ইসলামের তারকাগণ || পর্ব-১৯ || দাগিস্তানের সিংহ : ইমাম শামিল রাহিমাহুল্লাহু (প্রথম কিস্তি)

2
182

ইমাম শামিল- একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। ১৮৩৪ সাল থেকে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক লড়াকু যোদ্ধা ইমাম শামিল। আগ্রাসী রাশিয়ার অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্রও অকেজো হয়ে পড়েছিল যে মহান বীরের নগন্য ও আদিযুগের যুদ্ধাস্ত্রের সামনে, তিনিই হলেন ইমাম শামিল। রাশিয়ার রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অজপাড়া গাঁয়ের কুঁড়েঘর পর্যন্ত সবার কাছেই যিনি “শেরে দাগিস্তান” বা দাগিস্তানের সিংহ নামে পরিচিত, তিনিই ইমাম শামিল। ইতিহাসে আজও তিনি আযাদীর শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার হিসেবেই প্রসিদ্ধ। আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক মনে করা হয় তাকে। যুগের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও অভিনব রণকৌশল মুখ থুবড়ে পড়েছিল এই মহান বীরের সামনে। সন্ত্রাসী রাশিয়ার এমন কেউ ছিল না, যে ইমাম শামিলকে ভয় করত না। রাশিয়ার সৈনিকদের জন্য তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। রাশিয়ার মায়েরা নিজ সন্তানদের ঘুম পাড়াত ইমাম শামিলের নাম শুনিয়ে।

আমাদের এবারের পর্ব দাগিস্তানের এই সিংহকে নিয়ে।


দাগিস্তান :

কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগরের মাঝখানে অবস্থিত কাফকাজ অঞ্চল। ইংরেজি উচ্চারণে বলা হয় ককেশাস। কেউ কেউ বলে কোহেকাফ। এ অঞ্চলের অধীবাসীদের বলা হয় কোহেস্তানী। কাস্পিয়ান সাগর থেকে শুরু হয়ে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাফকাজ পর্বতমালা; দৈর্ঘ্যে নয়শত মাইল। প্রস্থে কোথাও ৫০ মাইল আবার কোথাও ১৫০ মাইল। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই কাফকাজ অঞ্চল। কারো কারো মতে এই সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর, যা ইয়াজুজ মাজুজের পথ আটকে রেখেছে। এই ভূখণ্ডের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ঐতিহাসিক জুদী পাহাড় (কোহে আরারাত) এর অবস্থান। কথিত আছে, মহাপ্লাবনের সময় হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কিশতি এই জুদী পর্বতে এসে ঠেকেছিল।

কাফকাজের পূর্বে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর, পশ্চিমে কৃষ্ণ সাগর, উত্তরে রয়েছে রাশিয়া এবং দক্ষিণে আজারবাইজান।

দাগিস্তান, চেচনিয়া, অডলেশিয়া, কবারদা, সার্কাশিয়া, মংগ্রেলিয়া, আমরেতিয়া ও জর্জিয়া প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই কাফকাজ বা ককেশাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রাশিয়া জোরদার আক্রমণ করে বসে এই কাফকাজ অঞ্চলে। ১৮০১ সালে জর্জিয়া রাশিয়ার করতলগত হয়। ১৮০৩ সালে মংগ্রেলিয়া, ১৮০৪ সালে আমরেতিয়া রুশদের দখলে চলে যায়। এভাবে ১৮১৩ সাল নাগাদ শেরওয়ান, দরবন্দ ও বাকুসহ ছোট ছোট প্রায় সব অঞ্চলেই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে করে রাশিয়ার এই প্রত্যয় জন্ম নেয় যে, সালতানাতে উসমানিয়ার উপরও সে আক্রমণ করতে পারবে। কিন্তু এখনো মাঝখানে দাগিস্তান, চেচনিয়া ও কবারদার কিছু অঞ্চল স্বায়ত্তশাসিত রয়ে গেছে৷ সালতানাতে উসমানিয়ার উপর আক্রমণ করার আগে এই অঞ্চলগুলোতে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুবই জরুরী। সে লক্ষ্যেই রাশিয়া দাগিস্তানে আক্রমণ করে। কিন্তু রাশিয়ার বিজয়াভিযান এখানে এসে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান শেরে দাগিস্তান ইমাম শামিল আফেন্দী রাহিমাহুল্লাহ। জীবনের দীর্ঘ ২৬টি বছর তিনি তরবারি হাতে দৌড়ে বেড়ান এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে, এক পাহাড় থেকে অপর পাহাড়ে। কখনও দাগিস্তানে, কখনও চেচনিয়ায় আবার কখনও কবারদায়। রাশিয়ার মতো অত্যাধুনিক শক্তিধর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় যুদ্ধ করেছেন তরবারি, খঞ্জর আর জং ধরা পুরাতন কিছু বন্দুক দিয়ে। রাশিয়াকে এক মুহূর্তের জন্যও তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেননি।


