বাবরি মাসজিদের ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণ: মুসলিমদের সুপ্ত চেতনায় স্ফূলিঙ্গের ছোঁয়া

    1
    1470
    বাবরি মাসজিদের ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণ: মুসলিমদের সুপ্ত চেতনায় স্ফূলিঙ্গের ছোঁয়া

    উপমহাদেশের ভূরাজনৈতিক পাঠ প্রতিনিয়তই জটিল থেকে জটিলতর আকার ধারণ করছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল মনে হলেও বাস্তবে হিশেবটা সরল; অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবেন।

    এই আর্টিকেলের শুরুতেই আমরা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি সামগ্রিক আলাপ সেরে নিবো। শেষের অংশে আরো সুনির্দিষ্ট আলোচনায় প্রবেশ করা যাবে।

    (একটি ডিসক্লেইমার: রাসুল সা. এর হাদিসের দর্পণে বাস্তবতা পরোখ করাকে যারা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব(Conspiracy Theory) মনে করেন, তাদের এই ‘মনে করাকে’ আমরা বিন্দুমাত্রও কেয়ার করি না। আমরা তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করি)


    গতো ৫ই আগস্ট, উলুউলু-রামধ্বনিতে কাঁপছে ভারতের আকাশ। গুজরাট-দিল্লি-কলকাতাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি জোনে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মন্দিরেমন্দিরে চলছে রামধর্মের বয়ান। গণমাধ্যমে মুহুর্মুহু বিবৃতি। লাল-হলুদের গেরুয়া সাজে একটি রথযাত্রা ছুটে চলছে। গন্তব্য বাবরি মাসজিদ।

    এবার চলুন ঘুরে আসা যাক ঠিক একবছর আগের এই দিনটাতে। হঠাৎ করেই পুরো কাশ্মীরকে লকডাউন করে ফেলা হলো। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা। কাশ্মীর উপত্যকার প্রতিটি ঘরের দরজায় খিল তোলা। কোনো কোনো বাড়ি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘরের দোরে দোরে লোডেড রাইফেল তাক করে দাঁড়ানো পুলিশ। পুরো এলাকা গণমাধ্যমের এন্ট্রি-রেস্ট্রিক্টেড। নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবার মনে চাপা আতঙ্ক। পৃথিবীর কেউ জানে না কী হতে যাচ্ছে কাশ্মীর উপত্যকায়। ২০১৯ সালের ৫ই আগস্টের ওই দিনটিতে কাশ্মীরের আকাশ থেকে আজাদির সূর্য চিরতরে অস্তমিত করে দেয়ার লক্ষে অত্র অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে একীভূত করে নেয় হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার।

    গতো ৫ আগস্ট ওই ঘটনার বর্ষপূর্তিতে বাবরি মাসজিদের ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। স্বয়ং মোদির উপস্থিতিতে গেরুয়া সন্ত্রাসীরা অংশ নেয় ভূমিপূজায়।


    গেলো মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশটির নতুন ভৌগলিক মানচিত্র প্রকাশ করেছেন। মানচিত্রে ভারতশাসিত কাশ্মীর ও গুজরাটের জুনাগড়সহ ভারতের কিছু এলাকাকে পাকিস্তানের অংশ হিশেবে দেখানো হয়েছে।

    প্রশ্ন হতে পারে, মানচিত্রের রেখাপাতে কিছু পরিবর্তন কী এমন গুরুত্ব বহন করে?

    এই যোগসূত্র ধরার জন্য আমাদেরকে আরেকটু পেছনে যেতে হবে। চলতি বছরের জুন মাসে একইভাবে নেপালও ভারত নিয়ন্ত্রিত ৩টি এলাকাকে নিজেদের সাথে অঙ্গীভূত দেখিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ম্যাপ প্রকাশ করে। ওই ঘটনায় ভারত তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলো।

    সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তে চীনের সরব উপস্থিতির খবর গণমাধ্যমের হটটপিক। লাদাখ থেকে অরুনাচল পর্যন্ত পুরো সীমান্তে সৈন্য মোতায়ন করা হয়েছে। শিফট করা হয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক গাড়িবহর। চীনের এই আগ্রাসী মনোভাবকে নিছক হন্তদন্ত ভাবাটা ভুল হবে। ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড প্রকল্পের বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করতে চাচ্ছে না দেশটি। তাই লাদাখের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা খেলতেও পিছপা হবে না বেইজিং।


    সাম্প্রতিক সময়ে ভারত মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। করোনায় আক্রান্তের হারে এখন শীর্ষে রয়েছে দেশটি। জিডিপি গ্রোথ নেগেটিভে। বেকারত্বের অভিশাপ পিছু ছাড়ছে না। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ লক্ষলক্ষ হেক্টর জমির ফসল। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে করছেন আত্মহত্যা।

    অপরদিকে ভূরাজনৈতিকভাবে প্রতিবেশী সীমান্তগুলো থেকে আসছে একের পর এক দুঃসংবাদ। চীন-পাকিস্তান-নেপাল-মায়ানমার ভারতকে চোখ রাঙাচ্ছে। আবহমানকাল ধরে ভারতের গোলামী করে আসা বাংলাদেশ সরকারও এখন চীনের চাপ আর সুবিধা বিবেচনায় নিউট্রাল অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে।

    এতো না পাওয়ার মধ্যেও, বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হয়েও মোদি সরকারের রাম-রাম খেলায় মত্ত হয়ে আছে ভারতের মূর্খ জনগণ। রামমন্দিরের দোহাই দিয়ে, অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের এই অর্থনৈতিক-তলানি অবস্থা আড়াল করতে দারুণভাবে সফল হয়েছে মোদি। মিডিয়ার ফেইক তথ্য, সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়ার নীতি ভারতীয়দের দিনশেষে অন্ধ বানিয়ে রেখেছে। ভারতীয়রা টেরও পাচ্ছে না ধর্মযুদ্ধের বয়ান ফুটিয়ে তাদেরকে কীভাবে বাস্তবতার করুণ চিত্র থেকে বিমুখ রাখা হয়েছে।


    যুগ যুগ ধরে কাশ্মীরের মুসলিমরা যখন হিন্দুত্ববাদী পুলিশ প্রশাসনের বুটের চাপায় পিষ্ট হয়েছে, নারীরা সম্ভ্রমহারা হয়েছে, শিশুরা অবুঝ আর্তনাদ করেছে, তখন স্বজাতি ভারতীয় মুসলিমরা সেটা কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে পাশ কাটিয়ে গেছে। কাশ্মীরিদের আর্তনাদ তাদের চিন্তার সমুদ্রে বিন্দুমাত্র ঢেউ তুলতে পারেনি। ‘আমরা তো বেশ আছি’, ‘আমাদের তো সবকিছু ঠিকঠাক চলছে’, এমনসব আত্মভোলা বুলি আওড়িয়ে তারা কাশ্মীরিদের অসহায়ত্বের প্রতি উপহাস ছুঁড়ে দিয়েছে।

    কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ভারতীয় হিন্দুরা অতোটা খারাপ না। আমরা মিলেমিশে সম্প্রীতি বজায় রেখে দিনাতিপাত করছি, এমনসব তুষ্টির বাচন তুলে নিজেদের ক্ষত আড়াল করেছে।

    কাশ্মীরিরা তখন আফসোস করে বলতো, ভারতীয় মুসলিমরা যতোদিন না নিজেরা আক্রান্ত হবে ততোদিন তারা আমাদের দুঃখ বুঝবে না।

    গেলো বছর নাগরিক সংশোধনী বিল পাশ এবং তৎপরবর্তী মুসলিম-নিধনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে মুসলিমদের সামনে হিন্দুত্ববাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভারতীয় মুসলিমরা বুঝতে পেরেছে যতোই গণতন্ত্রের জিগির তোলা হোক, শান্তি-সম্প্রীতির স্লোগান জপা হোক, পূজায় গিয়ে প্রসাদ চাটা হোক, ওরা কখনোই আমাদেরকে টলারেইট করবে না। এই বুঝ এখন ভারতের গণতন্ত্রপন্থী, সুফিবাদী কিংবা লিবারেল সব ঘরানার মুসলিমদের কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।


    বাবরি মাসজিদের ক্ষতের উপর রামমন্দির নির্মাণ ভারতীয় মুসলিমদের সুপ্ত, ঘুমন্তপ্রায় ইমানি চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটাতে স্ফূলিঙ্গের ন্যায় কাজ করবে। স্বজাতির মধ্যে সবধরনের বিভক্তি ছেড়ে তাওহিদের ঝাণ্ডাতলে একত্রিত হতে প্রেষণা জোগাবে। এই কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহে অনেক সেক্যুলার-লিবারেল মুসলিমও এখন সুর পাল্টেছে। চেতনার রং বদলেছে। ইতিহাসের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। বাস্তবতার নিপাট সত্য উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।

    এই যে শিরক আর তাওহিদের ডাইকোটমি- এটা অনুধাবন করাটা মুসলিমদের জন্য অনিবার্য ছিলো৷ মুসলিমরা গতোকাল পর্যন্ত ঘরের শত্রুর সাথে আপোষ করে এসেছে। শত্রুকে ইচ্ছাপূর্বক কল্পনার আতিশয্যে বন্ধু ভেবেছে।


    ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ওয়ান-টু-মেনি কনফ্লিক্ট নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। প্রতিবেশী পাঁচটি দেশের সাথে বৈরী সম্পর্ক(এমনকি যুদ্ধ-যুদ্ধ সম্পর্ক) রেখে প্রগ্রেস লাভ অসম্ভব এটা জিওপলিটিক্স নিয়ে অল্প-বিস্তর জ্ঞান রাখেন এমন যে কেউ বলবে। এর মধ্যে চীন এবং পাকিস্তানের আগ্রাসী মনোভাব এই কনফ্লিক্টে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। যেকোনো একটি বিচ্যুতি, সিদ্ধান্তে কালক্ষেপণ ওই অঞ্চলে ওয়ার-গ্রাউন্ড তৈরি করে দিতে পারে।

    নেপাল-পাকিস্তানের পরপর নতুন মানচিত্র প্রকাশ, চীনের চলমান স্ট্র‍্যাটেজি অন্তত বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ব্যাপার মাত্র, এটা মোটামুটি পরিষ্কার। লক্ষ ভারতকে কোণঠাসা করে রাখা; ওয়ান-বেল্ট প্রকল্প বাস্তবে রূপ দেওয়া।


    ইবনে কাসির রহ. একটি মূলনীতি বলেছেন। ‘আল্লাহ তা’য়ালা যখন কোনো কিছু ঘটাতে চান, তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও প্রেক্ষাপট তৈরি করেন।

    সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ হতে পারে আল্লাহ তা’য়ালার প্রেক্ষাপট তৈরির সেই আলামত। ওয়াল্লাহু আ’লাম। রামমন্দির নির্মাণ এবং চলমান নির্যাতন মুসলিমদের ইমানি চেতনায় যে বারুদ লাগিয়ে দিয়েছে সেটা মুজাহিদিনের জন্য সবুজ সংকেত। মুজাহিদিনরা এই ইমানি জোয়ার কাজে লাগিয়ে ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকভাবে ই’দাদ ও জিহাদের জন্য কাজ করবেন। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গেরিলা আক্রমণের কৌশল সম্পর্কে মুসলিমদের দীক্ষিত করবেন।

    গেরিলা কিংবা লোন-উলফ আক্রমণ হতে পারে অত্র এলাকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্ট্র‍্যাটেজি। কারণ মুসলিমরা খোদ হিন্দুদের মাঝে বসবাস করছে। অভ্যন্তরীণ-শত্রু তটস্থকরণে গেরিলা আক্রমণ কতোটা ফলপ্রসূ তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য এই হামলা-আক্রমণ এখনই হচ্ছে না। আপাতত দাওয়াহ-ই’দাদের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।

    অপরদিকে আফগানিস্তানে ইসলামি ইমারতের পুনর্গঠন নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের মুসলিমদের মনে শক্তি সঞ্চার করবে।


    ভূরাজনৈতিকভাবে ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়া ভারত, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভারত(চীনের আগ্রাসী মনোভাব অন্তত যুদ্ধরই ইঙ্গিত দেয়), অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু ভারতকে ইমানি বলে বলীয়ান একদল প্রশিক্ষিত এমনকি অভ্যন্তরীণ মুজাহিদিনের পক্ষে মোকাবিলা করাটা নিঃসন্দেহে অসম্ভব কিছু নয়।

    সমস্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একটি চূড়ান্ত বাস্তবতার দিকেই বারবার আমাদের দৃষ্টি ভিড়ায়। চিন্তার ক্যানভাসে কেবল একটি মানচিত্রই এঁকে দেয়। আর সেটা হলো রাসুল সা. এর প্রতিশ্রুত গাজওয়াতুল হিন্দের ফিল্ড।

    মুসলিমদের প্রতি মোদি সরকারের এই আগ্রাসী মনোভাব, পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ বুমেরাং ইফেক্ট হয়ে ওদের দিকেই ফিরে যাবে। বি-ইযনিল্লাহ!

    এখন সময়টা ধৈর্যের, দাওয়াহ-ই’দাদ-রিবাত ও কিতালের। নুসরত ও বিজয় নিকটবর্তী। দূরে মাঞ্জিলের ঝা-চকচকে আলো দেখা যাচ্ছে। হাঁটতে হবে আরেকটু পথ। দৃঢ় ও সন্তর্পণে। ইমান ও কুফরের সীমারেখা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাওহিদ ও নেফাক দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত আপনার। কোন শিবিরে আপনি অবস্থান নিবেন। নিঃসন্দেহে বিজয় মুমিনদের জন্যই নির্ধারিত।


    লেখক: আবু নাফি আল-হিন্দি

    ১টি মন্তব্য

    মন্তব্য করুন

    দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
    দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

    পূর্ববর্তী নিবন্ধকুরবানির ঈদ ও আমাদের করণীয়
    পরবর্তী নিবন্ধগাম্বিয়াকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যার তথ্য দিতে ফেসবুকের অস্বীকৃতি