দিল্লী গণহত্যায় মালাউন পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষপাত

1
424

প্রথমে আমাদের কাছে যথেষ্ট পাথর ছিল না । পুলিশ আমাদের পাথর এনে দিয়ে সেগুলো ছুঁড়তে  বললো ।  -হিমাংশু রাথোড় ( আন্দোলনকারী গেরুয়া সন্ত্রাসীদের একজন )

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন । এই আইন ভারতে মনুষ্যত্বহীনতার ভয়াল রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে । সফলভাবে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য সহিংসতা । আর জন্ম দিচ্ছে প্রতিহিংসার অন্তহীন আগুন।

এই অমানবিকতার প্রতিবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল অযুত মানুষ । বিনিময়ে তারা হারিয়েছে আত্মীয়-স্বজন, কিংবা জীবনের শেষতম আশ্রয় ভিটেমাটি , সাহায্যের পরিবর্তে মোকাবেলায় দাঁড়িয়েছে জয় শ্রী রাম ধ্বনিতে মাঠ-ঘাট কাঁপিয়ে সারা জীবন বন্ধু মনে করা হিন্দু জনস্রোত ; দিল্লী গণহত্যা।  এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কি কারো ছিলনা ? অবশ্যই ছিল । প্রশাসন ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ছিল । তবে তাদের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে অনেক প্রশ্ন । এমন কিছু প্রশ্ন ; কয়েকটি দুঃখময় কাহিনী ও  কথা নিয়ে। চলুন জেনে আসা যাক ।

১.

মাথায় দগদগে রডের বাড়ি আর অমানুষিক নির্যাতন নিয়ে জানালা ভাঙা এ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে আছেন সরফরাজ আলি । ভয়ার্ত কণ্ঠে তিনি বলতে শুরু করেন –

আমি আর আমার বাবা বাইকে করে আসছিলাম । তারপর প্রথমে তারা (পুলিশ) আমাদেরকে ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দিতে বলে । এবং নাম জিজ্ঞাসা করে । আমি ভুয়া একটা নাম ঠিক করে রেখেছিলাম । সেটা বললাম । তারা আমার আইডি কার্ড চাইল । কিন্তু আমার কাছে তা ছিলনা । হঠাৎ তারা আমার হেলমেট খুলে মোটা রড দিয়ে মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেয় । বাইক থেকে আমাদের ফেলে দেয় । আর চোখের সামনেই আমার বাইকটি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে । অনেকক্ষণ যাবত তারা আমাকে আর বাবাকে পেটাতে থাকে ।

ওরা মুসলিমদের চিহ্নিত করে শুধু তাদেরই মারছে । হিন্দু জানতে পারলেই ছেড়ে দিচ্ছে । আর যখন আমি ভুয়া নামটা বলেছিলাম তখন তারা আমার কথা কথা বিশ্বাস করলো না । বললো – ঠিক আছে দেখি প্যান্ট খুল !

এরপর তিনি নিজের অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করলেন । না তিনি পারলেন না । আর সেই এক ফোঁটা অশ্রু থেকে হাজারো মানুষের পাঁজর ভাঙা কান্নার নির্মম ধ্বনি ভেসে এলো ।

২.

বাইরে প্রচণ্ড হৈচৈ শুরু হয় । বন্দে মাতরম আর জয় শ্রীরাম শ্লোগানে দপ করে জ্বলে উঠে চারপাশ । অবস্থা বেগতিক দেখে দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে বসে রইলেন ব্যবসায়ী বুরা খান । সন্ত্রাসীরা এসে প্রথমে তার গাড়িটিকে জ্বালিয়ে দিল । তারপর দোকানঘর । লোকজন যখন অবিরাম পাথর বর্ষণ করছিল তখন তিনি আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন । হঠাৎ কেউ একজন ভেতরে টিয়ার গাস ছুঁড়ে মারে । তিনি দোকানের পাশের দরোজা দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেন । বাইরে বের হয়ে দোকানের দিকে ফিরে তাকান ।  পরক্ষণেই একটি দৃশ্যের দিকে চোখ গেলে স্তব্ধ হয়ে যান তিনি, স্থির হয়ে যায় তার সমস্ত ভাবনা। তিনি দেখেন, পুলিশ ও হামলাকারীরা একসাথে মিলে আগুন লাগাচ্ছে তার দোকানে । তখনি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন তিনি । জানটুকু নিয়ে কোনভাবে পালিয়ে যান নির্দিষ্ট দূরত্বে ।পরদিন তিনি তার ভস্মীভূত দোকানের উপর দাঁড়িয়ে বলেন-দমকলের গাড়ি এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যায় । কিছুই করেনি তারা । এভাবেই আমার সব শেষ হয়ে গেলো ।

৩.

ফুটপাতের পাশে ফায়জান নামের ২৩ বছরের এক যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে পুলিশ । নিহতের ভাই নাঈম চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলেন-প্রচণ্ড ব্যাথায় আমার ভাই ভালমতো বসতেও পারছিল না এবং দাঁড়াতেও পারছিল না । তার শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল । কালশিটে দাগে ভরে উঠেছিল সমস্ত দেহ । তার শরীরের এমন এমন জায়গায় মারা হয় যেগুলো কাউকে বলা যায় না ।

৪.

মঙ্গলবার দুপুর । চারিদিকে সুনসান নীরবতা । শিব বিহারের পুরুষেরা কয়েক মাইল দুরে, দিল্লির আরেক অংশের একটি ইজতেমায় গিয়েছে । শুধুমাত্র নারীরাই ঘরের ভেতর ।

হঠাৎ ৫০/ ৬০ জন লাঠি হাতে হেলমেট পরিহিত অপরিচিত লোকদের একত্র অবস্থায় দেখা যায় । তারা ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদেরকে আশ্বস্ত করে বলে-আমরা তোমাদেরকে রক্ষা করতে এসেছি । ভয় পাবা না । ঘরের ভেতরেই থাক । বের হয়ো না ।

নারীরা জানালা দিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন । কিছুক্ষণ পরই বোঝা গেলো যে, তারা ঘরবাসীদের সাহায্য বা রক্ষা, কিছুই করতে আসেনি ।

তারা জয় শ্রী রাম বলে শ্লোগান দেয়া শুরু করে । কয়েকটি মুসলিম বাড়ী আর একটি ফার্মেসিতে  দপ দপ করে আগুন জ্বলে উঠে । হামলাকারীরা ট্রান্সফরমার ভাঙচুর করে এবং ধুলায় পুরো এলাকা আচ্ছাদিত হয়ে যায়।

নাসরীন আনসারী নামক এক নারী বলেন-তারা মুসলমানদের দোকান এবং বাড়িঘর লক্ষ্য করে  ককটেল এবং রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ছুড়ে মারছিল। কিন্তু কোন হিন্দু বাড়িতে হামলা করেনি। আমরা কখনো ভাবিনি, এরকম কোন কিছু কখনো ঘটতে পারে। আমাদের একমাত্র দোষ কি শুধু এটাই ছিল যে, আমরা মুসলমান।

তিনি আরও বলেন যে, নারীরা তখন পুলিশের কাছে অনেকবার টেলিফোন করে । প্রত্যেকবার তারা আমাদের আশ্বস্ত করছিল যে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা এখানে পৌঁছে যাবে। কিন্তু না, তারা এলো না ।

ঘরবাসীরা স্পষ্টই বুঝতে পারলো, আজ রাতে তাদের আর রক্ষা হবে না। তারপর জীবনের পরম আশ্রয় ও ঠিকানা-শিব বিহার থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল হাজার হাজার মুসলমান বাসিন্দা ।

৫.

বহুদিন হিন্দু মুসলমানের সেই পুরনো সংঘাত নিষ্ক্রিয় ছিল । মোদি সরকার এসে সেই আগুনকে পুনরায় জ্বালিয়ে দিয়েছে। হিন্দুস্তানের মাটি থেকে ইসলাম ও মুসলিমদের নাম মুছে দিতে সে আজ বদ্ধপরিকর । উঠে পরে লেগেছে অসংখ্য উগ্র হিন্দু জনতা । আর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে প্রশাসন ও পুলিশ ।

অভিযোগ উঠছে যে, পুলিশকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না । এক অনলাইনে নিউজ পোর্টালে এ বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে । তাতে বলা হয়েছে যে, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরুর পর ১৩ হাজার ফোন কল পেয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি । কোথাও গুলি, কোথাও গাড়ি পোড়ানো আবার কোথাও নির্বিচারে মানুষকে হত্যা, হামলা ও নির্যাতনের বিষয়ে ফোন কলের মাধ্যমে পুলিশে অভিযোগ দেয়া হয়েছিল । অভিযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দিল্লি পুলিশ।

পুলিশ যদি শুধু নিষ্ক্রিয় থাকতো তাও একরকম হতো । কিন্তু পুলিশ ইন্ধনদানকারীর ভূমিকা পালন করেছে । বিবিসির এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকটি পুলিশ দুর্বৃত্তদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের দিকে ঢিল ছুঁড়ছে । আবার কোনটাতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কাউকে কাউকে পেটাচ্ছে আর জয় শ্রী রাম শ্লোগান দেওয়াচ্ছে ।

পুলিশকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে পুলিশ মুখ খুলতে রাজি হয়নি।

উচ্চমহল থেকে যদিও বলা হচ্ছে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে । তবু আমাদের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় । সেটা হল, তারা যদি সম্প্রীতিই চাইত তাহলে তাদের চোখের সামনে দিয়ে এত বড় একটা নৃশংস ঘটনা কীভাবে ঘটে যাচ্ছে ? কেন তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ? নাকি তারা নিয়ন্ত্রণ চাইছেও না? প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি । কিন্তু মুখ খুলে বলার মত সাহস কেউ রাখি না । বড় দুঃখের কথা।

আচ্ছা, ঘুরে দাঁড়াবার মত ঐশ্বর্যময় দিনটি কি কোনদিনই আমাদের জীবনে আর ফিরে আসবে না ? তবু কী ভারতীয় মুসলমানরা ইনসাফের অপেক্ষা করে যাবে আজীবন-হিন্দু মালাউনদের কাছে, মানবতার কাছে?

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন