হাটহাজারিতে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার দাবিতে আন্দোলন, আনাস মাদানীকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত

0
582
হাটহাজারিতে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার দাবিতে আন্দোলন, আনাস মাদানীকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় দুর্নীতিবাজদের উৎখাতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার জোহরের পর ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলনের ডাক দেন তারা।

বৃদ্ধ পিতার অসুস্থতার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে হাটহাজারী মাদরাসা ও কওমী অঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছেন আল্লামা আহমদ শফীর (দা.বা.) ছেলে আনাস মাদানী। তার পৃষ্ঠপোষকতা ও নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কওমী অঙ্গনে। বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, অন্যায়ভাবে অর্থসম্পদ আত্মসাৎ, সত্যনিষ্ঠ শিক্ষকদের হয়রানি, বিনা দোষে মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করা, অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের হাতে ক্ষমতা ও শিক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করাসহ আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মতো প্রখ্যাত মুত্তাকি আলেমকে নানাভাবে অবজ্ঞা ও হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

এসকল অপকর্মের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ফুঁসছিলেন কওমি অঙ্গনের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এরই প্রেক্ষিতে বুধবার হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্রবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামেন। ফটক বন্ধ করে তারা মাদরাসার ভেতরে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করতে থাকেন। আন্দোলনকালীন ক্যাম্পাসের বাইরে সরকারের র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি আলাদা শঙ্কা তৈরি করে। যদিও সরকারি বাহিনী এখন পর্যন্ত আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করেনি, তবে তাদের উপস্থিতিতে শংকিত হয়ে অনেকে ৫ই মে-র কালোরাতের কথা স্মরণ করছেন। ২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকায় সরকারের পোষ্য বাহিনী ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। এরকম কোনো গণহত্যার পুনরাবৃত্তি চান না তারা। তাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সরকারি বাহিনীকে বার বার অনুরোধ করেছেন যেন তাদের এই ন্যায্য আন্দোলনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করা হয়।

এদিকে, সারাদেশের সচেতন ছাত্র-শিক্ষক হাটহাজারীর এই ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। ইসলামি অঙ্গনের লেখক, বরেণ্য আলিম, সচেতন মুসলিম—সকলে এই আন্দোলনকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়েছেন। হাটহাজারী এলাকার সচেতন জনসাধারণও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মাদরাসায় আন্দোলনরত ছাত্রদেরকে জরুরি খাবার সরবরাহ করেছেন।

এসময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রাণের শিক্ষাঙ্গনকে দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে ৫ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলো হলো,

১. মাওলানা আনাস মাদানীকে অনতিবিলম্বে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করতে হবে।
২. ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে এবং সকল প্রকার হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৩. আল্লামা আহমদ শফী সাহেব অক্ষম হওয়ায় মহাপরিচালকের পদ থেকে তাঁকে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে রাখতে হবে।
৪. শিক্ষকদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ-বিয়োগকে শুরার কাছে পূর্ণ ন্যস্ত করতে হবে।
৫. বিগত শুরার হক্কানী আলেমদেরকে পুনর্বহাল ও বিতর্কিত সদস্যদের পদচ্যুত করতে হবে।

এদিকে চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গতকালই কয়েকজন সদস্য নিয়ে শুরার জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে তারা দুটি দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং আগামী শনিবার বাকি শুরা সদস্যদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানান। রাত ১০টা নাগাদ শুরার অন্যতম সদস্য মাওলানা নোমান ফয়েজী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে শুরার এ সিদ্ধান্ত পাঠ করে শোনান। এখন পর্যন্ত যে দাবিগুলো মানার ঘোষণা এসেছে তা হলো-

১ মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আনাস মাদানীকে মাদরাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
২ আজ থেকে হাটহাজারীতে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থীকে হয়রানী না করা।

তবে সবগুলো দাবি মেনে নেওয়ার আগ পর্যন্ত মাদরাসার ক্লাস ও পরীক্ষাসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এছাড়া এরকম ন্যায্য আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি করা হলে দেশের সকল মাদরাসায় আন্দোলনের দাবানল জ্বলে ওঠবে এবং দাবি আদায়ে জেল-জুলুমসহ সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকারের জন্যও ছাত্ররা প্রস্তুত বলেও জানিয়ে রেখেছেন আন্দোলনকারীরা।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের এমন ন্যায্য আন্দোলন ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রোণিতদিতভাবে মিথ্যাচার করছে দেশের হলুদ মিডিয়াগুলো। ইসলামবিদ্বেষী পত্রিকা বিবিসি বাংলা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার ছাত্র-আন্দোলনকে তারা নেতৃত্ব বা ক্ষমতা দখলের লড়াই বলে উপস্থাপন করছে। হলুদ মিডিয়ার এমন নিকৃষ্ট আচরণের নিন্দা জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

সর্বশেষ তথ্যমতে, আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে হাটহাজারী মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করার আভাস পেয়ে ছাত্ররা আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে আবারো আন্দোলনে নেমেছেন। তারা এখন শনিবারে অনুষ্ঠিতব্য শুরা বৈঠকের জন্য অপেক্ষা করতে নারাজ; বরং আজই শুরা সদস্যদের হেলিকপ্টারে নিয়ে এসে শুরা বৈঠক আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন