মালাউনদের নতুন চক্রান্ত: দিল্লিতে করোনার জন্য মুসলিমদেরকে দোষারোপ

0
402

নয়াদিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদে এক অনুষ্ঠান থেকে বেরোনো কয়েকজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টিকে ঘিরে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর দোষ চাপাতে ভারতীয় মালাউন সরকার উঠে-পড়ে লেগেছে।

গত ১ এপ্রিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, লকডাউন ঘোষণার আগে নিজামুদ্দিন মসজিদে ১৩ থেকে ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত তাবলিগের ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া অন্তত ১৩৪ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের অনেক নাগরিক ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েক হাজার মানুষ পাঁচটি ট্রেনে ভ্রমণ করে ওই তাবলিগে অংশ নেন।

এরপর থেকে ভারত সরকার নিজামুদ্দিন মসজিদের ওই জমায়েতকে করোনা সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। যদিও ভারতে করোনা এসেছে জানুয়ারিতেই। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী বিজেপি সরকার এজন্য ধর্মীয় প্রচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। তাদের এই দোষ চাপানোর কাণ্ডে উসকানি দেয় ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমও। কিছু সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে বলা হয়, করোনাভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে তারা জমায়েত হলেন কেন?

অথচ ১৬ মার্চ বিজেপির সম-আদর্শের একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন দিল্লিতেই গোমূত্র পার্টি করে, যেখানে কয়েকশ লোক অংশ নেন। ১৯ মার্চ পর্যন্ত খোলা ছিল তিরুপতি মন্দির। যেখানে প্রতিদিন অন্তত ৪০ হাজার দর্শনার্থী যান। এমনকি লকডাউন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরেও খোলা ছিল কাশ্মীরের বৈষ্ণদেবী মন্দির, যেখানে শত শত পূণ্যার্থীর যাতায়াত ছিল, এবং সেখানে এখনো আটকা পড়েছেন ৫০০ পূণ্যার্থী।

এখানেই শেষ নয়, মার্চের গোড়ায় ইটালি এবং জার্মানি ঘুরে দেশে ফিরেছিলেন এক শিখ ধর্মগুরু। বিমানবন্দরে তাঁর কোনও রকম পরীক্ষা হয়নি। পাঞ্জাবে গিয়ে ডজনখানেক গ্রামে ঘুরে তিনি ধর্মপ্রচার করেছেন। দিন দশেক আগে তাঁর মৃত্যুর পরে জানা যায়, সেই গুরুও করোনা আক্রান্ত ছিলেন।  আশঙ্কা, ওই গুরুর সংস্পর্শে এসে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। এখনও পর্যন্ত ওই সমস্ত গ্রামের অন্তত কয়েকশ ব্যক্তির শরীরে করোনার জীবাণু মিলেছে।

আর সব চেয়ে আশ্চর্যের ঘটনাটি তো ঘটিয়েছেন খোদ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। নরেন্দ্র মোদী লকডাউনের ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অযোধ্যায় রামলালা যাত্রা করেন সপার্ষদ যোগী। এ সব অন্যায় নয়? অপরাধ নয়?

মালাউনদের গোমূত্রের পার্টিতে জড়ো হয়েছিলেন ২০০ ভক্ত। সেটিও দিল্লি সরকারের নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সব আচরণই বুঝিয়ে দিচ্ছে, কারা বেপরোয়া। এসব জমায়েতের ব্যাপারে সরকারও উচ্চবাচ্চ্য করেনি, উসকানি দেয়া সেই সংবাদমাধ্যমগুলোও কিছু বলেনি।

বিদেশ থেকে আসা নাগরিকদের ১৪ দিন আলাদা করে রাখা যেত। অথবা অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যেত। অন্ততপক্ষে হাতে ছাপ দিয়ে তাঁদের নিজেদের বাড়িতেই কোয়ারান্টিনে রাখা যেত এবং তাঁদের প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষা করা উচিত ছিল। তিনি কেন এটা করলেন না?

বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা ছিল। সেটা জ্বর মাপার জন্য। লোকেদের অভিজ্ঞতা বলছে, সবাইকে ওই স্ক্রিনিং এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। এমনও অভিযোগ উঠছে, নামার আগে অনেক যাত্রী প্যারাসিটামল খেয়ে নিয়েছিলেন, যাতে পরীক্ষা করেও জ্বর পাওয়া না যায়। আর বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারান্টিনে পাঠানো হয়নি বলে গায়িকা কণিকা কাপুরের মতো বেশ্যা অনেকেই পার্টি করেছেন, অনুষ্ঠান করেছেন, লোকের সঙ্গে ঢালাও দেখা করেছেন। কলকাতায় যুগ্ম সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলে হাসপাতালে না গিয়ে সারাদিন শপিং মলে ঘুরেছেন। তাঁদের ব্যাপারেও কোন ব্যাবস্থা নেয় নি কেন?

