ধর্মীয় স্বাধীনতা যেখানে কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দী

0
685

বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী সরকার দ্বারা পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও ভারত নিজেকে “ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র” হিসেবে দাবি করে। ভারতের কথিত সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকলেও তা আসলে আই ওয়াশ। তাদের সংবিধানে উল্লেখ আছে যে, “রাষ্ট্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি বৈষম্যমূলক, পক্ষপাতিত্বমূলক কিংবা হস্তক্ষেপমূলক আচরণ করবে না।” অথচ ইসলাম ও মুসলিমদের ব্যাপারে বিশেষ করে মুসলিম প্রধান ভূখণ্ড কাশ্মীরের ব্যাপারে ধর্মীয় স্বাধীনতা কিংবা তাদের সংবিধানে উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো একেবারে উধাও হয়ে যায়।

শুধু কি তাই? ধর্মীয় স্বাধীনতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা তো অনেক দূরের কথা, বরং এই হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রকাশ্যে রাম রাজ্য বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। যেখানে “মুসলিম” কেন, হিন্দু ব্যতীত সকল ধর্মের লোকেরাই হবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারত হচ্ছে “মারাত্মকভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনকারী দেশ” গুলোর মধ্যে একটি।

কাশ্মীরের মুসলিমরা কতটুকু ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করেন তার একটি উদাহরণ আমরা গত সেপ্টেম্বরেই দেখতে পাই। একদিকে কাশ্মীর জুড়ে জননিরাপত্তা আইনের নামে জনপ্রিয় আলেমদের আটক করেছে। অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুসলিম শিক্ষার্থীদেরকে জোরপূর্বক হিন্দু স্তোত্র গাইতে বাধ্য করেছে দখলদার প্রশাসন।

শুধু তাই নয়! কাশ্মীরে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় দখলদার ভারত যে কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তার আরও কিছু উদাহরণ এই নিবন্ধে উল্লেখ করা হলো:

কাশ্মীর জুড়ে দখলদার বাহিনীর উপস্থিতিতে জন্মাষ্টমী মিছিল

দখলদার বাহিনীর হেফাজতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন উদযাপনে কাশ্মীরের রাস্তায় মিছিল বের করে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। উচ্চস্বরে গান বাজনা ও জাঁকজমক প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই দিনটি পালন করে তারা। দখলদার প্রশাসনের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানটি।

হিন্দুত্ববাদী সেনাবাহিনী কর্তৃক কুরআন অবমাননা

হিন্দুত্ববাদী সেনাবাহিনীর দ্বারা মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনকে অবমাননা কাশ্মীরে একটি নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। এই কুরআন অবমাননা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি হচ্ছে কাশ্মীরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ২০১৩ সালে এমন এক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে কাশ্মীরি মুসলিমরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু তাদের এই প্রতিবাদকে বলপ্রয়োগ করে দমন করে দখলদার প্রশাসন। পরিস্থিতি “সামাল” দিতে চারজন নিরীহ মুসলিমকে খুন করতেও দ্বিধা করেনি হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা।

কাশ্মীরের জামিআ মসজিদে জুমা’র সালাতে নিষেধাজ্ঞা

দখলকৃত কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের ৬০০ বছরের পুরনো জামিআ মসজিদে গত তিন বছর ধরে জুমা’র সালাত আদায় বন্ধ করে রেখেছে দখলদার হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি কাশ্মীরি মুসলিমদের কাছে একটি পবিত্র ও সম্মানিত স্থান হিসেবে বিবেচিত। ঈদ, শবে মেরাজ এবং শবে বরাতের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মুসলিম এই মসজিদে আসেন।

দখলদার বাহিনী শুধু জুমা’র সালাতই বন্ধ করেনি, মসজিদের প্রধান খতিব মিরওয়াইজ উমর ফারুককেও গৃহবন্দি করে রেখেছে। এমনকি তাঁকে খুৎবা দেবার অনুমতি পর্যন্ত দিচ্ছে না দখলদার প্রশাসন। এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি বন্ধ করে কেবল কাশ্মীরি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাতেই আঘাত হানা হয় নি বরং তাদেরকে মানসিকভাবেও আহত করেছে হিন্দুত্ববাদীরা।

ঈদ ও শবে কদরের সালাতে হয়রানি

শবে কদর মুসলিমদের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ রাত। এ রাতটি বেশিরভাগ ধর্মপ্রাণ মুসলিম ইবাদত বন্দেগীতে কাটানোর চেষ্টা করেন। অথচ, “আইন ও শৃঙ্খলা” বিঘ্নিত হবার অজুহাত দেখিয়ে এ বছর জামিআ মসজিদে মুসলিমদেরকে শবে কদরের সালাত আদায় করার অনুমতি দেয়নি দখলদার প্রশাসন। এর কিছুদিন পর বিখ্যাত “ওল্ড টাউন ঈদগাহে” ঈদের সালাত আদায় করার অনুমতি দেয়নি হিন্দুত্ববাদীরা। হলে মুসলিমরা বাধ্য হয়ে জামিয়া মসজিদের ভেতর ঈদের সালাত আদায় করেন। মোট কথা মুসলিমদের প্রসিদ্ধ ইবাদতে জায়গাগুলোও দখলদারদের নিষেধাজ্ঞার শিকার হচ্ছে।

আলেমদের বন্দী

কাশ্মীরের আলেমদেরকে প্রায়ই কোনও অভিযোগ ছাড়াই বন্দী করে নিয়ে যায় দখলদাররা। সম্প্রতি কাশ্মীরের ৭ জন বিশিষ্ট আলেমকে আটক করেছে তারা। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন তেহরিক-ই-সৌতুল আউলিয়ার পৃষ্ঠপোষক মাওলানা আব্দুল রশিদ দাউদ, জামিয়াত-আহলে হাদিসের মাওলানা মুশতাক আহমেদ ভিরি এবং জামাতে ইসলামীর ফাহিম রমজান ও গাজী মইনুল ইসলাম। কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন প্রত্যাহারের সময় হিন্দুত্ববাদী সরকার জামাআতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সংগঠনের আমীর ডঃ আব্দুল হামিদ ফায়াজ সহ প্রায় ৩০০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

এভাবে দীর্ঘদিন ধরেই কাশ্মীরে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে কাশ্মীরি মুসলিমদের পরিচয় ও ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করছে দখলদার হিন্দুত্ববাদীরা। কারণ তারা জানে যে, কাশ্মীরে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং একইসাথে মুসলিমদের “হিন্দুকরণ” করার প্রচেষ্টা চালানোও জরুরী। আর ঠিক এই কারণেই কয়েক দশক ধরে কাশ্মীরি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে “কাঁটাতারের বেড়ায়।” জোরপূর্বক তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে “নোংরা হিন্দুত্ববাদ।”



লিখেছেন : ওবায়দুল ইসলাম



তথ্যসূত্র:

1. Under Barbed Wire: Religious Freedom in indian-Occupied Kashmir
https://tinyurl.com/2p8ysmu7

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন