হিন্দুত্ববাদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ব এবং হলুদ মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব : প্রেক্ষিত কুমিল্লায় কোরআন অবমাননা

4
2065
হিন্দুত্ববাদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য এবং হলুদ মিডিয়া পক্ষপাতিত্ব : প্রেক্ষিত কুমিল্লায় কোরআন অবমাননা

গতকাল ১৪ অক্টোবর কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের হলুদ মিডিয়ায় একথা বেশ জোরোশোরে প্রচার করা হচ্ছে যে, এদেশের হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা লাগানোর জন্য একদল ষড়যন্ত্রকারী মূর্তির পায়ের নিচে কুরআন রেখে এসেছে। কথার ভঙ্গিমায় স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে, ষড়যন্ত্রকারী বলতে এখানে মুসলিমদের দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে।

রাজিব হায়দার থেকে শুরু করে রশরাজ পর্যন্ত ইসলাম অবমাননার প্রতিটি ঘটনায় হলুদ মিডিয়া তাদের আইডি হ্যাক হওয়ার বানোয়াট কাহিনী প্রচার করে উল্টো মুসলিমদেরকেই দোষী প্রমাণের চেষ্টা করেছে, আর প্রশাসন হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে মুসলিমদের বুকে গুলি চালিয়েছে।

ন্যায় ও নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে এমন একপেশে অবস্থান গ্রহণের কারণে হক্কানী উলামাগণ এদেশের দলকানা প্রশাসন ও হলুদ মিডিয়াকে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের দালাল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে, নাস্তিক-ব্লগার পরবর্তী সময়ে ইসলাম অবমাননার ক্ষেত্রে হিন্দুদেরকেই বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে। মুসলিম নামধারি নাস্তিক ব্লগাররা একে একে দেশ ছেড়ে পালানোর পর একমাত্র হিন্দুরাই এদেশের মাটিতে বসে ইসলাম অবমাননার সাহস দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের হিন্দুদের ইসলাম অবমাননা এবং প্রশাসন, সরকার ও মিডিয়ার একযোগে হিন্দুদেরকেই সমর্থন দেওয়ার ঘটনা বিগত এক দশক ধরে পুনঃপুনঃ ঘটে চলেছে।

২০১৪ সালের ৩০ জুন রাজধানীর স্বামীবাগের প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী স্বামীবাগ মসজিদে মুসলিমদের ওপর হামলা চালায় হিন্দুরা। ভোর চারটা থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত ইসকন সদস্যরা মাইক ব্যবহার করে উচ্চশব্দে এলাকা কাঁপিয়ে ঢোল-বাদ্য বাজাতে থাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়গুলোতে ঢোল-বাদ্য সাময়িক বন্ধ রাখতে বার বার অনুরোধ করা হলেও ইসকনের নেত্রীস্থানীয়রা তাতে রাজি হয়নি, উল্টো তারা মুসলিমদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে।

নামাজের সময় মাইক বন্ধ রাখার অনুরোধে রাজি না হলেও তাদের ‘রথযাত্রায় অসুবিধার’ কথা বলে উল্টো হুমকির সুরে মুসলমানদেরকে তারাবীর নামাজ সংক্ষিপ্ত করতে বলে ইস্কনের হিন্দুরা। আল্টিমেটাম অনুযায়ী নামায শেষ না করায় মসজিদে ঢিল ছুঁড়ে কয়েকজন মুসল্লিকে আহত করে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা।

ঠিক ঐ সময় ঘটনাস্থলে আবির্ভূত হয় গেন্ডারিয়া থানার এসআই অমল কৃষ্ণ। সে হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে মসজিদের ইমাম সাহেবকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। কিন্তু মুসল্লিদের প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়ে হিন্দুত্ববাদী এসআই অমল কৃষ্ণ হুমকি দেয় যে, ‘হিন্দুদের কথামতো যদি দশটার আগে নামায শেষ না করা হয়, তাহলে মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’

