
চাঁদাবাজি এখন আর কেবল ব্যবসাকেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বিস্তার ঘটেছে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি খাতে। ফুটপাত, কাঁচাবাজার, পরিবহন, অটোরিকশা, নদীর ঘাট, ময়লা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির ব্যাপকতায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে ধারাবাহিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আগে চাঁদাবাজিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাফিয়া গডফাদারদের আধিপত্য ছিল, এখন টোকাইরাও চাঁদাবাজিতে নেমেছে। বিশেষ করে নব্য চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীবাসী পুরোপুরি জিম্মি। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে লাগাতার হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা এবং অপরাধীদের দমনে দৃশ্যমান ব্যর্থতার কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ীসহ বেশকিছু এলাকা এখন সাধারণ মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
চাঁদা না দিলে মারধর, হুমকি-ধমকি এবং নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়ি করতে চাঁদা দিতে হয়, ব্যবসা শুরু করতে চাঁদা দিতে হয়, মাছ ধরতে গিয়েও চাঁদা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রকাশ্যে খুনের শিকার হচ্ছে খোদ রাজনৈতিক কর্মীরাও।
গত এক বছরের মধ্যে পল্লবীতে যুবদল নেতা ইউসুফ ও গোলাম কিবরিয়া, কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির, মৌচাকে বেল্লাল হোসেনসহ আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ছিল চাঁদাবাজির মতো কারণ।
পুলিশ সদর দপ্তরের বরাতে আমার দেশ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে চাঁদাবাজির ঘটনায় ৬৯৬টি মামলা হয়েছে এবং ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে ডিএমপির তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮, এপ্রিলে ৭১ এবং মে মাসে ৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে।
জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চাঁদা হিসেবে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা দখল কিংবা স্থানচ্যুত করার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতা।
যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় থানার পেছনে ওয়াসার পানির পাম্পসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করা জাকির হোসেন নামে একজন সাংবাদিকদের জানায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে তিনি আর সেখানে ব্যবসা করতে পারছেন না। নতুন করে দোকানের দখল রাখতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে স্থান ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ফলে ক্রেতাদের কাছে বাকিতে বিক্রি করা টাকাও তিনি আর আদায় করতে পারেন নি। পরে অন্যত্র বসে পাওনা তুলতে গেলে সেখানেও চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি যাত্রাবাড়ীই ছেড়ে চলে যান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এ চিত্র শুধু মাছের বাজারে নয়; কাঁচাবাজার, ফলের মার্কেট, মাছের আড়ত ও ফুটপাতজুড়েই নতুন নতুন হকার বসিয়ে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী এলাকা বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবীর নির্বাচনি এলাকা হলেও অন্য প্রভাবশালী নেতার নাম উল্লেখ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের দাবি, যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন খাতে ওই ব্যক্তির আশ্রয়ে শতাধিক চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে।
সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, জনপদের মোড় ও ধলপুর এলাকায় পরিবহন, বাজার ও ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ওই এলাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন পরিবহনকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা গুনতে হয়। সেই অর্থ স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে পুলিশ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
নিউমার্কেট এলাকাতেও দোকান দখল, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ বিল, পার্কিং ফি ও মাসিক ভাড়ার নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক হকারকে দিনে চারবার পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আওয়ামী লীগ-বিএনপি, পুলিশ এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী এক আইনজীবীর নামও উঠে এসেছে চাঁদাবাজের তালিকায়। তাদের চাঁদাবাজিতে দিশাহারা নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওই এলাকাসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকান দখল, চাঁদাবাজি, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মার্কেটে পুনর্বাসন ও বিদ্যুৎ বিলের নামে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অজুহাতে হাজার হাজার ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে রেখেছে এই বাহিনী।
ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু নিউ মার্কেটের ফুটপাত থেকেই দিনে কমপক্ষে ছয় লাখ টাকা চাঁদা তুলে মকবুল। এজন্য সে চাঁদা তোলা বাহিনীও গড়ে তুলেছে। মার্কেটের অভ্যন্তরেই ফুটপাতে প্রায় ৫০০ দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ বিল হিসেবে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এছাড়াও নিউ মার্কেটের ফুটপাতে পার্কিংয়ের জন্য প্রতিটি গাড়ি বাবদ ২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এসব চাঁদার রসিদে সিটি কর্পোরেশনের লোগো থাকলেও সেখানে তা জমা হয় না। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জানিয়েছে, চলাচলের রাস্তায় পার্কিং ফি আদায়ের জন্য তারা কাউকে অনুমোদন দেয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নিউ মার্কেটের ভেতরে ফুটপাতের ১৫০টি দোকান দখলে নিয়ে ভাড়া দিয়েছে মকবুল বাহিনী। প্রতিটি দোকানের মাসিক ভাড়া ২০ হাজার এবং অগ্রিম হিসাবে নেওয়া হয়েছে তিন লাখ টাকা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার জানান, পুরো নিউ মার্কেট এলাকায় ফুটপাতে ৮০০ থেকে ৮৫০ হকার রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের কাছে থেকে মাসে ভাড়া বাবদ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে নিচ্ছে মকবুলের লোকজন।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত ও জনপদে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় শিকার। প্রতিদিনের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চাঁদা হিসেবে চলে যাওয়ায় তারা আর্থিক সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এতে তারা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছেন। তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা, ভয় ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে খুন-খারাবি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৯ জুলাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সবুজবাগে এক বিএনপি কর্মী ও হাজারীবাগে এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডিএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দখলবাণিজ্যের পাশাপাশি চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীতে চাঁদাবাজির ২৩৬টি মামলা হয়েছে এবং প্রতি মাসেই মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের আটজন, ছাত্রদলের দুইজন, শ্রমিক দলের দুইজন, কৃষক দলের দুইজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুইজন ও তাঁতীদলের একজন রয়েছে। একই সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট এক হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় এক হাজার ২০০ চাঁদাবাজের সঙ্গে তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে ৩২৯ জন প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে ২১৭ জনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই ২১৭ জনের ২১৪ জন বিএনপির, দুইজন আওয়ামী লীগ এবং একজন বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে জানা গেছে। এছাড়াও পুলিশের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে রাজধানীতে ৩৫টি জায়গায়। মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও শাহ আলীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সদস্যরা সরাসরি চাঁদাবাজির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার পতনের পর ঢাকা শহরের আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কাঁচাবাজার, ফুটপাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক ১০০ টাকা থেকে শুরু করে মাসিক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। শিল্পাঞ্চলেও ঝুট ব্যবসা ও কারখানার পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
তথ্যসূত্র:
১। নব্য চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি রাজধানীবাসী, বাড়ছে হত্যা
– https://tinyurl.com/4u5fw29z


