
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের অনলাইন অঙ্গনে ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলন ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভেতরে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘ককরোচ (তেলাপোকা) জনতা পার্টি’ (সিজেপি), ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক (পরজীবী) ফ্রন্ট’ (এনপিএফ) এবং ‘বি (মৌমাছি) পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (বিপিআই) এর মতো নানান অনলাইনভিত্তিক দলের।
সোশ্যাল প্লাটফর্মে দলগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। দলগুলো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠন না হলেও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তরুণরা এখানে নিজেদের হতাশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ডিজিটাল যুগের রাজনীতিকে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরছে।
গত ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে বলে, ‘তেলাপোকার মতো এমন কিছু তরুণ আছে, যারা কোনো চাকরি পায় না কিংবা কোনো পেশায় তাদের জায়গা হয় না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মী সাজে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী হয়, আবার কেউ তথ্য অধিকার (আরটিআই) কর্মী বা অন্য কোনো অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করে।’
তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক হওয়া ৩০ বছর বয়সী অভিজিত দিপক নামের এক ব্যক্তি তেলাপোকাদের এক হওয়ার ডাক দেয়। এতে সোশাল মিডিয়ায় ককরোচ জনতা পার্টি নামের ট্রেন্ড তৈরি হয়।
দলটির আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট চালুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৪০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ এতে নিবন্ধিত হয় এবং পরবর্তীতে এই সংখ্যা ৩.৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দলটির ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়।
ভারতের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো মূলত বয়স্ক রাজনৈতিক এলিটশ্রেণী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু জেন-জি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছে।
এই প্রজন্ম পুরোনো রাজনৈতিক বয়ানে আস্থা হারাচ্ছে। ধর্মীয় বিভাজন, জাতীয়তাবাদী আবেগ বা ঐতিহ্যবাহী দলীয় আনুগত্য নিয়ে বেশির ভাগ তরুণের আগ্রহ ফিকে। তাদের প্রধান দাবি চাকরি, দক্ষতা ও বাস্তব সুযোগ।
একই সঙ্গে এখানে কাজ করছে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেম বা কাঠামোর বিরুদ্ধে রাগ ও অবিশ্বাস। তরুণদের বড় অংশ এখন আর শুধু সরকারকে সন্দেহ করছে না, তারা সন্দেহ করছে রাষ্ট্র ও সরকারকে প্রায় একাকার করে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া এবং করপোরেট কাঠামো—সবই তাদের চোখে এলিট ক্যাপচারের অংশ। ফলে আস্থা নয়, সন্দেহই হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক অনুভূতি।
এই আন্দোলনের গভীরে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ভারতীয় মধ্যবিত্ত স্বপ্নের ভাঙন। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় পরিবার তরুণদের একটি গল্প শোনিয়েছে। পড়াশোনা করো, ডিগ্রি নাও, চাকরি পাবে, জীবন স্থিতিশীল হবে। কিন্তু এই গল্প এখন ভেঙে পড়ছে।
কারণ, আজকের বাস্তবতা হলো, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, চুক্তিভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপ্রক্রিয়া, স্বজনপ্রীতি, বিনা বেতনের শিক্ষানবিশি ও যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের বা অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। ফলে মেধাভিত্তিক সাফল্য ব্যবস্থার ধারণা ক্রমেই একটি ছলনা হিসেবে স্পষ্ট হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডিগ্রি চাকরি দেবে, চাকরি স্থিতি দেবে মডেল আর কার্যকর থাকছে না। এটি ভারতীয় মধ্যবিত্তের জন্য একটি অস্তিত্বগত ধাক্কা। কারণ, তাদের পরিচয় এত দিন দাঁড়িয়েছেই শিক্ষার সাফল্যের ওপর।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটি গভীর নিঃসঙ্গতার সমাজ। ডিজিটাল সংযোগ বাড়লেও বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে তরুণদের মধ্যে পরীক্ষাজনিত উৎকণ্ঠা, সামাজিক অস্বস্তি, রাজনৈতিক রাগ এবং একধরনের আইরনির আড়ালে লুকানো হতাশা তৈরি হচ্ছে। তেলাপোকা পার্টি এই বিচ্ছিন্নতার একটি সামষ্টিক প্রকাশ বা একটি ডিজিটাল আশ্রয়। যেখানে ব্যক্তিগত হতাশা রাজনৈতিক ভাষা লাভ করেছে।
ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে তরুণদের মর্যাদাবোধের কোনো সংগতি তৈরি হচ্ছে না। এটি একধরনের সম্মানবোধ বঞ্চিত উন্নয়নের পরিস্থিতি।
এখানে অর্থনৈতিক সূচক ভালো হলেও মানসম্পন্ন চাকরির সংখ্যা অনুপাতিকভাবে বাড়ছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে চাকরিহীন উন্নয়নের বাস্তবতা। যেখানে উৎপাদন বাড়ে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ে না।
রাষ্ট্র একদিকে স্টার্টআপ জাতীয়তাবাদ, এআই বিপ্লব এবং ডিজিটাল ভারতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ তরুণদের বাস্তবতা আটকে আছে খণ্ডকালীন কাজভিত্তিক অর্থনীতিতে, কোচিংনির্ভর শিক্ষাসংস্কৃতিতে, ডেলিভারিভিত্তিক চাকরিতে ও অনিশ্চিত আয়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় বয়ান ও দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্যে গভীর ফাটল বড় হচ্ছে।
তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে যে রাষ্ট্র, বড় করপোরেট এবং মিডিয়ার মধ্যে একটি শক্তিশালী পাওয়ার নেক্সাস তৈরি হয়েছে। আদানি-আম্বানিপ্রধান করপোরেট কাঠামোর মিডিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক ভারতের উত্তপ্ত বিষয়, যা তরুণদের এই বার্তা দিচ্ছে যে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ধীরে ধীরে অলিগার্কি কাঠামোর দিকে হেলে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় ককরোচ জনতা পার্টির মতো ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ভাষার জন্ম। এটি কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক দল নয়। কিন্তু তা এই সময়ের মনস্তাত্ত্বিক ডকুমেন্ট। এটি দেখায় যে, ভারতের জেন-জি প্রজন্ম এখন আর কেবল নীরব ভোক্তা বা ভোটার হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও অপমানকে নতুন ভাষায় রূপ দিতে চাইছে। যেখানে ব্যঙ্গ, মিম ও ডিজিটাল সংগঠনই রাজনৈতিক অস্ত্র।
এ ঘটনাকে অবহেলা করলে ভুল হবে, আবার অতিরঞ্জিত করে বিপ্লব হিসেবে দেখলেও তাড়াহুড়ো করা হবে। কিন্তু একটি বিষয় আর গোপন নয়। তা হলো, ভারতের তরুণ প্রজন্ম এখন এমন একপর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যেখানে তারা কেবল পরিবর্তন চায় না; তারা চায় তাদের অস্তিত্ব ও সম্মানকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
যখন কোনো প্রজন্ম তার অপমানকে সংগঠিত ভাষায় রূপ দিতে শেখে, তখন তা হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ভূগোল পরিবর্তনের সূচনা।
তথ্যসূত্র
– https://tinyurl.com/yjckwhxv
– https://tinyurl.com/2s3hk4xw
– https://tinyurl.com/ypfmn9kr