২ মার্চ থেকে ভারতে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। লকডাউন ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত তা চলেছে। মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের দলছুট বিধায়কদের পদত্যাগ করিয়ে সেখানে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা রূপায়ণ হয়েছে এরই মধ্যে। অর্থাৎ, এমন একটা ভাব দেখানো হয়েছে, যেন করোনা হচ্ছে তো কী হয়েছে, আমরা ঠিক থাকব। সামাজিক মাধ্যমে কেউ করোনা রুখতে গোবরস্নানের ভিডিও আপলোড করেছেন, কোনও বিজেপি বিধায়ক গোমূত্র পানের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের নিন্দা বা সতর্ক পর্যন্ত করা হয়নি।

চীনের করোনা পরিস্থিতি দেখে এবং সেই রোগ বিশ্বের অন্যত্র ছড়াচ্ছে দেখেও সেই ধরনের কোন ব্যবস্থা করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বরং এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অবাক করার মতো।

অথচ, চীনে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে তা রীতিমতো বড় আকার নিয়েছে। ৩০ জানুয়ারি ভারতে প্রথম একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। চীনের মতো দেশ করোনা সামলাতে কী রকম নাজেহাল হচ্ছে, উহান লকডাউন করে দিতে হচ্ছে, মাস্ক, স্যানিটাইজার উধাও হয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, পরিকাঠামোর অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে– সে সবই ততদিনে জানা হয়ে গিয়েছে। এটাও বোঝা গিয়েছে, করোনা চীনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা বিশ্বে ছড়াবে।

তবুও সরকারের গাফিলতি বলুন, অদূরদর্শিতা বলুন, ঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নেওয়ার উদাহরণ বলুন, সেটা হয়েছে ফেব্রুয়ারিতেই। অন্য দেশ থেকে যে সব বিদেশি ও স্বদেশি দেশে ঢুকেছেন, তাঁদের যদি সেই সময় থেকেই ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, তা হলে এতদিনে হয়তো করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। অন্তত ১ মার্চ থেকে এই ব্যবস্থা নিলেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।  খবর-ডয়চে ভেলে

শুধু নিজামুদ্দিন মসজিদের জমায়েতের ওপরই করোনা ছড়িয়ে পড়ার সব দায় চাপাতে এখন সবাই উঠে-পড়ে লেগেছে। নাগরিক সমাজের অনেকে এটাকে ‘ইসলামফোবিয়া’র চূড়ান্ত রূপ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।

তাবলিগের ঘটনা প্রচার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কোনও কোনও মহল থেকে একটি সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তোলা শুরু হয়েছে। প্রচারের কৌশলে বোঝানোর চেষ্টা চলছে, ভারতে কেবল একটি সম্প্রদায়ই করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী। বাকিরা ধোয়া তুলসি পাতা। গুজরাটে রীতিমতো লিফলেট বিলি করে প্রচার করা হচ্ছে, নিজামুদ্দিনের ঘটনা আসলে একটি সংগঠিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ চক্রান্ত।

গল্পের গরু মগ ডালেও চড়তে পারে। সমস্যা হল, ইদানীং ভারতীয় সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাজনীতি ওই মগডালের গরুকে নিয়েই রাতদিন বিতর্ক করে যায়। তারা প্রশ্ন করে না, কী ভাবে ওই শিখ ধর্মগুরু বিমানবন্দর থেকে কোনও পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে পড়েন? তখন কোথায় ছিল প্রশাসন? কী ভাবে তাবলিগের জমায়েতে আসতে পারলেন বিদেশি অভ্যাগতরা? কেন তাঁদের বিমানবন্দরেই আটকে দেওয়া হল না? কী ভাবে ঘটল তালিকায় দেওয়া আর সব ঘটনা? কোথায় ছিল পুলিশ, প্রশাসন, সরকার? কোথায় ছিল আইনের শাসন?

তাতে বেজায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ স্যাম ব্রাউনব্যাক। তিনি ‘দোষারোপের খেলা বন্ধ করে’ করোনা  থেকে রক্ষা পেতে  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নয়াদিল্লির প্রতি।

গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ব্রাউনব্যাক বলেন, ‘ভারতে কয়েকদিনে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য কোনো মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে সরকারের দায়ী করা উচিৎ নয়। আমরা জানি এই ভাইরাসের প্রকৃত উৎসস্থল ঠিক কোথায়?  গোটা পৃথিবী এখন করোনাভাইরাসে স্তব্ধ। সেখানে কেবল মুসলিম  সম্প্রদায়ের ওপর দোষ চাপিয়ে যে খেলা চলছে তা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সরকারের প্রয়োজন এই নোংরা খেলার বিরুদ্ধে একটা কড়া পদক্ষেপ নেয়া।’

স্যাম ব্রাউনব্যাক ভারত সরকার ও তাদের অনুসারী সংবাদমাধ্যমের এমন অবস্থানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো রকম দোষারোপের খেলায় না গিয়ে ভারতের উচিত পরিস্থিতি উত্তরণে সঠিক উপায় বের করা।

তিনি সব ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত করে ধর্মীয় আচার পালন করুন এবং শান্তি বজায় রাখুন।

সূত্র- ইসলাম টাইমস/ ডয়চে ভেলে

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন