‘বঙ্গবন্ধু’ : পূজিত এক নিকৃষ্ট মূর্তি

1
1104
‘বঙ্গবন্ধু’ : পূজিত এক নিকৃষ্ট মূর্তি

শেখ মুজিবুর রহমানকে তার দলীয় নেতারা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। শেখ মুজিব পরবর্তী যে কয়টি বছর বেঁচে ছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির স্বার্থকতা রক্ষা করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। তবে, তার মৃত্যুর পর থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি পূজিত এক নিকৃষ্ট মূর্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু’ নামকে কেন্দ্র করে একদল লোকের পেট চলছে। বঙ্গবন্ধু নামের ভাস্কর্য তথা মূর্তি কিংবা ছবি টাঙ্গানোর বিনিময়েও তারা সবকিছুর বৈধতা পাচ্ছে। আর, তাদের এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামক নিকৃষ্ট মূর্তিকে সকল প্রকারের ‘কলঙ্ক’ থেকে হেফাজত করা প্রয়োজন। এর জন্য তৈরি করা হয়েছে আইন, চালানো হচ্ছে নিরীহের উপর অত্যাচার।

বঙ্গবন্ধু পূজা

মুশরিক মূর্তিপূজারীরা যেভাবে মূর্তি পূজা করে, ঠিক এরকমই শেখ মুজিবুরের মূর্তি বানিয়ে তার পূজারীরা ‘বঙ্গবন্ধু’ নামক মূর্তির পূজা করে থাকে। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করা হয়। আবার, খোদ ‘বঙ্গবন্ধু’র বিভিন্ন কার্যকলাপের ভিত্তিতেও রয়েছে অনেক পালনীয় দিবস। এগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘বঙ্গবন্ধু’র স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী পাকিস্তানীদের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন শেখ মুজিব। শেখ মুজিবের এ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে ২০২০ সালের গত ১০ই জানুয়ারীতে সারা বাংলাদেশে আমোদ-প্রমোদের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের লাখ লাখ টাকা নষ্ট করেছে ‘বঙ্গবন্ধু’র পূজারীরা। ঐদিন শেখ মুজিবের মূর্তিতে ফুল দেওয়া ছাড়াও, প্রযুক্তির সাহায্যে আলোর মাধ্যমে শেখ মুজিবের মূর্তি তৈরি করে, সেই মূর্তি নড়াচড়া করিয়ে বিশেষ ধরণের ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করে শেখ মুজিবের পূজারীরা। ঐদিন একইসাথে ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ হিসেবে দেওয়া পূর্বঘোষণা অনুযায়ী তারা মুজিববর্ষের ‘ক্ষণগণনা’ শুরু করেছে।

মানুষকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যও আছে ‘মুজিব বাহিনী’র বিশেষ শুভেচ্ছা বাণী — মুজিবীয় শুভেচ্ছা! আবার কেবল দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করে থাকে ‘মুজিব সেনারা’। ২০১৭ সালের ২১শে মার্চ বিবিসি বাংলায় “শেখ মুজিবের ‘মূর্তি’ সরানোর দাবি তুলেছে কলকাতার মুসলিম ছাত্ররা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবনে কলকাতার যে হোস্টেলে থাকতেন, সেখানেও একটি কক্ষে মসজিদের পাশেই ‘বঙ্গবন্ধু’র মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। আর তাই, কলেজের মুসলিম ছাত্ররা মূর্তিটা সরাতে আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু, ‘মুজিব পূজারীরা’ সেটি সরায়নি, বরং মূর্তিটিতে তারা নিয়মিত ফুল দিয়ে থাকে। এভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’র নামে জায়গায় জায়গায় মূর্তি বানিয়ে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে সেটির পূজা করে যাচ্ছে ‘মুজিব সেনারা’।

পূজারীদের যত লাভ

শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকতে তার অনুসারীদের যাই দেন না কেন, মৃত্যুর পর তার পূজারীরা অনেক কিছু পেয়েছে। কেবল ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটাকে পুঁজি করেই ‘মুজিব বাহিনী’ ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়েছে, চালাচ্ছে। ‘বঙ্গবন্ধু’ নামের উসিলা দিয়ে দোয়া করলে ‘মুজিব বাহিনী’র মনিব শেখ হাসিনা তা কবুল করে নেন। যেমন- কোনো এলাকায় ‘মুজিব বাহিনী’র আমোদ-ফূর্তির জন্য একটা ভবন প্রয়োজন হলে, তারা ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ তৈরি করার আবেদন জানিয়ে শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানাবে। আর হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু’ নামের উসিলায় সেটি কবুল করে নিবে।

আবার, ‘বঙ্গবন্ধু’র মূর্তি বানানোর নামেও ‘মুজিব বাহিনী’র পকেটে টাকা ঢুকেছে। ২০১৮ সালের ২৭শে নভেম্বর ঢাকা ট্রিবিউনে ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে যত কাণ্ড!’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দফায় ১০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’র একটি মূর্তি নির্মাণের কাজ করা হয়। কিন্তু, মাস কয়েকের মধ্যেই মূর্তিটিতে ফাটল দেখা দেয় এবং রং উঠে যায়। এ বিষয়ে মূর্তি নির্মাতা মৃণাল হক বলেন, ‘ভাস্কর্য নিয়ে অনেক ঝামেলা পাকিয়েছে। অনেক যন্ত্রণা করেছে। অনেক অত্যাচারও করেছে। এখন এই ভাস্কর্য নিয়ে আমি কোনো কথা বলবো না।’ এরপর ক্ষোভ প্রকাশ করে এ শিল্পী বলেন- ‘এরা চাঁদা তুলতে আসে, ওরা চাঁদা তুলতে আসে। চাঁদা না দিলে পিছে লাগে। আমার লোককে আটকে রাখে-বেঁধে রাখে।’

মূর্তি নির্মাতা মৃণাল হকের কথায় ‘বঙ্গবন্ধু’র মূর্তি নির্মাণের পেছনের কারণ বুঝা যায়। ঐ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ রয়েছে, তেমনি মৃণাল হকের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এভাবে, ‘বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য তথা মূর্তি, ভবন, লাইব্রেরি ইত্যাদি নির্মাণের কথা বলেই টাকা-পয়সা ভাগাভাগি করে নেয় ‘মুজিববাহিনী’। কিন্তু, এ টাকা-পয়সাগুলো আসে কোথা থেকে? এগুলো কার টাকা? হাসিনার নাকি জনতার? নিশ্চয়ই জনতার।

জনতার কী ক্ষতি!

‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করে একদল লোক অনেক কিছুই পাচ্ছে। কিন্তু, তাদের এ চাওয়া-পাওয়া সরকার কীভাবে পূরণ করে? এর সহজ উত্তর হলো- রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের খরচের ব্যবস্থা করা হয়। আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকা টাকার অধিকাংশই হলো জনগণের প্রদেয় কর। তথা, ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করে ‘মুজিবসেনারা’ যে সুযোগ-সুবিধা ও টাকা-পয়সা পায়, এগুলো সরকার জনগণকে লুটে, অত্যাচার চালিয়ে ব্যবস্থা করে থাকে। জানা গেছে, শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে যে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে, এ ‘মুজিববর্ষে’ ‘মুজিববাহিনী’র জন্য আছে বিশেষ অফার! তাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য সরকার এবার তাদেরকে আরো বেশি চাঁদাবাজির সুযোগ দিচ্ছে বলে জানা যায়। তাছাড়া, মুজিববর্ষ উৎযাপনের জন্য দেশের সরকারও গত বছর ২০০ কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট পেশ করেছে। একদিকে, দেশের অর্থনীতির চরম বিপর্যয়কাল চলছে, দেশে চরম মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনীতিবিদরাও কথা বলছেন; অন্যদিকে, মুজিববর্ষের নামে তারা এতো টাকা খরচ করে ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ করার আয়োজন করছে। নিজেদের আমোদ-প্রমোদের জন্য জনগণকে লুটেপুটে খেয়ে শেষ করে ফেলছে এই ‘মুজিব বাহিনী’। কিন্তু, তাদের চাঁদাবাজি থেকে জনগণ কীভাবে রেহাই পেতে পারে? ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’ কীভাবে বন্ধ করতে পারে?

