ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ : মুসলিমদের দেবে না থাকার জায়গা

0
481
ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ : মুসলিমদের দেবে না থাকার জায়গা

ভারতের বহরমপুরে মুসলিমদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি এবং ঘর ভাড়া দেয়া যাবে না বলে ‘ফরমান জারী’ করেছে এক শ্রেণীর প্রোমোটর এবং হিন্দুত্ববাদীদের একটি স্থানীয় ক্লাব।
আগে মুম্বাই,হরিয়ানা,বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেত মুসলিমদের ঘরভাড়া দেওয়া হচ্ছে না। পশ্চিমবাংলায় এই ধরনের ঘটনা তেমন প্রকাশ্যে ছিল না। বর্তমানে কলকাতায় এই ধরনের ঘটনা সামনে আসতে শুরু করেছে। এখন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় খোদ বহরমপুরে মুসলিমদের ফ্ল্যাট পেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

২০১৪ সালের পর থেকে তামাম হিন্দুস্তানে অপ্রতিরোধ্য এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী শাসনতন্ত্র গোটা দেশকে গ্রাস করেছে। মুর্শিদাবাদ জেলায় যেহেতু তাওহিদবাদী মুসলিমদের বসবাস, আর উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা সেই জেলায় অপেক্ষাকৃত কিঞ্চিত অর্থনীতিক ক্ষেত্রে উন্নত, তাই তারা মুসলিমদেরকে শহরের জীবনযাপনে সুযোগ দিতে চায় না।

যেকোনোভাবেই মুসলিমদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করা যাবে না। ৬ জন মুসলিম ফ্ল্যাট-ক্রেতার নিকট বায়নাবাবদ আগাম নিয়েও মুসলিম হওয়ার কারণে টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ক্লাবের দোহাই দিয়ে তথাকথিত হিন্দু-মাতব্বরেরা প্রোমোটারকে টাকা অর্থাৎ বায়না ফেরত দিতে বাধ্য করছে।
উল্লেখ্য, ৭০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহরমপুর। এখন শিক্ষায়-চাকরিতে অনেকটা এগিয়ে, মুসলিমদের অনেকেই মেডিক্যাল অফিসার, কলেজ শিক্ষক, পুলিশ অফিসার,সাধারণ প্রশাসনে উঁচু পদে চাকরি করছেন। ফলে বহরমপুর শহরে নিজস্ব বাসস্থানের প্রয়োজনে এইসব সরকারি আধিকারিকরা ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন। ব্যাঙের ছাতার মতো বহরমপুর শহরে ফ্ল্যাট তৈরি হলেও প্রায় সব প্রোমোটারের অলিখিত সিদ্ধান্ত, কোনো মুসলিমকে ফ্ল্যাট বিক্রি নয়।

তারা চায় মুসলিমরা গ্রামীণ পরিবেশে নিম্নশ্রেণির বেশে বসবাস করুক। শহরের জীবনের স্বাচ্ছন্দে, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞানের শিক্ষার সুযোগ তারা দিতে চায় না। এই সমস্ত প্রোমোটারদের ব্যবহার করছে হিন্দু সন্ত্রাসী দল আরএসএস। তাদের স্পষ্ট কথা, ইসলাম ধর্মী লোকদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি কিংবা ঘর ভাড়া দেওয়া যাবে না।
এই ফ্ল্যাট যেখানে গড়ে উঠছে তার কাছেই রয়েছে সুহৃদ সংঘ নামে একটি ক্লাব। কিষাণ ঘোষ লেনের বাসিন্দারা প্রোমোটারকে স্থানীয় ওই ক্লাবে ডেকে পরিষ্কার জানিয়েছে, কোনও মুসলিমকে ফ্ল্যাট বিক্রি করা চলবে না। যাদের বায়না নিয়েছেন তা ফেরত দিতে হবে। না হলে এখানে ফ্ল্যাট তৈরি করতে বাধা দেব। এমনকি নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, প্রোমোটার ইজারুল সেখ জানিয়েছেন যে ব্যবসা করতে এসে অনেক কিছু আপস করতে হয়। বাধ্য হয়ে যেসব মুসলিমদের অগ্রিম নিয়েছিলাম তা ফেরত দিয়েছি। এখন অমুসলিমদের এই ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হবে। তাতে সব মিলে ৫০ লক্ষ টাকা কমদামে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হবে। লোকসান হলেও উপায় নেই। আসলে বহরমপুর শহরে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট, সব কিছুতেই হিন্দু ক্রেতার থেকে মুসলিম ক্রেতারা অনেক বেশি দাম দেয়। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে স্বর্ণময়ী রোড, মানকুমারী রোডে অনেকগুলি ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। কোথাও কোনো প্রোমোটার মুসলিমকে ফ্ল্যাট বিক্রি করছে না।
আরএসএস এবং সংঘ পরিবার এবং দিল্লি ওয়ালারা পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবাংলায় ও মুসলিম বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে তুলছে। তারা বিভিন্ন ক্লাব, ধর্মীয় সংগঠন, গণসংগঠনকে কাজে লাগাচ্ছে। মানুষকে ঘৃণা শেখাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য ক্লাবটিকে ব্যবহার করেছে।
মুর্শিদাবাদ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা এখানে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে মুসলিমদের উপর হত্যাকাণ্ড চালাতে চাইছে বিজেপি, আরএসএস হিন্দু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

ভারতে মুসলিমদের উপর এমন নির্যাতনের ঘটনা এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। একদিকে হিন্দুরা সমাজে প্রভাবশালী হতে চায়, অন্যদিকে সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে মুসলিমদের উপর চালাতে চায় নির্যাতনের স্টিমরোলার। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৌলিক অধিকারসমূহ থেকেও মুসলিমদের বঞ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে হিন্দু নরপশুরা। কিছুদিন আগে এক রোগী মুসলিম হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি তারা। পরবর্তীতে রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
এমনিভাবে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা লাগোয়া এক এলাকার দুটি গেস্ট হাউস থেকে ১০ জন শিক্ষককে শুধু মুসলিম হওয়ায় তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অগ্রিম অর্থ দিয়ে ঘর বুকিং করার পরেও ‘পাড়ার হিন্দু লোকেরা মুসলিমদের থাকতে দিতে চায় না’ এই অজুহাতে গেস্ট হাউসের কর্মীরা তাদের চলে যেতে বলেন।
হিন্দু সন্ত্রাসীদের এমন উগ্র নীতির পরও মুসলিমদেরকে শোনানো হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার ফাঁপা বুলি। ভারতীয় মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে যা গিলানো হয়েছে তা আসলে দিবাস্বপ্ন। মুসলিমদের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বেষ ছিল, আছে, থাকবে। ইমান ও কুফরের লড়াই চিরকাল চলবে। তা মুসলিমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে ততই ভাল। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তালায়া আমাদের সতর্ক করে সূরা আলে ইমরানের ১১৮ নম্বর আয়াতে বলে দিয়েছেন।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآَيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ (118)
“হে বিশ্বাসীগণ, তোমাদের মুমিনদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদেরকে ধ্বংস করতে চেষ্টার ত্রুটি করবে না। তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া ও বিপদে ফেলাই তাদের একান্ত কামনা। তাদের মুখেই বিদ্বেষ ও শত্রুতা প্রকাশ পাচ্ছে, আর তাদের হৃদয়ে যা গোপন আছে তা আরো ভয়ংকর। তোমাদের জন্য নিদর্শন তথা শত্রুদের চক্রান্ত বিশদভাবে বণর্না করেছি, যদি তোমরা বুঝতে পার।” (৩:১১৮)

সূরা আলে ইমরানের ১১৯ ও ১২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
هَا أَنْتُمْ أُولَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (119) إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (120)
” দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশতঃ আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আর আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন।
তোমাদের যদি কোন মঙ্গল হয়; তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয় তাহলে আনন্দিত হয় আর তাতে যদি তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে। (৩:১১৯-১২০)

এই আয়াতগুলোতে মুসলিমদের শত্রু কাফের-মুনাফিকদের নোংরা চিন্তাধারা ও ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিয়ে মুসলিমদের বলা হচ্ছে, এমনটি ভেবো না যে, তোমরা কাফের মুশরিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে, তাদের প্রতি বন্ধুত্বের প্রকাশ ঘটালে তারাও তোমাদের সাথে শত্রুতা বন্ধ করবে এবং তোমাদের ব্যাপারে মত পরিবর্তন করবে। এমনকি তারা মুখে ঈমান আনার কথা বললেও তাদের অন্তরে রয়েছে তোমাদের প্রতি অসীম বিদ্বেষ।
মুসলিমদের উন্নতি ও অগ্রগতির খবরে কাফের-মুনাফিকরা মর্মপীড়া অনুভব করে। আর মুসলিমরা কষ্ট ও সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের খুশীর সীমা থাকে না। তাই শত্রুদের চক্রান্তের মোকাবেলায় মুসলিমদেরকেও প্রতিরোধকামী হতে হবে এবং আল্লাহর বিধি-বিধান পালনে ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সুদৃঢ় থাকলে শত্রুদের শত চক্রান্তেও মুসলিমদের কোনো ক্ষতি হবে না এবং তারা কোনোভাবেই মুসলিমদের পরাজিত করতে পারবে না।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন