
কথিত সাংবাদিক মুন্নী সাহার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের এফডিআরে বা স্থায়ী আমানতের হিসাবে গরমিল পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের তথ্য থাকায় দুদকের পক্ষ থেকে তাকে তলব করা হয়। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। দুদকের পক্ষ থেকে তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, আয়কর রিটার্ন, আয়ের উৎস, মোট সম্পদসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট চাওয়া হয়। তার এফডিআরের প্রায় ১২ কোটি টাকার হিসাব মিলাতে পারেননি দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক সাবেকুল নাহার পারুল গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) আমার দেশকে জানায়, মুন্নী সাহার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান। আশা করি, শিগগিরই শেষ হবে।
দুদক জানায়, ২০২৫ কর বর্ষ পর্যন্ত মুন্নী সাহার নামে এক কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ ও ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ওই সময় পর্যন্ত তার গ্রহণযোগ্য আয় ছিল তিন কোটি ২৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা।
অন্যদিকে তার স্বামী কবীর হোসেনের নামে দুই কোটি ১২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ১৪ কোটি ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। মোট সম্পদ ১৬ কোটি ৬৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। তার গ্রহণযোগ্য আয় ছিল আট কোটি ১৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
এছাড়াও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মুন্নী সাহার একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ১২০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই অ্যাকাউন্টে এখন স্থিতি আছে ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ কোটি টাকার বৈধ উৎস দেখাতে পারেনি সে। মোট ১২০ কোটি টাকা ১৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। গুলশান ও কাওরান বাজারের ওয়ান ব্যাংকের শাখা থেকে এই মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
বিধিবহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগে মুন্নী সাহার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইতোমধ্যে জব্দ করেছে বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। কাওরান বাজার ওয়ান ব্যাংকের শাখায় মুন্নী সাহার স্বামী কবির হোসেনের মালিকানাধীন এমএস প্রমোশনের নামে ২০১৭ সালের ২ মে একটি হিসাব খোলা হয়। যেখানে নমিনি হিসেবে নাম রয়েছে মুন্নী সাহার।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় মাহফুজুল হকের মালিকানায় প্রাইম ট্রেডার্সের নামে ২০০৪ সালের ২১ জুলাই একটি হিসাব খোলা হয়। এই হিসাবে ১৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা স্থিতি রয়েছে।
দুদকের উপ-পরিচালক ইয়াছির আরাফাত আদালতে মুন্নী সাহা ও তার স্বামীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়েছে, মুন্নী সাহা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করেছে। যেটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ১০ ও ১৪ ধারায় সে অপরাধ করেছে। এছাড়াও মুন্নী সাহার ডুপ্লেক্স বাড়ি ক্রয়ের আয়ের উৎস জানতে চেয়েছে কমিশন।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই মুন্নী সাহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদে সে কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছে। তার আয়ের সঙ্গে টাকার পরিমাণ কীভাবে বেশি হলো এবং এফডিআরে ১২ কোটি টাকা কীভাবে বেশি হলো তার সঠিক উত্তর সে দিতে পারেনি। সে সময় চেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন কমিশনার জানায়, দুদক আগামী এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করবে। অনুসন্ধানের অগ্রগতি হয়েছে। মুন্নী সাহার কাছে তার আয়-ব্যয়ের ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধান ঠেকাতে নানা মাধ্যমে তদবির শুরু করেছে মুন্নী সাহা। নতুন সরকার আসার পর এই তদবিরের গতি আরো বেড়েছে। নানা মাধ্যমে চাপ দেওয়া হচ্ছে কমিশনে। কিন্তু দুদক তার অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মুন্নী সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, মুন্নী সাহাকে এটিএন নিউজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে শিক্ষার্থী নাঈম হাওলাদার নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলার আসামি সে। কয়েক মাস আগে কারওয়ান বাজারে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন করলে ডিবি পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়েছিল। পরে মুচলেকায় ছাড়া পায়।
তথ্যসূত্র:
১। মুন্নী সাহার অ্যাকাউন্ট থেকে ১২০ কোটি টাকা উত্তোলন
– https://tinyurl.com/bdcp8hm3