বঙ্গবন্ধু অবমাননা আইন

‘মুজিব বাহিনী’র অত্যাচার থেকে বাঁচতে হলে ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’র ইতি টানতে হবে। কিন্তু, কীভাবে এ কাজ করবেন? দেশের সংবিধানে ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’কে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যে বা যারাই ‘বঙ্গবন্ধু’র অবমাননা করবে, তার জন্য রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান। এদেশে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবমাননাকারীর শাস্তি হয় না, কিন্তু শেখ মুজিবের অবমাননাকারীর শাস্তি হয়। আপনি ‘বঙ্গবন্ধু’র নামে কিছু বলারও দরকার নেই, আকার-ইঙ্গিতে যদি আপনার কথা ‘মুজিব বাহিনী’র কাছে তাদের স্বার্থবিরোধী ও ‘বঙ্গবন্ধু’র ব্যাপারে অবমাননা বলে মনে হয়, তাহলেই তারা আপনাকে জেলে পুরবে। এই পূজারীদের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’ আগে নবী ছিল, এখন তারা তাকে রবের আসনে বসিয়েছে।

এভাবে, ‘বঙ্গবন্ধু’ নামক মূর্তিকে দাঁড় করিয়ে দেশের মানুষের উপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে ‘মুজিবপূজারীরা’। একদিকে তারা ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’র নামে জনগণের অর্থ-সম্পদ লুটে খায়, অন্যদিকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামক নিকৃষ্ট মূর্তির প্রতিরক্ষায় তৈরি করে ‘বঙ্গবন্ধু অবমাননা আইন’; যে আইনের মাধ্যমে চলে নিরীহের উপর নিপীড়ন।  এ আইন ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’কে যেমন বৈধতা দান করে, এর বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করে, তেমনি ‘বঙ্গবন্ধু’র নামে ‘বঙ্গবন্ধু পূজারী’দের সকল অপকর্মকে বৈধতা দান করে। অর্থাৎ, মুজিবপূজারীদের এসকল অপকর্মের পাশাপাশি দেশের সকল অপরাধের মূলে রয়েছে মানবরচিত কুফরি সংবিধান। এ সংবিধান যতোদিন স্বস্থানে বহাল থাকবে, ‘মুজিবপূজারীরা’ ‘বঙ্গবন্ধু পূজা’র নামে দেশে লুটপাট চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই, ‘মুজিবপূজারী’দের মূলে তথা এই মানবরচিত সংবিধান উৎখাত করে মহান আল্লাহ তা’য়ালার বিধান বাস্তবায়ন করতে পারলেই জনগণের বাস্তব মুক্তি সম্ভব।


লেখক: আহমাদ উসামা আল-হিন্দ, সম্পাদক, আল-ফিরদাউস নিউজ।

১টি মন্তব্য

  1. মাশা-আল্লাহ, জাযাকাল্লাহ, চমৎকার প্রবন্ধ।
    আমার নাসীহা মুজিবের আসল চেহারা বিস্তর ভাবে প্রমাণ ভিত্তিক তুলে ধরলে অনেক উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ।
    মুজিবের সময় দেশের কি অবস্থা ছিল সে কি করেছে তাকে জনগণ কেমন জানতো, আর এখন তার পরিবার কি করে যাচ্ছে সবই সামনে আসলে আশা করি সচেতন হবে জনগণ। বুঝতে পারবে ইসলামী সাশণই একমাত্র ঘটাতে পারে এর অবসান।
    ইনশাআল্লাহ সেই দিন অতি সন্নিকটে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন