পাঁচ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আফগানিস্তান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ইমারাতে ইসলামিয়ার নতুন অধ্যায়

0
2

১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন; ২০২১ সালের এই দিনে ইমারাতে ইসলামিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং আজ তার পঞ্চম বার্ষিকী। দীর্ঘ যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার ক্ষত বয়ে চলা আফগানিস্তান ইমারাতে ইসলামিয়ার গত পাঁচ বছরের শাসনে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের নতুন পথে এগিয়ে গেছে। দেশজুড়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আফগানির মুদ্রা শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি, বড় জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বৈদেশিক সহায়তা হ্রাস, বিপুল সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার মতো কঠিন চাপের মধ্যেও আফগান অর্থনীতি স্থিতিশীলতা ধরে রেখে প্রবৃদ্ধির ধারায় এগিয়ে চলেছে।

গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি হলো জাতীয় মুদ্রা আফগানির শক্তিশালী অবস্থান। ২০২১ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরুতে এক মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য ১৩০ আফগানি পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে তা ৬৫ দশমিক ০১ আফগানিতে নেমে এসেছে। একই সময়ে ২০২১ সালের প্রায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। এই স্থিতিশীলতা দেশের বাজারব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহেও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ছিল ১৪ হাজার কোটি আফগানি, ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৭ হাজার ২০০ কোটি আফগানিতে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, রাজস্ব সংগ্রহের বিস্তার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যক্রম জোরদার করার ফলে রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধির এই ধারাটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও আফগান অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির পথ ধরে রেখেছে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশটির অর্থনীতি প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক পথ বন্ধ হওয়া এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার মতো প্রতিকূলতা দেখা দিলেও মধ্য এশিয়ার দিকে বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তুলে অর্থনৈতিক লেনদেন সচল রাখা হয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কৃষি, জ্বালানি, পরিবহন, অবকাঠামো ও অন্যান্য মৌলিক খাতে নতুন সহযোগিতা ও চুক্তি আফগানিস্তানের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইমারাতে ইসলামিয়ার সাথে ইরান, চীন ও রাশিয়াও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।

গত পাঁচ বছরে ২৩ হাজারের অধিক স্কুল ও মাদ্রাসা সংস্কার করেছে ইমারাতে ইসলামিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত একক কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন করে প্রায় ৩০০ আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সকল মেয়েদের জন্য ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি মাদ্রাসায় মেয়েদের আরও উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সহশিক্ষামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা পর্যন্ত আধুনিক শিক্ষাকার্যক্রম মেয়েদের জন্য সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছে, যা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠলে পুনরায় চালু করার কথা জানিয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া।

আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় দিক হলো আঞ্চলিক সহযোগিতাকে ব্যবহার করে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানো। প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক সম্প্রসারণ, নতুন ট্রানজিটপথ সক্রিয় করা এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা আফগানিস্তানকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আত্মনির্ভরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে সমান্তরালে দেশজুড়ে বৃহৎ জাতীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। কুশ তেপা খাল, টাপি প্রকল্প, মহাসড়ক নির্মাণ, রেলপথ সম্প্রসারণ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিভিন্ন পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। নতুন ও অসমাপ্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় একদিকে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইমারাতে ইসলামিয়ার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব প্রকল্প শুধু বেকারত্বের চাপ কমাচ্ছে না, বরং পরিবারগুলোর আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোরও পথ তৈরি করছে। দেশের অভ্যন্তরে তরুণদের ধরে রাখার মাধ্যমে জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করার পরিবেশও তৈরি হচ্ছে।

কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কুশ তেপা খালের মতো বৃহৎ প্রকল্প আফগানিস্তানের কৃষি, সেচ ও খাদ্য উৎপাদনের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ, জ্বালানি, কৃষি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ অর্থনীতির ভিতকে আরও শক্তিশালী করছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণেও গত পাঁচ বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। পপি চাষে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের ফলে বৈধ ও উপকারী বিকল্প ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই পরিবর্তন দেশের কৃষিকে আরও উৎপাদনমুখী ও টেকসই পথে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সংস্কার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের অর্থ স্থানান্তর সহজ করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা, ব্যাংকে সঞ্চয় বৃদ্ধির প্রবণতা এবং বৈদ্যুতিক ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ আর্থিক খাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় ও আর্থিক সেবা খাতকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করার উদ্যোগ এবং ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণও অব্যাহত রয়েছে।

তবে এই অগ্রগতির পথ একেবারেই বাধামুক্ত ছিল না। আফগানিস্তানের বিপুল সম্পদ এখনো জব্দ রয়েছে এবং ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়াও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর পরও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নিজস্ব উৎপাদন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে দেশটি তার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করে চলেছে।

অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর করার পথও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর-সুবিধা, শিল্পনগরী, বিদ্যুৎ সরবরাহে সহজীকরণ, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা, নিরাপত্তা ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় উৎপাদনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গত পাঁচ বছরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এই যে, দীর্ঘ যুদ্ধের পর আফগানিস্তান শুধু টিকে থাকার লড়াই থেকে ধীরে ধীরে নির্মাণ, উৎপাদন ও উন্নয়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এখন অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

এছাড়াও আভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশকে সুসংহত করতে প্রতিনিয়ত আরও অসংখ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন তালেবান নেতৃত্বাধীন ইমারাতে ইসলামিয়ার সৎ, দক্ষ, উলামাদের সমন্বয়ে গঠিত প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ।

যার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং সর্বত্র যুদ্ধ-সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার মত বৈশ্বিক এই অস্থিতিশীল সময়ে ইমারাতে ইসলামিয়া শরিয়াহ আইন দ্বারা শাসন করে একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও বহু জাতি বহু ভাষায় বিভক্ত একটি জনপদকে ক্রমান্বয়ে আখিরাতের সফলতার সাথে সাথে দুনিয়াবি সফলতারও শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন; যা প্রমাণ করে ইসলামী শরিয়াহ এবং এর ধারকবাহক আল্লাহ্‌ভীরু মুসলিমগণই বিশ্বকে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে প্রকৃত শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পথ সফলতার সাথে দেখাতে সক্ষম।


তথ্যসূত্র

1.د ا.ا پنځه کلن مزل؛ اقتصادي ننګونې او پرمختګونه څه وو؟
– https://tinyurl.com/35vjxetf

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের উধমপুরে এক দখলদার ভারতীয় সেনাকে হত্যা করল তারই সহকর্মী
পরবর্তী নিবন্ধউত্তর-পূর্ব কেনিয়ায় মুখোমুখি লড়াইয়ে আশ-শাবাব ও কেনিয়ান বাহিনী