনুল হককে বিতর্কে হারিয়েছে এবং সুমিকে তার সঙ্গে তর্ক না করতে বলে।
রাইসা মণি সুমি জানান, এরপর তাসনীম সিরাজ আবারও নেকাব পরিহিত শিক্ষার্থীকে পেছনে যেতে বললে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ আরও দুইজন শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে যান। পরে রাইসা মণি সুমি ওই শিক্ষার্থীর পর্দা করার অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় তাসনীম সিরাজ তাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কীভাবে ওকে সাপোর্ট করো? তুমি বলতে পারবা ও যে ফান্ডামেন্টালিস্ট না? ও সন্ত্রাসী না?’
ওই মন্তব্যের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। একপর্যায়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে ক্লাস বর্জন করেন।
রাইসা মণি সুমি আরও বলেন, নেকাব পরিহিত ওই শিক্ষার্থী ইংরেজি বিভাগে চার বছর অনার্স শেষ করে বর্তমানে মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারে রয়েছেন এবং ইতোমধ্যে নয়টি ভাইভা দিয়েছেন। পুরুষ শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও ভাইভায় তাকে মুখ দেখাতে বাধ্য করা হয়নি। এমনকি বিভাগের শিক্ষক অসীম দত্ত একটি ভাইভা থেকে নিজে বের হয়ে গিয়েছিলেন, যাতে ওই শিক্ষার্থী মুখ দেখিয়ে ভাইভা দিতে পারেন।
রাইসা মণি সুমি জানান, তাসনীম সিরাজ মাহবুব দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকক্ষে ধর্ম, নেকাব এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে এমন মন্তব্য করে আসছে, যা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে অপমানজনক ও কষ্টদায়ক। এমনকি তাসনীম সিরাজ মাহবুব ৫০ মিনিটের একটি ক্লাসের বড় একটি অংশ নিয়মিত পড়াশোনার বাইরের আলোচনা, নিজের প্রশংসা ও ব্যক্তিগত মতামত দিয়েই কাটিয়ে দেয়।
ঘটনার পর বিভাগের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছেন, তাসনীম সিরাজ মাহবুবের কোর্স পরিবর্তন করা হবে।
তবে রাইসা মণি সুমি আক্তার প্রশ্ন তোলেন, এত বছরের ‘বায়াসড’ ব্যবহারের শাস্তি কি শুধু এটুকুই? তার ভাষায়, ‘কত কত স্টুডেন্ট উনার ব্যবহারে কান্না করেছেন, হাল ছেড়ে দিয়েছেন—সেসবের কি কোনো মূল্য নাই?’
তথ্যসূত্র:
১। ঢাবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেকাব পরা ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী-সন্ত্রাসী’ বলার অভিযোগ
– https://tinyurl.com/4nvc5nrv


