পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফ-এর পুশইনের শিকার অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের নিয়ে মানবিক সংকট

0
3

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে বর্বর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইনের শিকার নারী, শিশু ও পুরুষসহ ১১ জনের মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। প্রায় ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুই দফা পতাকা বৈঠকেও কোনো সমাধান না হওয়ায় তারা এখনও দুই দেশের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (৭ জুন) সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানরত এসব মানুষের মধ্যে রয়েছেন তিনজন পুরুষ, চারজন নারী এবং চার শিশু। তাদের মধ্যে একজন নারী ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং একজন শিশু শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের মধ্যেও তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।

জানা যায়, গত শুক্রবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রচেষ্টা প্রতিহত করে। ফলে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে এবং বিএসএফের বাধায় ভারতে ফিরে যেতে না পেরে তারা শূন্যরেখার কাছেই অবস্থান নিতে বাধ্য হন।

শূন্যরেখায় অবস্থানরত ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজিনা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, সে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভারতের কলকাতায় বসবাস করছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটকের পর প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘোরানোর পর গত শুক্রবার (৫ জুন) ভোরে তাদের ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এনে রাখা হয়। দ্রুত পরিবারের সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায় সে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খোলা আকাশের নিচে থাকা এসব মানুষের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার অভাবে তারা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। মানবিক কারণে স্থানীয়রা কিছু শুকনো খাবার ও পানি সরবরাহ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সীমান্ত এলাকার মানুষ। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখাকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

এ বিষয়ে ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান জানায়, “বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে অবৈধ পুশইনের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে হস্তান্তর করা হলে নিয়ম মেনে গ্রহণ করা হবে। অন্যথায় কোনোভাবেই অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’

দীর্ঘ সময় ধরে সংকটের কোনো সমাধান না হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও অসহায় মানুষগুলোর নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে, পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাষা ইউনিয়নের বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তি টানা ৬১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সীমান্তের শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষায় তাদের মধ্যে ক্লান্তি ও উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দৈনিক ইত্তেফাক সূত্রে জানা গেছে, আটকে থাকা ১০ জনের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের পরিচয় মিলেছে। বিভিন্ন সূত্র ও তাদের ভারতীয় আধার কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, তারা ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা শামসুল, তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। তবে শিশু দুটির নাম এখনো জানা যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শামসুল দীর্ঘদিন ধরে ভারতে সবজির ব্যবসা করতেন এবং পরিবারসহ সেখানেই বসবাস করতেন। কয়েকদিন আগে ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে। পরে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরের পর শুক্রবার ভোরের দিকে বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বিজিবি তাদের বাধা দেয়। এরপর থেকে শামসুলের পরিবারসহ মোট ১০ জন সীমান্তের শূন্যরেখার কৃষিজমিতে অবস্থান করছেন। কোনো ছাউনি ও নিরাপদ আশ্রয় ছাড়াই রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ফসলি জমিতে জমে থাকা পানিতে তাদের মানবেতর দিন কাটছে।

স্থানীয়রা জানান, আটকে থাকা ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছে। খোলা আকাশের নিচে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশুরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘তাদের যদি ভারতীয় আধার কার্ড থাকে, তাহলে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা কেন করা হচ্ছে? তারা যদি ভারতের নাগরিক হন, তাহলে ভারতকেই তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।’

আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি শামসুল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান ভারতের নাগরিক। তাদের এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা মোটেও মানবিক নয়। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া প্রয়োজন।’

বিজিবি জানায়, উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সঙ্গে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো কোনো সমাধান মেলেনি।

নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানায়, বড়বাড়ি সীমান্তে বিএসএফ ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক করা হলেও বিএসএফ তাঁদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমানে তারা ভারতের অভ্যন্তরে ভারতীয় ভূখণ্ডেই অবস্থান করছেন।


তথ্যসূত্র:
১। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে নিয়ে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে মানবিক সংকট
– https://tinyurl.com/586n

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাবনার সুজানগরে কৃষিজমিতে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি কৃষকদের
পরবর্তী নিবন্ধপাবনায় ট্রেন থেকে ৭২ লাখ টাকার হেরোইন উদ্ধার