
দেশের ব্যাংকগুলোয় অতিধনীদের আমানত রাখার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। এক বছর আগের তুলনায় গত ডিসেম্বর শেষে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত জমা থাকা ব্যাংক হিসাব ও স্থিতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব সংখ্যা ছিল ১৮৫টি। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের হিসাব সংখ্যা ১২০-এ নেমে আসে। হিসাব সংখ্যার চেয়েও অতিধনীদের আমানতের স্থিতি বেশি কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অতিধনীদের ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা আমানতের স্থিতি ছিল ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এক বছর পর ২০২৫-এর ডিসেম্বরে এসে এ স্থিতি না বেড়ে উল্টো ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নেমে গেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অতিধনীরা ব্যাংক খাত এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দৈনিক বণিক বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাতে জানায়, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় কোটিপতি বা ১ কোটি টাকার বেশি জমা রেখেছেন এমন ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যাংক হিসাব ছিল ৩৮ হাজার ৪৩৬টি। এগুলোয় জমা ছিল ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার আমানত, যা কোটি টাকার বেশি ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা অর্থের মাত্র ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর ২৫ কোটি বা তার চেয়ে বেশি টাকা জমা আছে এমন ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যাংক হিসাব ছিল মাত্র ১২০টি। অতিধনী হিসেবে পরিচিত এ ব্যাংক হিসাবগুলোয় ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা জমা ছিল।
ব্যাংকাররা বলছে, দেশের অর্থনীতির আকার ও ধনিক শ্রেণীর সংখ্যার বিপরীতে ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব সংখ্যা খুবই কম। আর অতিধনীদের বড় অংশ ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। আমানত হিসাবে টাকা না রেখে তারা জমি বা বাড়ি ক্রয়ের পাশাপাশি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেন। আবার ধনিক শ্রেণীর একটি অংশ উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। পাচারকৃত অর্থে বিলাসী জীবনযাপনের পাশাপাশি বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কিনছেন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্সসহ হয়রানির ভয়েও অতিধনীরা ব্যাংক এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ টাকা রাখলেও সেটি অনেক অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট ভাগ করে রাখেন। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যাংক খাতের সংকটও ধনিক শ্রেণীকে ব্যাংকবিমুখ করছে বলে মনে করছেন তারা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে জানায়, ‘বাংলাদেশ এখন ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ। এখানে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও প্রকট। কিন্তু আমরা ব্যাংক হিসাবের যে তথ্য দেখছি, তাতে সেটির বহিঃপ্রকাশ নেই। এত বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যক্তিশ্রেণীর মাত্র ১২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটি টাকার বেশি থাকবে—এটি অবিশ্বাস্য। তার মানে, অতিধনীরা ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। কিংবা একই ব্যাংক হিসাবে তারা বেশি টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন।’
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও জানায়, ‘সম্পদশালীদের অনেকের আয় বৈধ হলেও সেটি আয়কর রিটার্নে দেখানো হয় না। আর আয়ের উৎস অবৈধ হলে তারাও ব্যাংক এড়িয়ে চলেন। নগদ টাকা না রেখে সম্পদশালীরা বাড়ি বা জমি কেনেন, স্বর্ণ বা ডলার কিনেও নিজেদের কাছে জমা রাখেন। কেউ কেউ বিদেশে পাচার করেন। এ কারণে দেশের ব্যাংকে ব্যক্তিশ্রেণীর অ্যাকাউন্টে টাকা এত কম। তবে এমন সম্পদশালী ব্যক্তিও আছেন, যারা এনবিআর কিংবা দুদকের নজর এড়াতে বহু অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট অংকে টাকা রাখেন।’
দেশে কোটি টাকার বেশি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণীর কত—সেটি নিয়ে বহুদিন ধরে বিভ্রান্তি চলে আসছে। প্রতি ত্রৈমাসিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জমাকৃত আমানতের আকারের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। তবে সে তথ্যে এতদিন ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যাংক হিসাবের তথ্য পৃথক ছিল না। বরং ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণে কোটি টাকার বেশি ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধিকে দেশে কোটিপতি বাড়ছে বলে প্রচার করা হতো। বিষয়টি নিয়ে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ‘কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের বেশি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করে বণিক বার্তা।
এ প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যাংক হিসাবের পৃথক তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর চলতি মার্চে ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ নামের প্রকাশনাটির ২০২৫ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটি টাকার বেশি আমানত জমা থাকা ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪। এর মধ্যে ব্যক্তির হিসাব ছিল মাত্র ৩৮ হাজার ৪৩৬টি। অর্থাৎ কোটি টাকার বেশি এমন ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশ ব্যক্তির। বাকি প্রায় ৭২ শতাংশই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব। যদিও দেশে মোট ব্যাংক হিসাবের ৯৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণীর। এসব ব্যক্তি হিসাবে মোট আমানতের ৫৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাব সংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫। এসব হিসাবে মোট ২১ লাখ ৫৩৩ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব ছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ২২ হাজার ১০০টি। এ হিসাবগুলোতে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। ব্যক্তিশ্রেণীর ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৮ হাজার ৩৬৫ ব্যাংক হিসাবে ১১ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আমানত জমা রয়েছে। সঞ্চয়ী হিসাবের পাশাপাশি সব ধরনের মেয়াদি আমানত ও সঞ্চয় প্রকল্প এসব হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতকারীদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোতে ১ কোটি টাকার বেশি জমা আছে এমন হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ৪৩৬। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার আমানত থাকা হিসাব সংখ্যা ছিল মাত্র ১০৭। এ হিসাবগুলোতে জমা থাকা আমানতের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের ১৪১টি ব্যাংক হিসাবে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা জমা ছিল। একই সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি এমন ব্যাংক হিসাব ছিল ৪৪টি, যাতে জমা ছিল ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আমানত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এ ধরনের হিসাব সংখ্যা মাত্র ১৩-এ নেমে আসে। আর হিসাবগুলোতে আমানতের স্থিতি নেমে যায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।
দেশের ব্যাংকগুলোতে যখন অতিধনীদের আমানত কমে যাচ্ছে, ঠিক তখন বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রকাশিত বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংক হিসাবে স্বীকৃত ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের জমাকৃত আমানত বেড়েছে। ২০২৪ সাল শেষে গোপন অর্থের প্রধান গন্তব্য সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশীদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৮৬ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এ ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের ১ কোটি ৭৭ লাখ ১২ হাজার সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল। যদিও তার আগে ২০২২ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার সুইস ফ্রাঁ এবং ২০২১ সালে ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ও ২০২০ সালে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ।
তথ্যসূত্র:
১। ব্যাংকে কোটিপতিদের টাকা রাখার প্রবণতা কমছে ধারাবাহিকভাবে
– https://tinyurl.com/5bjxm45c