ভারতে যেভাবে দাঙ্গার সময়ে পুলিশ আর সাধারণ হিন্দুরা মিলে মুসলমানদের হামলা করে, ঠিক সেভাবেই পুলিশের ছত্রছায়ায় স্বামীবাগের হিন্দুরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করে বেশ কয়েকজন মুসলিমকে আহত করে। এরপর স্থানীয় ঢাকা-৬ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হলে হিন্দুরা স্লোগান দিতে থাকে ‘ওপার বাংলার হিন্দু এপার বাংলার হিন্দু এক হও, মসজিদে তালা দিতে হবে।’

এমন আরেকটি ঘটনা ঘটে ঈদুল ফিতরের আগের দিন। রথযাত্রার নামে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইট সংলগ্ন রাস্তায় হিন্দুরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নানারূপ অঙ্গভঙ্গি, চেঁচামেচি এবং হৈ-হুল্লোড় করতে থাকে; উচ্চ আওয়াজে বাদ্য-যন্ত্র বাজিয়ে অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তারা।
এ বিষয় নিয়ে ইসকনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে আদালত সে মামলা ফিরিয়ে দেয়।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটের কাজলাশাহ মসজিদে জুমার নামাজের সময় পাশের ইসকন মন্দিরে স্পিকারে উচ্চস্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ও মন্ত্র পাঠ করে ইচ্ছাকৃতভাবে মুসল্লিদের নামাজে ব্যাঘাত ঘটাতে থাকে। নামাজের পর মুসল্লিরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মন্দিরে গেলে তারা উল্টো খেপে যায়। এক পর্যায়ে মন্দিরের ভেতর থেকে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকলে মুসল্লিরাও ইট পাটকেল মারলে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। ইসকন সদস্যরা তখন দা-বটি নিয়ে মুসল্লিদের উপর হামলা চালায়, এমনকি মন্দিরের ভেতর থেকে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলিও ছুঁড়ে হিন্দুরা।

অথচ পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে মুসল্লিদের উপর গুলি চালায় ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে সাবেক কাউন্সিলর জেবুন্নাহার শিরিনসহ প্রায় ১২ জন মুসল্লি আহত হন। গুলিবিদ্ধ হন প্রায় ৭ জন। পথচারীদের অনেকে ইট পাটকেল এর আঘাতে আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের মতো মুসলিমকে আটক করে নিয়ে যায় এদেশের হিন্দুত্ববাদী পুলিশ।

২০২০ সালে জাগো হিন্দু পরিষদের সদ্যস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে বাংলাদেশের রাজপথে আলেম উলামাদের জবাই করার হুমকি সম্বলিত স্লোগান দেয়। ভারতে জয় শ্রী রাম স্লোগান দিয়ে মুসলিমদের পিটিয়ে মারা হয়। বাংলাদেশেও সেই একই স্লোগান দেয় তারা । সেই সাথে স্লোগান দেয় ‘কুরুক্ষেত্রের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।’

বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামাণিক সরাসরি ভারতের বিজেপি সরকারকে আহ্বান করেছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ বানানোর জন্য। আরও অনেক হিন্দুকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে শোনা গিয়েছে।

এছাড়াও হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামাণিক ও আরও ২ হিন্দু নেতা এক অনলাইন আলোচনায় বলে-
হিন্দু যুবকরা ৪/৫ ফিট লম্বা রামদা কাছে রাখবে’
‘যুদ্ধ পরিকল্পনা করতে হবে’
‘গন্ডগোল না করতে চাইলে বাঁচবেন কি করে?’
‘ত্রিশুল পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে’
‘রাষ্ট্রক্ষমতা কেউ কেড়ে নিলে যুদ্ধ করে ফেরত আনতে হয়’
‘প্রত্যেকটি বাড়িতে ১০ টি করে ত্রিশুল তৈরি করতে হবে, পূজা উপলক্ষ্যে ত্রিশুল নিয়ে মহড়া দিতে হবে ‘

মুসলিমদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের হামলার আরেকটি ঘটনা ঘটে এবছর ১৭ই জুন রাজশাহীতে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি রকি কুমার ঘোষ তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হেতেমখা লিচুবাগান এলাকার মসজিদে ভাংচুর ও মুসলিমদের বাড়িঘড়ে হামলা চালায়। মো. মনিরুল ইসলাম (৪০) ও মো. রেজা (৩৫) নামের দুই যুবক তখন মসজিদের মাইক থেকে হিন্দুত্ববাদীদের হামলা রুখতে এলাকার মুসলিমদের এক হওয়ার আহ্বান জানায়; ফলে হিন্দু হামলাকারীরা পিছু হটে।

অথচ পরদিন বোয়ালিয়া থানার হিন্দুত্ববাদী ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মণ এসে ঐ দুই মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করে।

উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো ছাড়াও, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে যেখানেই হিন্দুরা তুলনামূলক বেশি সংখ্যায় একত্রে থাকার সুযোগ পায়, সেখানেই তারা মুসলিমদের নামাজে ব্যাঘাত ঘটাতে নানান উস্কানিমূলক আচরণ করে। এজাতীয় ঘটনার সংখ্যা সারাদেশে এতো বেশি পরিমানে ঘটে চলেছে যে, তার সংখ্যার হিসাব রাখা যথেষ্ট কঠিন।

গত দেড় দশক জুড়ে ভারতের মতো বাংলাদেশেও হিন্দুত্ববাদীদের এমন উত্থান ও প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য প্রদর্শন মূলত ভারতের মূসলিমদের কায়দায় বাংলাদেশের মুসলিমদেরকে গণহত্যার প্রস্তুতি হিসবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রশাসনে হিন্দুত্ববাদীদের স্পষ্ট আধিপত্য, হিন্দু-মুসলিম যেকোন বিবাদে হিন্দুদের পক্ষে প্রশাসনের অবস্থান গ্রহণ, সীমান্তে নির্বিচার মুসলিম হত্যা, এনআরসি উত্তর আসামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা ও তাদেরকে বাংলাদেশে পুশইন করার কানাঘুষা – এসবই অত্র অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিতব্য গণহত্যার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন হকপন্থী আলেমদের অনেকে।

তথ্যসূত্র :
——–
[১] ইসকনের বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি আদালত, ঢাকা টাইমস, ২৪.০৭.২০২১ – https://tinyurl.com/rpuc6kah
[২]সিলেটের ইসকন মন্দির থেকে গুলির ভিডিও ফাঁস, অনলাইনে তোলপাড়, নিউজ নাইন, ০৬.০৯.২০২১- https://tinyurl.com/haujmy3c
[৩]কি ঘটেছিল সিলেটের ইসকন মন্দিরে? কী বলা হচ্ছে? আউয়ার ইসলাম ২৪.কম, ০৩.০৯.২০২১- https://tinyurl.com/y5rvjyjk
[৪]তারাবীহ নামায বন্ধ করার নির্দেশ, না হলে মসজিদে তালা ঝোলানোর হুমকি, আল ইহসান, ০৩.০৭.২০২১- https://tinyurl.com/5xpuf2fb
[৫] জাগ হিন্দু পরিষদের ব্যানারে আলেম হত্যার শ্লোগান- https://www.facebook.com/RealityCheckBD1/videos/640995607293280 (৪৪মিনিট ৪০ সেকেন্ড)
[৬] গবিন্দ প্রমানিকের অখণ্ড ভারতবুক্তি ও মুসলিম হত্যার আহ্বান – https://youtu.be/tODO506Snxg?t=1281

4 মন্তব্যসমূহ

  1. হিন্দুদের এত স্পর্ধা,তারা পেয়েছো কোথায়? আসলে আমাদের বাংলাদেশের মুসলমানদের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে।তারা এখন আর জিহাদের পথে হাঁটে না,যার কারণে তাদের চোখের সামনে কোরআনের অবমাননা করা হচ্ছে।
    “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সকলকে জিহাদে অংশগ্রহণ করার তৌফিক দান করুন”

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন