
অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার পরিবেশ এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। গত এক বছরে ২৫টি বই বাজেয়াপ্ত, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার থেকে বই সরিয়ে নেওয়া, কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, ইন্টারনেট ও ভিপিএন ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আটকের মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
হিন্দুত্ববাদী ভারত কর্তৃক অবৈধভাবে অধিকৃত এই ভূখন্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে Forum for Human Rights in Jammu and Kashmir-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার অজুহাতে দখলদার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ কাশ্মীরিদের মতপ্রকাশ, শিক্ষা ও একাডেমিক স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির পরিসরকে সংকুচিত করছে।
২৫টি বই বাজেয়াপ্ত
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের স্বরাষ্ট্র দপ্তর ২৫টি বই বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়। দখলদার প্রশাসনের অভিযোগ, বইগুলো ‘মিথ্যা বয়ান ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ প্রচার করে। এগুলো তরুণদের মধ্যে দখলদার সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরি করছে, মজলুম কাশ্মীরিদের নিপীড়িত হওয়ার অনুভূতিকে আরও জাগিয়ে তুলছে। এছাড়া কাশ্মীরের স্বাধীনতাপন্থীদের বীর হিসেবে উপস্থাপন করছে।
নিষিদ্ধ বইগুলোর লেখকদের মধ্যে রয়েছেন অরুন্ধতী রায়, এ.জি. নূরানি, অনুরাধা ভাসিন, ক্রিস্টোফার স্নেডেন, সুমন্ত্র বসু, হাফসা কাঞ্জওয়াল ও এসার বাতুল।
আদেশের পর শ্রীনগরসহ জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় বইয়ের দোকান ও বিক্রেতাদের কাছে তল্লাশি চালানো হয়। নিষিদ্ধ বইয়ের কপি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে দখলদার পুলিশ।
অনুরাধা ভাসিনের A Dismantled State: The Untold Story of Kashmir After Article 370 বইটিও নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে। সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ভাসিন দাবি করেছে, বইটি গবেষণাভিত্তিক এবং এতে সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করা হয়নি।
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (PDP)-র নেত্রী মেহবুবা মুফতি বই নিষিদ্ধের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। তার বক্তব্য, বই নিষিদ্ধ করে ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না; বরং এতে দখলদার প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস আরও বাড়বে।
স্কুল লাইব্রেরিতে বই নিয়ে বিতর্ক
২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকারি স্কুলের লাইব্রেরিতে সরবরাহ করা কিছু বই নিয়ে আপত্তি তুলে দখলদার ভারত প্রশাসন। বিশেষ করে Personalities and Legends of J&K বইটিতে কাশ্মীরের বর্ণনা এবং জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF) এর প্রতিষ্ঠাতা মাকবুল ভাটকে ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করায় আপত্তি জানায় দখলদার কর্তৃপক্ষ।
ফলশ্রুতিতে স্কুলশিক্ষা দপ্তরের ৮ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং লাইব্রেরি ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত এক চুক্তিভিত্তিক কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট বই প্রত্যাহারের পাশাপাশি তদন্ত শুরু করে দখলদার কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট লেখক ও প্রকাশকদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
পরে জম্মু বিশ্ববিদ্যালয়ও সংশ্লিষ্ট লেখকদের বই লাইব্রেরি ও ডিজিটাল সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। কালো তালিকাভুক্ত প্রকাশকদের কাছ থেকে নতুন করে বই না কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মানবাধিকার ফোরামের মতে, এই ঘটনা কাশ্মীরের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে একাডেমিক গবেষণা ও পাঠ্যসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
FAT- ট্রাস্টের সাথে সম্পৃক্ত স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন
ফালাহ-ই-আম ট্রাস্ট (FAT)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দখলদার কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক রয়েছে। এর ভিত্তিতে শত শত স্কুলের ব্যবস্থাপনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষকতার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে।
অভিভাবকদের একাংশের দাবি, সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছিল।
চিকিৎসাশিক্ষায় বৈষম্য
শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল এক্সিলেন্সকে ঘিরেও বিতর্ক উস্কে দেয় দখলদার প্রশাসন। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (NMC) মূল্যায়নে চিহ্নিত বিভিন্ন ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠানটির MBBS কোর্স পরিচালনার অনুমতি প্রত্যাহার করে।
এতে NEET-এর মাধ্যমে ভর্তি হওয়া ৫০ শিক্ষার্থী (যার মধ্যে ৪৪ জনই মুসলিম) অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। পরে তাদের অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন মুসলিম হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নেয়।
২০২৫ সালে ৬৫ বার ইন্টারনেট বন্ধ
তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা। ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে ৬৫ বার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, যা ওই বছর ভারতে নথিভুক্ত মোট ইন্টারনেট বন্ধের ৬০ শতাংশেরও বেশি।
এছাড়া ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে প্রায় দুই মাস ভিপিএন ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ওই সময় ভিপিএন ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, গবেষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর এসব বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের মামলার মাধ্যমে হয়রানি
মানবাধিকারকর্মী খুররম পারভেজ ও সাংবাদিক ইরফান মেহরাজের বিরুদ্ধে মামলার মাধ্যমে হয়রানির ঘটনা প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। UAPA-এর অধীনে দায়ের করা মামলায় দীর্ঘ সময় বিচার-বিহীন অবস্থায় রেখে তাদেরকে বন্দি রাখা হয়। অতঃপর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লির আদালত তাদের জামিন দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইন ব্যবহারের মাধ্যমে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের ওপর আইনি চাপ তৈরি হচ্ছে। ফোরামের মতে, দীর্ঘ বিচার-পূর্ব আটক একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে।
অনলাইনে রাজনৈতিক মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ মে ঐতিহাসিক একটি ভিডিও শেয়ার করার পর PDP নেত্রী ইলতিজা মুফতির এক্স অ্যাকাউন্ট ভারতে সীমিত করে দেওয়া হয়।
ঘটনাটি জম্মু ও কাশ্মীরে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং অনলাইন কনটেন্টের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
উপসংহার
ফোরাম এসব ঘটনাকে ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২১এ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত শিক্ষার অধিকারের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
বইয়ের দোকান থেকে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিভিন্ন ক্ষেত্রের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, নিরাপত্তানীতির অজুহাতে জম্মু-কাশ্মীরে দখলদার ভারতের দমন-পীড়ন কেবল রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষা, গবেষণা, সাংবাদিকতা এবং সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/3xjxyjr5