জন্ম ও শিক্ষা-দীক্ষা :

দক্ষিণ দাগিস্তানের উঁচু এক পাহাড়ের ঢালুতে একটি জনবসতি। নাম গিমরী। এই গিমরীর একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১২১২ হিজরী মোতাবেক ১৭৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম শামিল (১) রাহিমাহুল্লাহু। পিতার নাম দেঙ্গো। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি স্থানীয় মক্তবেই অর্জন করেন। হাদীস, ফিকহ, ফালসাফা ও আরবী আদবসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন স্বীয় উস্তায শাইখ জামালুদ্দীনের কাছে। এরপর তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন ও আত্মশুদ্ধির জন্য পাড়ি জমান তৎকালীন নকশবন্দিয়া তরিকার প্রসিদ্ধ ইয়ারাগল খানকার সম্মানিত পীর ও মুরশিদ শাইখে দাগিস্তান মোল্লা মুহাম্মদের দরবারে। ধর্মীয় জ্ঞানে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন তিনি। মেধা-বুদ্ধিতে তিনি সকলের সেরা ছিলেন। তবে তাঁর সখের বিষয় ছিল যুদ্ধ।


গাজী মুহাম্মাদ আল গিমরাওয়ী :

ইমাম শামিলের বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী গাজী মুহাম্মাদ। একসাথেই তাঁরা পড়াশোনা করেন। ইমাম শামিলের চেয়ে গাজী মুহাম্মাদ এক-দুই বছরের বড়। গ্রামের পড়াশোনা শেষ করে তারা উভয়েই ইয়ারাগল খানকায় চলে যান। ইয়ারাগল খানকা যদিও নকশবন্দিয়া তরিকার ইসলাহি খানকা ছিল, তারপরও সেখান থেকে যারা শিক্ষা-সমাপন করে নিজ এলাকায় ফিরে আসতেন, তারা সকলেই জিহাদের বিশুদ্ধ জ্ঞান ও পরিপূর্ণ স্পৃহা নিয়েই ফিরে আসতেন। গাজী মুহাম্মাদ ও ইমাম শামিলও যথারীতি শিক্ষা-সমাপন করে মাতৃভূমি গিমরীতে ফিরে আসেন। গাজী মুহাম্মাদ তিন তিনবার একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। নিজের করণীয় বুঝতে সময়ক্ষেপণ করেননি তিনি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিহাদের তাবলীগ ছড়িয়ে দিতে বেরিয়ে পড়েন দাগিস্তানের পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়। অল্প কয়েকদিনেই তিনি সমগ্র দাগিস্তানের ইমাম হিসেবে আবির্ভূত হন।  যেসব গোত্রপতিরা রাশিয়ার সাথে যোগ দিয়েছিল, তাদের কাছেও ফিরে আসার দাওয়াত পৌঁছান তিনি। সেই লক্ষ্যে তিনি একটি রিসালাহ লিখেছিলন। নাম দেন “ইকামাতুল বুরহান আলা ইরতিদাদি উরাফায়ি দাগিস্তান।” দিন দিন তার মুরীদদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

ইমাম শামিল সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যান। তিনি হুটহাট কিছু করতে চাচ্ছেন না। তিনি চাচ্ছেন, দাওয়াহ ও ই’দাদের মারহালায় আরও কিছু সময় ব্যয় করতে। তাঁর কথা হলো, “রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যে পরিমাণ জনশক্তির প্রয়োজন, তা এখনো আমাদের অর্জিত হয়নি।” কিন্তু গাজী মুহাম্মাদ রাশিয়া অধিকৃত কাফকাজের অঞ্চলগুলো অতি দ্রুত ফিরিয়ে আনতে চান। ইমাম শামিল তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, রাশিয়ার মতো শক্তিধর একটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এখনই আক্রমণাত্মক জিহাদে জড়িয়ে পড়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হলেও, পদ্ধতিগত দিক থেকে তা উচিত হবে না। এর পূর্বে আমাদের সমগ্র কাফকাজকে জাগিয়ে তুলতে হবে। জিহাদের প্রস্তুতি আরও ব্যাপক করতে হবে। গাজী মুহাম্মাদের বক্তব্য ছিল এর বিপরীত। তিনি বলছেন, আমরা জিহাদ শুরু করলেই সমগ্র দেশবাসী জেগে উঠবে। বিপরীতমুখী দুই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুই বাল্যবন্ধুর মাঝে কিছুটা মনোমালিন্য হয়। ইমাম শামিল দীর্ঘ পথ সফর করে চলে যান পবিত্র মক্কায়। সেখানে আব্দুল কাদির আল জাযায়েরীর (২) সঙ্গে সাক্ষাত করেন। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, কাফকাজ ও উসমানী সালতানাতসহ মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর অধঃপতন ও এর থেকে উত্তরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। উভয়েই এই সিন্ধান্তে উপনীত হন যে, সময় নষ্ট না করে শীঘ্রই দাওয়াহ ও ই’দাদের কাজে সর্বাত্মকভাবে নেমে পড়া উচিত। এই আলোচনার পর ইমাম শামিল চলে আসেন দাগিস্তানে আর আব্দুল কাদের আল জাযায়েরি চলে যান আফ্রিকায়।

গিমরী ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, গাজী মুহাম্মাদ তার ৮ হাজার মুরীদ বাহিনী নিয়ে আদিরিয়ার প্রাণকেন্দ্র খোনজাক আক্রমণের জন্য রওয়ানা হচ্ছেন। এটি দাগিস্তানের একটি অঞ্চল, যার অধিবাসীরা দেশবাসীর সাথে গাদ্দারী করে রাশিয়ার তাবেদারী কবুল করে নিয়েছে। ইমাম শামিলও এই আক্রমণে শরীক হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গাজী মুহাম্মাদ এই যুদ্ধে পরাজিত হন। তবে তিনি মনোবল হারাননি। পুনরায় প্রস্তুতি শুরু করেন। এটি ছিল ১৮৩০ সালের ঘটনা।

এর কয়েক মাস পরেই গাজী মুহাম্মাদ রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করেন। কয়েকটি অভিযানে তিনি বেশ সাফল্যও অর্জন করেন। এতে তার সবচেয়ে বড় লাভ এই হয় যে, তিনি রুশ বাহিনীর সামরিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। রুশ সৈন্যরা গতানুগতিক পদ্ধতির যুদ্ধে অভ্যস্ত। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। সারি ভেঙে দিতে পারলে তাদের শৃঙ্খলা ঠিক থাকে না। তখন তাদেরকে গাজর-মুলার মত কুচি কুচি করে কাটা যায়।  এর বিপরীতে গাজী মুহাম্মাদের মুরীদ বাহিনী যুদ্ধ করে গেরিলা পদ্ধতিতে। আচমকা আত্মপ্রকাশ করে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় গহীন জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ে। শত্রুবাহিনীর কাছে মনে হয় যেন, আকাশ চিড়ে নেমে আসল আর মাটি ফোঁড়ে ঢুকে গেল। তারা কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই তাদের হাজার হাজার সৈনিক খাক-খুনের মাঝে ছটফট করতে করতে মারা যায়। (৩)

১৮৩০ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গাজী মুহাম্মাদ বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন। একই বছরের নভেম্বরে তিনি কাজলিয়া আক্রমণ করেন। কাজলিয়া ছিল রুশবাহিনীর একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি। গাজী মুহাম্মাদের মুরীদ বাহিনী কাজলিয়ায় এত তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করেন যে, রুশ বাহিনী ও তাদের স্থানীয় অনুগত বাহিনী একত্রিত হয়েও এর মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। অসম্ভব-প্রায় এসব বিজয়ের ফলে গাজী মুহাম্মাদের মনোবল আকাশ ছুঁয়ে যায় যেন।


গিমরীর রণাঙ্গন :

জার নিকোলাসের পক্ষ থেকে কাফকাজসহ দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তারের সার্বিক দায়িত্ব অর্পিত ছিল জেনারেল ইয়ারমুলুকের উপর। স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পারার অপরাধে ১৮২৭ সালে তাকে বরখাস্ত করে সেনাপতি কাউন্ট পচকিভচকে কমান্ডার ইন চীফ নির্ধারণ করে জার নিকোলাস। গাজী মুহাম্মাদের যুদ্ধ হয় সেনাপতি পচকিভচের বিরুদ্ধে। গাজী মুহাম্মাদের উত্তরোত্তর বিজয়ের ফলে রুশ সেনাপতি বেশ বিচলিত হয়ে পড়ে। তার কাফকাজ দখল-প্রক্রিয়া তো বাধাগ্রস্ত হয়-ই, উপরন্তু যে অঞ্চলগুলো দখল করে নিয়েছিল- গাজী মুহাম্মাদের আক্রমণের মুখে সেগুলোও এখন হাতছাড়া হচ্ছে। তাই সে সিন্ধান্তমূলক চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেনাপতি উইলিয়ামিনভকে কয়েক লক্ষ রুশ সেনা, ভারী তোপ ও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ দিয়ে জঙ্গলে প্রেরণ করে। উদ্দেশ্য, কাজী মোল্লাকে (গাজী মুহাম্মাদকে রাশিয়ানরা কাজী মোল্লা বলে ডাকত) শায়েস্তা করে আসা।

গাজী মুহাম্মাদ ইমাম শামিলের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ইমাম শামিল আফসোস করে বলেন, যে আশঙ্কা আমি করছিলাম, অবশেষে তাই হলো! এখন এত বিশাল বাহিনীর কথা শুনলে দেশবাসী আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। আমাদের আরও কিছুদিন সময় নেওয়া জরুরী ছিল। কিন্তু এখন মোকাবিলা না করেও কোনো উপায় নেই। অবশেষে গিমরীতেই মোর্চা তৈরী করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিন্ধান্ত হয়।

১৮৩২ সালের আক্টোবর মাসের ১২ তারিখ। কয়েক লক্ষ সৈন্য আর তোপ-কামান নিয়ে সেনাপতি উইলিয়ামিনভ গিমরী ঘেরাও করে। মুরীদ বাহিনী মরণপণ লড়াই করেন। ভারী তোপ ও গোলাবারুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয় তরবারি খঞ্জর আর পুরাতন কিছু বন্দুক দিয়ে৷ তবুও দশ বিশজন রুশ সেনাকে হত্যা না করে কেউ প্রাণ দিচ্ছেন না। কিন্তু রাশিয়ার সৈন্যের কোনো অভাব নেই। একজন মারা গেলে তার স্থান দখল করে ময়দানে আসছে আরও দশজন। একটানা ছয়দিন দীর্ঘ হয় এ যুদ্ধ। মুজাহিদদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে। তাদের একজন মারা গেলে তার স্থান দখল করার কেউ নেই৷

যুদ্ধের এক স্থানে একটি বিস্ময়কর কিন্তু ভয়ঙ্কর দৃশ্য চোখে পড়ে। রণাঙ্গনের এক পাশে ৫০ জন রুশ সেনার ঘেরাওয়ে পড়েছেন ১৮ জন মুজাহিদ। যুদ্ধ করতে করতে তারা এমন এক স্থানে এসে উপনীত হন যে, এর পাশেই ছিল কয়েক’শ ফুট গভীর এক গর্ত, যেখানে পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু অনিবার্য। এক মুজাহিদ তিনজন রুশ সেনার ঘেরাওয়ে আটকা।  হঠাৎ তিনি নিজের তরবারিটি ছুড়ে ফেলে দিলেন। সামনে থাকা এক রুশ সেনাকে ঝাপটে ধরে লাফিয়ে পড়লেন গভীর খাদে। তার দেখাদেখি বাকি ১৭ জনের ১৪ জনেই এই পন্থা অবলম্বন করেন। তাদের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার এই দৃশ্য রাশিয়ানদের অবাক করেছিল।

১৭ তারিখের সন্ধ্যাবেলা। মাগরিবের পর গাজী মুহাম্মাদ সৈন্যের হিসাব নিয়ে দেখলেন মাত্র বিশজন। তিনি আর ইমাম শামিল বাদে ১৮ জন। এদিকে শত্রু বাহিনী ঘেরাও সঙ্কীর্ণ করতে করতে এগিয়ে আসছে। এই সঙ্গিন মুহূর্তেও কারও অন্তরে আত্মসমর্পণের চিন্তাও আসেনি। এক এক করে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন শেষ ২০ জন মুজাহিদও। কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় ২০ জনের এই যুদ্ধ। এরপর সব নীরব হয়ে যায়। টানা ছয়দিন পর গিমরীর যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মুরীদ বাহিনী পরাজিত হয়। পরদিন ভোরে গিমরীর মসজিদের কাছে গাজী মুহাম্মাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। (৪)  অসংখ্য বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে তাঁর দেহ। পাশবিক উল্লাসে মেতে ওঠে রাশিয়ান বাহিনী।


দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইমাম :

দাগিস্তানের প্রথম ইমাম শাহাদাত বরণ করেন। রুশ বাহিনী যারপরনাই আনন্দিত হয়। দাগিস্তান এখন ইমামশূন্য। এই যুদ্ধে প্রাণে বেঁচে যান শুধু দুজন মুরীদ৷ একজন হামযাহ বেগ। তিনি কোনোভাবে বেঁচে যান এবং অক্ষত থাকেন। দ্বিতীয়জন ইমাম শামিল। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। পরদিন একটি গুহায় তার অবচেতন দেহ পাওয়া যায়। আব্দুল আজীজ নামক একজন গ্রাম্য ডাক্তার তার চিকিৎসা করেন। তবে তার ক্ষতস্থান শুকাতে অনেক সময় লেগে যায়৷ ততদিনে হামযাহ বেগ দাগিস্তানের দ্বিতীয় ইমাম নির্বাচিত হয়ে লোকদের থেকে জিহাদের বাইয়াত নেওয়া শুরু করেন। এভাবে এক বছরের বেশি সময় কেটে যায়। এখন ইমাম শামিলের ক্ষত অনেকটাই শুকিয়ে গেছে৷ ইতোমধ্যে তিনি বিয়েও করেছেন এবং তার ঘরে একজন পুত্র সন্তানও জন্মগ্রহণ করেছে৷ তিনি তার নাম রেখেছেন জামালুদ্দীন। ইমাম শামিল হামযাহ বেগের অধীনে জিহাদ শুরু করেন। হামযাহ বেগ খোনজাক বিজয় করেন, যা গাজী মুহাম্মাদ বিজয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যেদিন খোনজাক বিজয় করেন, সে দিনটি ছিল শুক্রবার। দাগিস্তানের দ্বিতীয় ইমাম জুম’আর ইমামতি করার জন্য মসজিদে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মসজিদে প্রবেশ করা মাত্রই দু’জন আততায়ী কর্তৃক তিনি নিহত হন। সময়টা ছিল ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১২৫০ হিজরী।

এই ঘটনার চারদিন পর ইমাম শামিল দাগিস্তানের তৃতীয় ইমাম হিসেবে সকলের থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দাগিস্তানের রাশিয়াবিরোধী যুদ্ধে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। তাঁর হাতে যারা বাইয়াত হচ্ছেন, তাদেরকে তিনি নতুনভাবে বিন্যাস করতে শুরু করেন। কাফকাজের মাটি প্রস্তুত হতে থাকে রাশিয়ার মৃত্যুপুরী হিসেবে।

চলবে ইন শা আল্লাহ…


নোট:

(১) আঞ্চলিক অর্থে শামিল অর্থ-অধিক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি। কথিত আছে, তিনি জন্মগ্রহণের সময় জটিল জটিল বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন বলেই তার নাম “শামিল” রাখা হয়। তার পূর্ণ নাম এরকম-ইমাম শামিল আলী ইবনে দেঙ্গো। কিন্তু কে জানত যে, এই রোগাক্রান্ত শিশুটিই একদিন শক্তিশালী রাশিয়াকে তাড়িয়ে বেড়াবে?

(২) আমীর আব্দুল কাদির বিন মুহিউদ্দীন আল হাসানী  উরফে আব্দুল কাদির আল জাযায়েরী। তিনি ১৮০৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর, বর্তমান আলজেরিয়ার মাসকারা প্রদেশের কুয়েত্তিনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।  ১৮২৫ সালে পিতার সাথে হজ্জ করতে এসে ইমাম শামিলের সাথে সাক্ষাৎ হয় এবং উভয়ের মাঝে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। তিনি আলজেরিয়ায় ফরাসী আগ্রাসন প্রতিরোধ আন্দোলনের পথিকৃত ছিলেন। ফরাসী উপনিবেশের বিরুদ্ধে তিনি এক দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু আধুনিক সরঞ্জামাদির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ১৮৪৭ সালে আত্মসমর্পণ করেন। ফ্রান্স তাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। ১৮৫২ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৮৮৩ সালের ২৬শে মে তিনি দামিশকে ইন্তিকাল করেন।

(৩) বর্তমানে ঈমান ও কুফরের মাঝে চলমান লড়াইয়ে মুজাহিদগণ এই পদ্ধতিতেই লড়াই করছেন। গেরিলা যুদ্ধের এই আইডিয়া নতুন নয়। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই তা বিদ্যমান।  নববী যুগেও এই যুদ্ধের প্রচলন ছিল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম এই পদ্ধতিতে যুদ্ধ করেননি দুটি কারণে। এক. শত্রুরা মুখোমুখি যুদ্ধ করত। এর বিপরীতে চোরাগোপ্তা যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া ছিল কাপুরষতার শামিল। দুই.  তারা যুদ্ধ করতেন মৃত্যুর জন্য। আর মৃত্যুর জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক ছিল মুখোমুখি যুদ্ধ। (তারীখে ইবনে খালদুন-১/৩৩৫ ও ৩৩৭ ) গেরিলা যুদ্ধ ব্যাপকতা লাভ করে সুলতান সালাহউদ্দীন আইউবীর যুগে। তিনি এই যুদ্ধের ব্যাপক প্রচলন ঘটান। বর্তমানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যারাই অস্ত্র ধরছে তারাই এই পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে। মুজাহিদরাও একই পন্থা অবলম্বন করেছেন।

(৪) শহীদদের মধ্য থেকে গাজী মুহাম্মাদের লাশ যখন খুঁজে বের করা হয়, তখন তিনি জায়নামাজে তাশাহহুদের সূরতে বসা ছিলেন। তাঁর এক হাত দাড়িতে ছিল। অপর হাত দিয়ে আকাশের দিকে কী যেন ইঙ্গিত করছিলেন। রাহিমাহুল্লাহু।


লেখক :    মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির


তথ্যসূত্র :

(১) https://tinyurl.com/ypuc473s

(২) https://tinyurl.com/bdf5net7

(৩) https://tinyurl.com/ycy5tmep

(৪)  যুলফিকার।

2 মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন