
অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি কারাগারে আটক থাকার পর মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনি আন্দোলনকর্মী আবদুল্লাহ শাতাত। তবে মুক্তির কিছুক্ষণ পরেই তিনি জ্ঞান হারান। অনলাইনে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শীর্ণ ও দিশেহারা অবস্থায় কারাগার থেকে বের হওয়ার পরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এই ঘটনা আবারও ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের ‘প্রশাসনিক আটকাদেশে’ বন্দি রাখার বর্বর এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি একে ইসরায়েলের কথিত ‘বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থার’ অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি পুরুষ, নারী ও শিশু ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
এদিকে চলতি জুন মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আল জাজিরা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও অপমানজনক আচরণের বহু ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সাক্ষ্যও তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে প্রিজনার্স ক্লাব জানিয়েছে, ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের ক্রমবর্ধমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণে বিশেষ করে নারী বন্দিদের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তারা জানিয়েছে, গর্ভবতী নারী বন্দিদেরও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়। ফলে অনেক বন্দি মারাত্মক ওজন হ্রাস, শারীরিক দুর্বলতা ও চরম ক্লান্তিতে ভুগছেন। এছাড়া গর্ভবতী নারীসহ সব নারী বন্দিকে নগ্ন করে তল্লাশি করা হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
হুররিয়াত সেন্টার ফর ডিফেন্স এর পরিচালক হেলমি আল-আরাজ বলেন, চিকিৎসা অবহেলা, অনাহার, একাকী বন্দিত্ব এবং ঘন ঘন অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে নারী বন্দিদের ওপর এমন নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যা সব মানবিক সীমা অতিক্রম করেছে। তার মতে, এসব নির্যাতন পূর্বেও ছিল, তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্যালেস্টিনিয়ান কমিশন অব ডিটেইনিস অ্যান্ড এক্স-ডিটেইনিস অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারে ৯ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৩ জন নারী এবং ৩৫০ জনের বেশি শিশু। গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৭৬৫ জনেরও বেশি নারী ও শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট বন্দিদের প্রায় অর্ধেকই প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় বন্দি, অর্থাৎ কোনো অভিযোগ, বিচার বা আদালতের রায় ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল ধরে নবায়নযোগ্য আদেশে তাদের আটক রাখা হয়েছে।
আবদুল্লাহ শাতাতের মুক্তির পর তার শারীরিক অবস্থার যে দৃশ্য বিশ্ববাসীর সামনে এসেছে, তা ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, হাজারো ফিলিস্তিনি এখনো একই ধরনের বন্দিত্ব ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা অব্যাহত থাকলে এই মানবিক সংকট আরও গভীর হবে এবং বন্দিদের মৌলিক অধিকার রক্ষার পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র
1. Moment of prisoner Abdullah Shatat’s fainting after his release from occupation prisons
– https://tinyurl.com/3hm59m4z


