ইসলামের তারকাগণ।।পর্ব-২০।। দাগিস্তানের সিংহ ইমাম শামিল রাহিমাহুল্লাহ (দ্বিতীয় কিস্তি)

3
909

(সংক্ষিপ্ত পরিচিতি) ইমাম শামিল- একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। ১৮৩৪ সাল থেকে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক লড়াকু যোদ্ধা ইমাম শামিল। আগ্রাসী রাশিয়ার অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্রও অকেজো হয়ে পড়েছিল যে মহান বীরের নগন্য ও আদিযুগের যুদ্ধাস্ত্রের সামনে, তিনিই হলেন ইমাম শামিল। রাশিয়ার রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অজপাড়া গাঁয়ের কুঁড়েঘর পর্যন্ত সবার কাছেই যিনি “শেরে দাগিস্তান” বা দাগিস্তানের সিংহ নামে পরিচিত, তিনিই ইমাম শামিল। ইতিহাসে আজও তিনি আযাদীর শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার হিসেবেই প্রসিদ্ধ। আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক মনে করা হয় তাঁকে। যুগের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও অভিনব রণকৌশল মুখ থুবড়ে পড়েছিল এই মহান বীরের সামনে। সন্ত্রাসী রাশিয়ার এমন কেউ ছিল না, যে ইমাম শামিলকে ভয় করত না। রাশিয়ার সৈনিকদের জন্য তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। রাশিয়ার মায়েরা নিজ সন্তানদের ঘুম পাড়াত ইমাম শামিলের নাম শুনিয়ে।

(পূর্বের পর্বের পর)নতুন বিন্যাস ও নতুন ইউনিফর্ম:

গিমরীর রণাঙ্গনে গাজী মুহাম্মাদ পরাজিত হলে গিমরীসহ পুরা দাগিস্তানে রাশিয়ার বিজয় কেতন উড্ডীন হয়। পাহাড়ের অলি-গলি ও বন-জঙ্গল, সব জায়গায় শুধু রুশসেনা আর রুশসেনা। মুজাহিদদের সব কাজ-কর্ম বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল দাগিস্তানবাসীকে জেগে ওঠার দ্বিতীয় কোন সুযোগ দেবে না রাশিয়া। এমন করুণ মুহূর্তে আল্লাহ তা’আলার গায়েবী মদদ নেমে আসে মুজাহিদদের জন্য। বন্য পরিবেশ রুশসেনাদের প্রতিকূলে চলে যায়। সেই সাথে মশা ও বন্য পোকামাকড়ের উপদ্রবে দিশেহারা হয়ে পড়ে রাশিয়ান বাহিনী। হাজার হাজার রুশসেনা আহত ও নিহত হতে থাকে প্রতিনিয়ত। অবস্থা বেগতিক দেখে দাগিস্তানের বন্য এলাকা ছেড়ে পেছনে সরে আসতে বাধ্য হয় তারা। এই ফাঁকে হামযাহ বেগ ইমাম নিযুক্ত হয়ে জিহাদের পতাকা উত্তোলন করেন। তার ইন্তেকালের পর জিহাদের ঝাণ্ডা তুলে নেন বীরশ্রেষ্ঠ ইমাম শামিল রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তার মুজাহিদ বাহিনীর জন্য নতুন ইউনিফর্ম, নতুন পতাকা নির্বাচন করেন। বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন নতুন আঙ্গিকে। দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে তাঁর জিহাদী আন্দোলন।

