
শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শিক্ষক, ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার ৩৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক ‘শ্রম আইনে অসংজ্ঞায়িত ও ইসলামবিরুদ্ধ জেন্ডার পরিভাষা নারীর নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করবে’ শিরোনামে বিবৃতি প্রদান করেছেন। মঙ্গলবার (১২ মে) এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
দৈনিক আমার দেশ সূত্রে জানা যায়, মূল্যবোধ আন্দোলনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাতের পাঠানো এ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের সচেতন, দায়িত্বশীল ও মূল্যবোধনিষ্ঠ নাগরিকগণ গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ দিকে জারিকৃত ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে, যেখানে কোনো প্রকার স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান ছাড়াই ‘জেন্ডার’, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’ এবং ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’—এই এলজিবিটিবান্ধব পরিভাষাগুলো সংযোজন করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’ এমন একটি ধারণা, যেখানে নারী-পুরুষের বাইরে আরো বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যেমন ‘ট্রান্সজেন্ডার’। অন্যদিকে পোশাক, সাজসজ্জা বা আচরণের মাধ্যমে নিজের জেন্ডার পরিচয় প্রকাশ করাকে ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’ বলা হয়। শ্রম আইন হওয়া উচিত শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রাযুক্তিক আইন। সেখানে এমন বিতর্কিত ধারণা যুক্ত করা বাঞ্ছনীয় নয় যা আইনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মতাদর্শিক বিতর্কের মধ্যে নিয়ে যায় এবং সমাজে বিভাজন ও মূল্যবোধগত সংঘাত সৃষ্টি করে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইন একটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন দলিল হওয়া উচিত। কিন্তু সংশোধিত এই আইনের কোথাও ‘জেন্ডার’, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’, ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’, ‘বৈষম্যমূলক জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ কিংবা ‘জেন্ডারভিত্তিক অন্যান্য আচরণ’—এসব পরিভাষার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। বরং এগুলোকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে দেশের প্রচলিত ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন ধারণা বা আচরণ—বিশেষত ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও সমকামিতা—পরোক্ষভাবে বৈধতা পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই সংশোধিত শ্রম আইনের কারণে একজন জন্মগত পুরুষ নিজেকে নারী দাবি করে কর্মক্ষেত্রে নারীর পোশাক ও সাজসজ্জা গ্রহণ করতে পারবে, নারীদের টয়লেট ব্যবহার করতে পারবে কিংবা নারীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে পারবে। এ ধরনের আচরণে বাধা দিলে বা আপত্তি জানালে সেটিকে ‘জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও হয়রানি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আইনগত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এই সংশোধনী নারীর নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৩৩০ জন নাগরিকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে আইন প্রণয়ন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। উল্লেখ্য সারাবিশ্বের উলামায়ে কেরাম ‘ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ’-কে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একইভাবে ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’র নামে নারীকে পুরুষের এবং পুরুষকে নারীর বেশভূষা ও সাজসজ্জা গ্রহণের অনুমোদন ইসলামে নিষিদ্ধ, গর্হিত ও অভিশাপের কাজ হিসেবে বিবেচিত।
দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই—এই অতি সংবেদনশীল বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ, নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে ‘লিঙ্গ’ ও ‘জেন্ডার’ পরিভাষার সুস্পষ্ট ও আইনগত সংজ্ঞা নির্ধারণ করুন এবং অবিলম্বে ‘শ্রম আইন, ২০০৬’ থেকে বিতর্কিত ও অসংজ্ঞায়িত পরিভাষাগুলো অপসারণ বা সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করুন।
বিবৃতি প্রদানকারীদের নামের তালিকা মূল্যবোধ ডট কম (mullobodh.com) সাইটে প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতি প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের মধ্যে ১৯ জন অধ্যাপক, ১৫ জন সহযোগী অধ্যাপক ও ১৯ জন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন।
বিবৃতি প্রদানকারীদের মধ্যে রয়েছেন— বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, ড্যাফোডিল ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মোখতার আহমাদ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, ধানমন্ডির মসজিদ-উত-তাকওয়া সোসাইটির খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, পল্লবীর মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্সের খতিব আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামিমা তাসনীম, মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও আইইবির অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শামসুন্নাহার মিতুল ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তাহিরা ফারজানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গালিব, ঢাকা নিউমার্কেটের বায়তুল মামুর মসজিদের খতিব মাওলানা হাসান জামিল, জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ির শিক্ষক মুফতি রেজাউল কারীম আবরারসহ অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিকরা।
তথ্যসূত্র:
১। শ্রম আইনের জেন্ডার পরিভাষা নিয়ে ৩৩০ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ
– https://tinyurl.com/34nbhhv9


