মালিতে তুরস্কের দেয়া ড্রোনে জান্তার ৬৬ হামলায় শহীদ ১৫৫ বেসামরিক নাগরিক

0
10

বিগত আট বছরে মালিতে তুরস্কের ভূমিকা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং সফট পাওয়ারের হাতিয়ার থেকে সামরিক সমর্থনে রূপান্তরিত হয়েছে, যা সামরিক জান্তাকে আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম ড্রোন বহরের অধিকারী হতে সক্ষম করেছে। এদিকে বেসামরিক নাগরিক শহীদ হওয়া বিমান হামলার সংখ্যা ২০২২ সালের চারটি ঘটনা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৬৬টি ঘটনায় দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ১৫৫ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

মালির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলিয় রাজ্য টিম্বুকটোর একটি (এসিপিইডি) গবেষণা দল ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তুরস্কের ভূমিকা বিষয়ক একটি সমীক্ষা তৈরি করে। এই সমীক্ষা অনুসারে, আঙ্কারা সরাসরি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করছে না, কিন্তু আঙ্কারা জান্তা বাহিনীকে এমন কিছু প্রদান করছে যাকে সমীক্ষায় “গণহত্যায় সহায়তা” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আঙ্কারা এখানে জান্তাকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধ ড্রোন, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। আর এসব কিছুই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা বা অস্ত্রের চূড়ান্ত ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো ঘোষিত শর্ত ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বামাকো সফরের মাধ্যমে, যেখানে আটটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এরপর তুরস্ক প্রথম দেশ হিসেবে ২০২০ সালের আগস্টের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নেতাদের সাথে দেখা করার জন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে পাঠায়। ফরাসি বাহিনী এবং জাতিসংঘ মিশনের প্রত্যাহারের পর, বামাকো ২০২২ সালের শেষের দিকে বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন পেতে শুরু করে এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অতিরিক্ত চালান আসে, যার ফলে ড্রোনগুলোর ক্রমিক নম্বরের সংখ্যা অন্তত ১৭টিতে পৌঁছায়।

এই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মালি আরও ভারী ও দীর্ঘ পাল্লার আকিনজি ড্রোন পায়। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও জুলাই মাসে আরও দুটি চালান আসে। এরপরেও জেএনআইএম এবং এফএলএ প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আক্রমণে জান্তা শিবিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, উত্তরের শহরগুলোর পতন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারার নিহতের ঘটনা ঘটেছিল।

মালিতে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এই অগ্রগতি থামাতে জান্তা বাহিনী তুরস্ক থেকে ড্রোনের আগমনের সাথে সাথে বিমান হামলায় তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আর জান্তার এসব ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে থাকেন বেসামরিক নাগরিকরা। এসিপিইডি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২২ সালে জান্তার ৪টি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছেন বেসামরিক নাগরিকরা, কিন্তু ২০২৫ সালে তা ৬৬টিতে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ১৫৫ জনের বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দ্বারা নথিভুক্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

– মার্চ মাসে আমসরাকাদ-এ তুর্কি বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন হামলার মাধ্যমে ৭ শিশুসহ ১৩ জন বেসামরিক নাগরিককে শহীদ।
– একই মাসে দোয়ান-এর একটি ইসলামিক স্কুলে ড্রোন হামলায় ১৪ জন শিশুকে শহীদ।
– ইনাতিয়ারার একটি ঐতিহ্যবাহী স্বর্ণখনির স্থানে কমপক্ষে ৫০ জন বেসামরিক নাগরিককে শহীদ।
– হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, উত্তর মালির ত্বিন-যাওয়াতিন এলাকায় ড্রোন হামলার মাধ্যমে একটি ফার্মেসির সামনে ৫ শিশুসহ ৭ বেসামরিক নাগরিককে শহীদ করা হয়, যদিও আজাওয়াদ ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট এই হামলায় শহীদের সংখ্যা ২১ পর্যন্ত বর্ণনা করেছে।
– অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, নভেম্বর মাসে জান্তা বাহিনী কর্তৃক ইনাদিয়াভাতান-এ ৬ শিশুসহ ৮ বেসামরিক নাগরিককে শহীদ করা হয়েছে।
– ক্রিনিয়া গ্রামে একটি বিমান হামলার মাধ্যমে ৩ শিশু ও ১ নারীসহ ৮ জন বেসামরিক নাগরিককে শহীদ করা হয়েছে।

লক্ষ্যবস্তুগুলোর ধরণ একটি লক্ষণীয় বিন্যাস প্রকাশ করে: ইসলামিক স্কুল, স্বাধীন এলাকাগুলোর ফার্মেসি, পশুর হাট, খনি এলাকা, বেসামরিক যানবাহন এবং মসজিদ। আর এসব স্থানে হামলার ঘটনাগুলোতে শহীদদের মধ্যে শিশুদের হার অনেক বেশি।

গবেষণাটিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ২০২২ সাল থেকে তুর্কি ড্রোনগুলো মালির জান্তাকে এমন সব এলাকায় ঘন ঘন বিমান হামলা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে তাদের নাগালের বাইরে ছিল। এর পরে পরবর্তী অভিযানগুলোতে তুর্কি ও রুশ ব্যবস্থার মধ্যে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়, যার মধ্যে ২০২৬ সালের মে মাসে কিদাল শহরে বোমা হামলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আঙ্কারা তার এই সহযোগিতাকে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মালির প্রতি সমর্থন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু আঙ্কারা যাকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বলছে, সেখানে মালির তুয়ারেগ, আরব এবং ফুলানি গ্রামগুলোর বেসামরিক নাগরিকরা আঙ্কারার দেওয়া সহায়তায় হত্যার শিকার হচ্ছেন। আর নথিভুক্ত বেসামরিক হতাহতের ঘটনার পরেও, কোনো তদন্ত, চুক্তি স্থগিতকরণ, বা ব্যবহার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন ছাড়াই আঙ্কারা জান্তার জন্য অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাকতিয়া পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করলেন আরও ৩৮৩ তরুণ