দেশের বাজারের প্যাকেটজাত খাবারে মাত্রাতিরিক্ত লবণ-চিনির উপস্থিতি: জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে

0
13

দেশের বাজারে বিপণন করা প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। যেখানে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবারে সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ, সেখানে এসব খাবারে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেটজাত খাবারের মধ্যে রয়েছে বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, নুডুলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, ঝালমুড়ি, আচার, চাটনি ইত্যাদি।

এসব খাবারে ব্যবহৃত কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ ও কেমিক্যাল হৃদরোগের পাশাপাশি মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি আমাদের শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে এক নীরব বিপর্যয় ডেকে আনছে। টিফিনে দেওয়া চিপস বা কৃত্রিম জুস তাদের স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দৈনিক আমার দেশ এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ পরিচালিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব সল্ট কন্টেন্ট অ্যান্ড লেবেল কমপ্লায়েন্স অব কমনলি কনজিউমড প্রসেসড প্যাকেজড ফুডস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে এ উদ্বেগজনক তথ্য।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এনএইচএফবি) একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে থাকা প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে ‘পুষ্টিগুণ’ বা ‘লবণের মাত্রা’ সংক্রান্ত যে তথ্য দেওয়া থাকে, ল্যাবে পরীক্ষার পর তার সত্যতা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ‘সুগার ফ্রি’ বা ‘লো ফ্যাট’ দাবি করা অনেক খাবারেও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যালের উপস্থিতি মিলেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় শতকরা ৯৭ ভাগ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্যে উচ্চমাত্রার লবণ রয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো—পণ্যের মোড়কে এ তথ্য সব সময় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকে না।

প্যাকেটজাত খাবার সুস্বাদু করতে এতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি প্যাকেটজাত চিপস বা নুডুলসে যে পরিমাণ লবণ থাকে, তা একজন মানুষের সারাদিনের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত সোডিয়াম সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃৎপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুরা পছন্দ করে এমন এক হাজার প্যাকেটজাত শিশুখাদ্য বেছে নেওয়া হয় এ গবেষণায়। এর মধ্যে ছিল ম্যাকারনি, প্যাকেটজাত পনির, মিনি হট ডগস, কেক, ক্রেকার্স এবং প্যাকেটজাত দই। তবে এক্ষেত্রে কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করেননি গবেষকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাকেটজাত ১০ ধরনের শিশুখাদ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লবণ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি প্যাকেটে ২১০ মিলিগ্রাম লবণ ও সোডিয়াম থাকা দরকার। কিন্তু এসব প্যাকেটে রয়েছে ৩৬১ মিলিগ্রাম লবণ ও সোডিয়াম যা সাধারণ পরিমাণের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ভাগ বেশি।

গবেষণায় বলা হয়েছে, মূলত বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নির্ধারণ করা নেই। যার ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে ইচ্ছেমতো লবণ যোগ করে। যদিও মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০১৭ অনুসারে প্রক্রিয়াজাত খাবারে বিদ্যমান লবণের পরিমাণ মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।

অতি প্রসেসড খাবার রক্তে ‘হাই সেনসিটিভ সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন’ বা এইচএস-সিআরপির মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রোটিনকে হৃদরোগের অন্যতম বড় পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়। রক্তে এর উপস্থিতি মানেই হলো, আপনার হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালিতে বড় ধরনের অস্থিরতা চলছে, যা যেকোনো মুহূর্তে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঘটাতে পারে।


তথ্যসূত্র:
১। প্যাকেটজাত খাবারে মাত্রাতিরিক্ত লবণ-চিনি
– https://tinyurl.com/ym9f8h4s

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রথমবারের মতো ইরাকে ১ লাখ মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করল ইমারাতে ইসলামিয়া
পরবর্তী নিবন্ধবেনিনে জেএনআইএম মুজাহিদদের সামরিক অপারেশন: নিহত ৭ বেনিনীয় সৈন্য