
২০২৬ সালের ১ম ৭৪ দিনে (১ জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ) পুলিশি হেফাজতে ভারত জুড়ে ১৭০ জনের মৃত্যুর হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তথ্য প্রদান করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হেফাজতে মৃতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে এই সংক্রান্ত ১৪০টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৩-২৪, ২০২২-২৩ ও ২০২১-২২ সালে যথাক্রমে ১৫৭, ১৬৩ ও ১৭৬টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে হেফাজতে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারের প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় অধিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ।
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে পুলিশি হেফাজতে সর্বাধিক মৃত্যু ঘটেছে বিহার রাজ্যে (১৯টি), এছাড়া রাজস্থানে ১৮টি, উত্তর প্রদেশে ১৫টি এবং পাঞ্জাব, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে ১৪টি করে কেইস রেকর্ড হয়েছে। রাজধানী দিল্লিতে রেকর্ড হয়েছে ৪টি কেইস।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে তামিলনাড়ুতে ৭টি, তেলেঙ্গানায় ৫টি এবং কর্ণাটক ও কেরালায় ৩টি করে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৭টি এবং ওড়িশায় ৯টি পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসামে ৫টি এবং অরুণাচল প্রদেশে ৩টি। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং পুদুচেরিতে ১টি করে কেইস রেকর্ড হয়েছে।
অপরদিকে মিজোরাম, সিকিমের, লাদাখ ও অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে কোনও হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য প্রদান করা হয় নি। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকাশিত তথ্যে পূর্বের বছরগুলোর চলতি বছরে হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একাধিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে পুলিশি হেফাজতে মুসলিম, দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক/দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জনগণ অধিক পরিমাণে সহিংসতা, নির্যাতন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। এসবের পেছনে অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বিশেষত মুসলিমদের প্রতি পুলিশের শত্রুভাবাপন্ন আচরণ, অঞ্চলভিত্তিক বিদ্বেষ, আর্থিক কারণে ঘুষ প্রদান বা জামিন পেতে অক্ষমতা, ছোটখাটো অপরাধ সত্ত্বেও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পক্ষপাত, এবং আইনি সহায়তা ও মিডিয়ার মনোযোগের অভাব।
গ্লোবাল টর্চার ইনডেক্স ২০২৫: ইন্ডিয়া ফ্যাক্টশিট অনুসারে, গ্রেপ্তারের আগে ও গ্রেপ্তারের সময় উভয় ক্ষেত্রেই তথ্য আহরণের জন্য নিয়মিতভাবে মারধর ও হুমকির মতো অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতীয় পুলিশ।
এছাড়া ভারতীয় পুলিশ কর্মীদের ভারী বা হালকা অস্ত্রের ব্যবহারে গুরুতরভাবে আহত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ ভুক্তভোগী মুসলিম, দলিত, আদিবাসী, অভিবাসী শ্রমিক ও গৃহহীন ব্যক্তিসহ প্রান্তিক সম্প্রদায়ের জনগণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পুলিশের বৈষম্যমূলক ব্যবহারের মুখোমুখি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যাক্ত ভবন, সরকারী অফিস ও হোটেল কক্ষের মতো আন-অফিসিয়াল রুমকেও আটক কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি গ্রহণের সময় সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছে বন্দিরা।
পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কর্মীরা জানায়, শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনজনিত মৃত্যু এবং হাজার হাজার আহতের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণের ফলস্বরূপ সংঘটিত হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তাদের মতে, এই অভিযোগসমূহ ভারতের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সহিংসতার একটি চিত্র তুলে ধরেছে, যা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পদ্ধতিগতভাবেই চলছে।
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/e9v797h3