ইমাম শামিল তার বাহিনীকে যেভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন তা ছিল মোটামুটি এরকম- তিনি নিজে কমাণ্ডার ইন চীফ। তার অধীনে একশত কমাণ্ডার। এদেরকে বলা হত নায়েব। প্রত্যেক নায়েবের অধীনে আবার দশজন করে কমাণ্ডার। এদেরকে বলা হত মুরশিদ। প্রত্যেক মুরশিদের অধীনে ছিল একশ করে মুজাহিদ। মুরশিদ পদে যারা উন্নীত হতে পারত তারা কমাণ্ড করার অধিকার লাভ করত। তবে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল মুজাহিদদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং অধীনস্থদের মুরশিদদের পদে উন্নীত করতে দক্ষ করে গড়ে তোলা। মুজাহিদদের সংখ্যা বেড়ে গেলে মুরশিদদের সংখ্যাও বেড়ে যেত। সাধারণ সৈনিকদের মুরশিদ এবং মুরশিদদের নায়েব পদে উন্নীত হতে হলে অসাধারণ মেধা, বীরত্ব ও যোগ্যতার পারাকাষ্ঠা দেখাতে হতো। যে সৈনিক রণাঙ্গনে দুশমনের সারিতে ঢুকে তাদের বিপুল ক্ষতিসাধন করে শুধু জীবন্ত ফিরেই আসতে পারত না বরং তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারত তারাই কেবল পদোন্নতি পেত।

রুশসেনাদের তুলনায় ইমাম শামিলের সেনা সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। কোনো যুদ্ধে লড়াই হত বিশজন ও একজনের মাঝে। কোথাও হত একশজন ও একজনের মাঝে। অস্ত্রেও ছিল হাতি-পিপড়ার পার্থক্য। রাশিয়ানরা ব্যবহার করত আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। পক্ষান্তরে ইমাম শামিল ব্যবহার করতেন তরবারি, খঞ্জর ও জংধরা পুরাতন বন্দুক।

সালারদের উপদেশ দিতে গিয়ে একবার তিনি যুদ্ধের কৌশল শিক্ষা দিচ্ছিলেন এভাবে- জনবল আমাদের নিতান্তই কম। অস্ত্রশস্ত্র নাই বললেই চলে৷ দুশমনের হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে এনে তা দিয়েই তাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। সে-লক্ষ্যে আমাদের বাজের মত ছোঁ মারা, সিংহের মত লড়াই করা এবং ঝড়ের মত ছুটে চলা শিখতে হবে।

ইমাম শামিলের সাধারণ সৈনিকদের ইউনিফর্ম ছিল মেটে রঙের। মুরশিদ ও নায়েবগণ কালো ইউনিফর্ম পরিধান করতেন। তবে সিপাহী ও সিপাহসালার, প্রত্যেকেই ইউনিফর্মের উপর কালো আবা ব্যবহার করতেন। তাদের পতাকাও ছিল কালো। কালো ইউনিফর্মের সাথে কালো পতাকা দেখলে যে কারো অন্তরে ভয় ঢুকে যেত। ইমাম শামিল চাইতেনও তা। রাশিয়া দশ লাখ প্রশিক্ষিত সৈন্য কাফকাজ প্রেরণ করে। এর বিপরীতে ইমাম শামিলের সৈন্য ছিল মাত্র কয়েক হাজার।

ইমাম শামিলকে আল্লাহ তা’আলা ভাষা-বাগ্নিতা ও সুঠাম স্বাস্থ্য-শরীর দান করেছেন। তিনি লড়াই করেন সিংহের মত। দৌড়ান চিতার মত আর কথা বলেন জাদুকরের মত। তার কথা শোনে শ্রোতারা উদ্বেলিত হয়। জাদুকরী প্রভাব পড়ে তাদের উপর। দলে দলে যোগ দিতে আরম্ভ করে তার মুজাহিদ বাহিনীতে। তিনি বিভিন্ন গোত্রকে শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে আগ বেড়ে শত্রুর উপর আক্রমণ করার নীতি এড়িয়ে তিনি জোরদার প্রস্তুতি নেবার প্রতিই বেশি মনোনিবেশ করেন।

উখলগু:

ইমাম শামিল গিমরীর পরিবর্তে উখলগুকে নিজ মিশনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন। উখলগু গ্রামটি একটি পাহাড়ে অবস্থিত। কুদরতিভাবে এই পাহাড়টি তিনদিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত। একদিকে একটি গভীর অথচ অপ্রশস্ত নদী পাহাড়টিকে অন্য আরেকটি পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। নিচ থেকে তৈরী হওয়া একটি সংকীর্ণ ও সরু গলিপথ এই পাহাড়ে আসা-যাওয়ার মূল রাস্তা।

এখানে ইমাম শামিলের আরেকটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তিনি প্রথম ইমামের সাথে মিল রেখে তার নাম রাখেন গাজী মুহাম্মাদ। একস্থান থেকে অপর স্থানে দ্রুত সংবাদ সরবরাহের জন্য তিনি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরী করেন। শক্তিশালী গোয়েন্দা বিভাগ তৈরী করেন। ফলে দুশমনের যে কোন তৎপরতা খুব দ্রুতই পৌঁছে যায় তার কাছে। আর তিনি সেভাবেই মুজাহিদদের প্রস্তুত করেন।

গেরিলা যুদ্ধ ও শত্রুবাহিনীর নাজেহাল অবস্থা:

ইমাম শামিলের প্রস্তুতি  একটা পর্যায়ে পৌঁছে যাবার পর  তার নির্দেশে নায়েবগণ সীমিত আকারে গেরিলা আক্রমণ শুরু করে দেন।  একেকসময় একেক রুশ সেনাবহরে আক্রমণের ঘটনা ঘটতে থাকে। মুজাহিদ বাহিনী সংখ্যায় একেবারেই কম, কিন্তু তারা আক্রমণ করে সিংহের মত। অতর্কিত আক্রমণ করে দুশমনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে হাওয়ার মত হারিয়ে যায় গহীন বনজঙ্গলে।রাশিয়ানরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের হাজার হাজার সৈনিক মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে কাতরাতে থাকে।

একবার তিন হাজার রুশসেনা একদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সাথে ছিল ভারী তোপ ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র। তারা যখন একটি সংকীর্ণ গলিপথ অতিক্রম করছিল তখন রাস্তার দু’পাশ থেকে ৪০/৫০ জন অশ্বারোহী হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করে। দ্রুত শত্রুবাহিনীতে ঢুকে পড়ে ঘোড়ার লাগাম দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে আর দু’হাতে দু’টি পিস্তল নিয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে আরম্ভ করে। কিছুক্ষণ পর হাতে নেয় তরবারি। গাজর ও মুলার মত কাটতে থাকে রুশ সেনাদের। এরপর তাদের থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই হারিয়ে যায়। একজন মুজাহিদও এই আক্রমণে শহীদ হননি। এ জাতীয় গেরিলা হামলার ধারা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুজাহিদরা যখন রুশ সেনাদের ভেতর ঢুকে পড়েন তখন রাশিয়ানদের ভারী ভারী তোপগুলো কোনই কাজে আসে না। তখন কাজে আসে শুধু তরবারি আর খঞ্জর।

 রুশ সেনারা মুখোমুখি লড়াই করার প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে আসে, কিন্তু ময়দানে এসে কাউকেই খুঁজে পায়না অথচ গুলি, খঞ্জর আর তরবারি তাদের উপর অনবরত আঘাত হানতেই থাকে। ভয়ে তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছে যে, পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনলেও তারা পজিশন নিয়ে ফায়ারিং শুরু করে দেয়। পায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে কোন পাথরও যদি আপন স্থান থেকে গড়িয়ে পড়ে তাহলেও তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জংলী জীব-জানোয়ার ছুটে চলার আওয়াজ কানে আসলেও ফায়ার শুরু করে। কোন বাহিনীকে কোন একটা অভিযানে প্রেরণ করা হলে কেউ এই নিশ্চয়তা দিতে পারে না যে, এই বাহিনী উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে পারবে। রাতে যারা ক্যাম্পে অবস্থান করে তারাও জানে না যে, ভোর পর্যন্ত তারা জীবিত থাকবে কি না? শত্রুরা কোথাও নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারে না। ইমাম শামিলের ভয় তাদেরকে কোথাও স্থির হয়ে একটু বসতেও দেয় না। ক্যাম্পের চারপাশে তারা কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে দেয়, কিন্তু তারপরও ইমাম শামিলের বাহিনী প্রায় প্রতি রাতেই ক্যাম্পে ঢুকে আক্রমণ করে ।

সন্ধির প্রচেষ্টা:

অবশেষে একটা সময় এসে রাশিয়ানরা সন্ধির চেষ্টা করে। ইমামের নিকট রুশ সেনাপতি পত্র লেখে- ” আমাদের সৈন্যসংখ্যা সমুদ্রের বালুকণার চেয়েও বেশি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও আমাদের হাজার হাজার সৈন্য বেঁচে যাবে। তাই বলছি, তুমি জারের আনুগত্য মেনে নাও এবং নিজের লোকদের অহেতুক মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা কর। তোমার মাথায় বিবেক-বুদ্ধি কিছু আছে কি না, আমার সন্দেহ হয়। তোমাদের এই দেশে পাহাড় আর বনজঙ্গল ছাড়া আর কী আছে? এগুলো রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করা, জীবন দেয়া বোকামী নয় তো কী?”

এর উত্তরে ইমাম লেখে পাঠান- “আকাশ ভেঙে পড়লে তোমার একটা সৈন্যও বেঁচে থাকবে না; বেঁচে থাকব আমরা। কারণ, তোমরা বাস কর খোলা আকাশের নিচে আর আমরা বাস করি পাহাড়ের গুহায় আর গহীন অরণ্যে। আমার দেশের পাহাড় আর বনজঙ্গল যদি এতই তুচ্ছ হয় তাহলে এগুলো দখল করার জন্য তোমরা এতদূর থেকে এখানে এসে যুদ্ধ করছ কেনো? এগুলো যত তুচ্ছই হোক এগুলোর মালিক আমরা। তোমাদের সম্পদ দখল করার জন্য আমরা যুদ্ধ করছি না। তোমরা সমগ্র বিশ্বের সব সাগর-নদীর বালুকণা সমপরিমাণ, বরং তারচেয়েও বেশি সৈন্য নিয়ে আস। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব”।

সেনাপতি আবার লেখে- আমরা সভ্য জাতি। তোমাদের এই দেশকে আমরা উন্নত করতে এসেছি।

উত্তরে ইমাম লেখেন, তোমার কথা শুনে অবাক না হয়ে পারলাম না। যে জাতি তোমাদের দয়া নিয়ে বাঁচতে চায় না, তোমরা তাদেরকেই দয়া দেখাতে এসেছ? না কি দয়ার নামে তোমাদের দাসত্ব আমাদের উপর চাপাতে এসেছো?

এভাবে তাদের সন্ধির প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। নিরূপায় হয়ে তারা আবার যুদ্ধ শুরু করে।

কলগনু নামক এক সেনাপতির সাথে ইমান শামিলের সরাসরি বৈঠকও হয়েছিল। সেখানেও ইমাম শামিল সন্ধি করতে সম্মত হননি।

চলবে ইনশাআল্লাহ..

লেখক : মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির


তথ্যসূত্র :

(১) https://tinyurl.com/ypuc473s

(২) https://tinyurl.com/bdf5net7

(৩) https://tinyurl.com/ycy5tmep

(৪)  যুলফিকার।


পড়ুন ইমাম শামিল রাহিমাহুল্লাহ প্রথম কিস্তি

ইসলামের তারকাগণ || পর্ব-১৯ || দাগিস্তানের সিংহ : ইমাম শামিল রাহিমাহুল্লাহু (প্রথম কিস্তি)

3 মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন