বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের অন্য পাঁচ সীমান্তে হত্যাকান্ড শূন্য

0
331

বাংলাদেশ সীমান্তে বেপরোয়া গুলি করে মানুষ খুন করছে সন্ত্রাসী বিএসএফ। গত (২২ ও২৩ জানুয়ারি) প্রায় ২৪ ঘান্টায় বিএসএফের গুলিতে ৫ বাংলাদেশি নিহতের খবর পাওয়া গেছে।অথচ, ভারতের সাথে ৬টি দেশের স্থল সীমান্ত রয়েছে। এ দেশগুলো হল পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ। আর ভারতের সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে শ্রীলঙ্কার সাথে। এই সবগুলো দেশের সীমান্তেই ভারতের সীমান্তসন্ত্রাসী বাহিনী বা বিএসএফ মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশের সীমান্তে হত্যাকান্ড শূণ্য। অথচ ২০১৭ সালের ৯ মার্চ ভারত- নেপাল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তসন্ত্রাসীদের এসএসবির গুলিতে গোবিন্দ গৌতম নামে (৩২) এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। নেপালের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাওয়া ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তখন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ডর কাছে এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং নিহতের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। পরে গোবিন্দ গৌতমকে রাস্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়।

এদিকে, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিতে ৩৭ জন এবং নির্যাতনে ছয় জন। আহত হয়েছেন ৪৮ জন। অপহৃত হয়েছেন ৩৪ জন। ২০১৮ সালে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। বেসরকারি হিসাব ধরলে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সীমান্ত হত্যা বেড়েছে তিনগুণের বেশি।

মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সীমান্তে নাগরিকদের মৃত্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ জানানোর রেওয়াজ ছিল, এখন সেটা ততটা জোরালো নয়। অনেকে হয়রানির ভয়ে বিএসএফের নির্যাতনের কথা স্বীকারও করছেন না।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃত্যুঘাতী নয় এমন অস্ত্রের ব্যবহার করার কথা থাকলেও উল্টো মরণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। নানা আশ্বাস ও সমঝোতার পরেও সীমান্তে হত্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বন্ধুত্বসূলভ সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। হত্যাকান্ড বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সর্ব মহলে সমালোচনা চলছে।

বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম ফজলে আকবর (অব.) দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চোরাচালান ও গরু আনা নিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। সীমান্তে অবৈধ প্রবেশ বন্ধের পাশাপাশি বিএসএফকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ভারতের সাথে ৬টি দেশের সীমান্ত থাকলেও বাংলাদেশ ছাড়া অন্যদেশের সীমান্তে হত্যাকান্ড নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ বেপরোয়াভাবে মানুষ খুন করে গুলি ও নির্যাতনের মাধ্যমে। এর মূল কারণ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় আমরা দিতে পারছি না। ভারত বার বার সীমান্তে হত্যা বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবে না বলে কথা দিয়েও কথা রাখছে না। এ জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক মহলের দ্বারস্থ হতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সীমান্ত হত্যাবন্ধে কঠোর হতে পারছেনা, এ জন্য আমাদের জাতিসংর্ঘে গিয়ে এ ধরনের হত্যা বন্ধে মামলা করার বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৩ থেকে ২৬ এপ্রিল ঢাকার পিলখানায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে প্রাণঘাতী অস্ত্রের (লিথ্যাল উইপন) ব্যবহার হবে না বলে জানানো হয়। বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের মতো বিএসএফ মহাপরিচালক (ডিজি) কে কে শর্মাও একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিভিন্ন সময়ে যতোই ‘নন-লিথ্যাল উইপন’ ব্যবহারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ঘটেছে উল্টোটি।

গত ২ জানুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম বলেন, বিজিবির হিসাবে গতবছর সীমান্ত হত্যার সংখ্যা ৩৫। তবে গত চার বছরের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, আমরা বিএসএফকে এ বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাদেরকে অনুরোধ করা হয়েছে। বিএসএফ প্রধানও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে ৪৩ জন নিহত হওয়া ছাড়াও ৩৯ জনের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ভায়বহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে গত বছরের ২৭ এপ্রিল। ওইদিন নওগাঁ জেলার সীমান্তবর্তী রাঙামাটি এলাকায় আজিম উদ্দিন নামে এক যুবককে আটকের পর তার দুই হাতের ১০টি আঙুলের নখ তুলে ফেলে রাইফেলের হাতল ও লাঠি দিয়ে বর্বর নির্যাতন করা হয়।

আসকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বিএসএফের হাতে ৪৬ বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩১ জনে। ২০১৭ সালে ছিল ২৮। একছর পর ২০১৮ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৪ জনে। অথচ একবছরের মাথায় ২০১৯ সালে সীমান্তে হত্যার শিকার হয় ৪৩ বাংলাদেশী। তিনগুণেরও বেশি। এর আগে ২০০৯ সালে বিএসএফের গুলিতে রেকর্ড সংখ্যক ৬৬ জন বাংলাদেশি হত্যার শিকার হয়েছিল।

বিজিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় দাবি করা হতো যে, গরু চোরাচালানে জড়িত থাকার কারণে ৯৫ শতাংশ গুলির ঘটনা ঘটেছে। যদিও গত কয়েক বছরে গরু চোরাচালনের ঘটনা একেবারে কমে গেছে। ২০১৪ সালে ভারত গরু রফতানি বন্ধের পর বাংলাদেশ গরু উৎপাদনে যথেষ্ট। বিজিবির এক তথ্যে দেখা যায়, গরু নিষিদ্ধের আগে ২০১৩ সালে ঈদুল আযহায় ২.৩ মিলিয়ন গরু আসতো। অথচ ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৯২ হাজার।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, গত এক বছরে সীমান্তে হত্যা অনেক বেড়েছে। সীমান্তসন্ত্রাসী বাহিনী সীমান্ত পার করছেন এমন কাউকে দেখলেই গুলি করছে। এই প্রবণতা বদলাতে হবে। তিনি বলেন, দুই দেশের সীমান্তে অনেক অভিন্ন পাড়া রয়েছে। যেখানকার মানুষেরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা ছাড়াও জীবিকার সন্ধানেও অনেকে সীমান্ত পারাপার হয়। শীফা হাফিজা বলেন, দেখা মাত্রই গুলি করা মারাত্মক ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘন। এমনটি না করে দুদেশের আইন মতে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা উচিত। সীমান্ত হত্যা ঠেকাতে সব কিছু বিবেচনার পাশপাশি ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের কথাও মাথায় রেখে নতুন বছরে কাজ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

সূত্র: ইনকিলাব

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন