
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
সম্প্রতি সাত বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের সামাজিক বিবেককে এক চরম ও বেদনাদায়ক ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রতিটি সচেতন মুসলিম ও বিবেকবান মানুষের অন্তরে আজ এই একটিই জ্বলন্ত প্রশ্ন তীব্রভাবে আবর্তিত হচ্ছে—এই পৈশাচিক বর্বরতার বিচার আসলে কীভাবে সম্পন্ন হবে? যে চরম নৃশংসতার শিকার হয়ে একটি ফুটফুটে শিশুকে অকালে প্রাণ হারাতে হলো, মানব রচিত এই ঘুণে ধরা সমাজে তার কি আদৌ কোনো প্রকৃত ইনসাফ মিলবে? এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রামিসার ভাগ্যাহত ও শোকার্ত বাবার যে আকুল অভিব্যক্তি এবং হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারে তাঁর যে তীব্র আকুতি, তা মূলত এ দেশের মজলুম ও শোষিত তাওহিদী জনতারই বুকফাটা প্রতিধ্বনি। একজন বাবা যখন তাঁর কলিজার টুকরোকে এমন নৃশংসভাবে হারান, তখন অপরাধীর জন্য কেবল কাগজের কলমের নামমাত্র শাস্তি বা স্রেফ বন্দিদশা তিনি চান না; বরং তিনি এমন এক অমোঘ প্রতিবিধান কামনা করেন, যা তাঁর দগ্ধ কলিজায় কিছুটা হলেও শীতলতা এনে দিতে পারে এবং সমাজে এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
কিন্তু আমাদের এই বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো কি সেই কাঙ্ক্ষিত সান্ত্বনা বা ইনসাফ দিতে বিন্দুমাত্র সক্ষম? বর্তমান জরাজীর্ণ, পশ্চিমা-অনুকৃত আইনি ব্যবস্থার দিকে তাকালে চরম নৈরাশ্য ও হতাশা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই এক্সিস্টিং সিস্টেমে এই জঘন্য অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়তো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হবে; কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত রায়টুকু পেতে ঠিক কতটা দীর্ঘ বছর ও যুগ পার হবে, তা এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বছরের পর বছর ধরে চলা মামলার অন্তহীন দীর্ঘসূত্রতা, আইনজীবীদের কূটকৌশল ও আইনি মারপ্যাঁচ, সাক্ষ্য-প্রমাণের নামে হয়রানিমূলক জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বিচার প্রক্রিয়া এতটাই মন্থর ও স্থবির হয়ে পড়ে যে, একসময় ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচারের আশা ছেড়েই দিতে বাধ্য হয়। এই মানব রচিত ব্যবস্থায় বিলম্বিত বিচার মূলত ন্যায়বিচারকে সুকৌশলে অস্বীকার করারই শামিল, যা প্রকারান্তরে খুনি ও অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে এবং নিহতের স্বজনদের প্রতিনিয়ত এক যন্ত্রণাদায়ক কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়।
অথচ এই সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনি পরিমণ্ডলে যদি আজ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অবতীর্ণ করা শরিয়াহ’র নিখুঁত বিচার ব্যবস্থা কার্যকর থাকত, তবে পুরো দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ইনসাফপূর্ণ হতো। শরিয়াহ আইনের ঐশ্বরিক ও অমোঘ বিধানে এই ধরনের জঘন্য ও সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো অত্যন্ত দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রকাশ্য রাজপথে। সেখানে বছরের পর বছর সময় অপচয় করার কিংবা অপরাধীকে বাঁচানোর কোনো লুপহোল বা সুযোগ নেই। শরিয়াহর নিখুঁত ও ইনসাফভিত্তিক আইনি কাঠামোতে হত্যার ক্ষেত্রে নিহতের অভিভাবকের অভিব্যক্তি, অধিকার ও চাওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও আইনি প্রধান্য দেওয়া হতো। শুধু খুনের ঘটনা হলে পবিত্র কুরআনের বিধান—’কিসাস’ বা সমদণ্ডের ঐশ্বরিক নীতি অনুযায়ী, অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে নিহতের অভিভাবকের সিদ্ধান্তই হতো চূড়ান্ত এবং বাধ্যতামূলক। খুনিকে কি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, নাকি রক্তপণ (দিয়াত) নিয়ে ক্ষমা করা হবে—এই পূর্ণ ইখতিয়ার ও ক্ষমতা আদালত কেবল নিহতের অভিভাবকের হাতেই ন্যস্ত করত। এই শরিয়াহ ব্যবস্থার ফলে বিচারের প্রতিটি স্তরে ভুক্তভোগীর পরিবার নিজেদের প্রকৃত অধিকার ও কর্তৃত্ব অনুভব করত, যা বুকচেরা হাহাকারের বিপরীতে তাদের ক্ষতবিক্ষত অন্তরে এক পরম ঐশ্বরিক প্রশান্তি ও চিরন্তন স্বস্তি নামিয়ে আনত। আর বিবাহিত অপরাধী ধর্ষন করলে সে ক্ষেত্রে আর তাকে কোনোভাবেই ক্ষমা করা হতনা, বরং রজম করে হত্যা করা হত। জোরপূর্বক ধর্ষণ বা বলাৎকার করে হত্যা করে হলে সেটাকে “হিরাবাহ” হিসেবে বিবেচনা করা হত, এবং ক্ষমার কোনো অপশন রাখা হতনা, বরং প্রকাশ্যে অপরাধীর প্রাণদণ্ড নিশ্চিত করা হত।
আজকের এই ভয়াবহ নৈতিক ও সামাজিক সংকটের মূল কারণ গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট দেখা যায়, আমাদের বিদ্যমান সেক্যুলার শাসন কাঠামো, চরম ভোগবাদী পুঁজিবাদী সমাজ এবং পশ্চিমা ডেমোক্রেটিক বা গণতান্ত্রিক দেউলিয়াত্ব মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রকৃত ইনসাফ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আল্লাহভীতিহীন এই আধুনিক ভোগবাদী সমাজ মানুষকে পশুর চেয়েও অধম ও হিংস্র হতে শিখিয়েছে, যেখানে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও ইসলামী নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে তৈরি করা মানব রচিত এই কুফরী গণতান্ত্রিক আইন আজ অর্থ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে পুরোপুরি জিম্মি— যা কখনো সাধারণ ও মজলুম মানুষের জন্য প্রকৃত ন্যায্যতা বয়ে আনতে পারে না। সমাজে চলমান অপরাধের এই সর্বগ্রাসী ও ভয়াবহ সয়লাবের একমাত্র ও মূল কারণ হলো—ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দেওয়া ঐশ্বরিক শরিয়াহ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
অতএব, সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা অপরাধের মূলোৎপাটন, জননিরাপত্তা রক্ষা এবং জমিনে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের শরিয়াহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা আজ অনস্বীকার্য এবং অপরিহার্য। শরিয়াহ কেবল কতগুলো শুষ্ক দণ্ডবিধির সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজকে ভেতর থেকে পরিশুদ্ধ করার এক ঐশ্বরিক রক্ষাকবচ। এর কঠোর, তাৎক্ষণিক ও প্রকাশ্য শাস্তি সমাজে এমন এক গভীর ভীতি ও দৃষ্টান্ত তৈরি করে, যা অন্য যে কোনো সম্ভাব্য অপরাধীকে অপরাধের অন্ধকার পথ থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে রাখে। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা এই মানব রচিত অসাড়, পঙ্গু ও ইনসাফহীন বিচার ব্যবস্থা ভেঙে আল্লাহর দেওয়া ইনসাফপূর্ণ ও বরকতময় শরিয়াহ আইনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছি, ততক্ষণ রামিসাদের মতো নিষ্পাপ শিশুদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া এবং তাদের শোকসন্তপ্ত অভিভাবকদের দগ্ধ অন্তর প্রশান্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।


