শাহাদাত : জান্নাতের সংক্ষিপ্ত পথ

1
684
শাহাদাত : জান্নাতের সংক্ষিপ্ত পথ

প্রতিটি মানযিলেরই কয়েকটি পথ থাকে। আমরা সাধারণত সে পথটিকেই খুঁজি, যে পথে খুব দ্রুতই মানযিলে পৌঁছোনো সম্ভব। সহজ এবং সংক্ষিপ্ত পথেই আমরা যাত্রা করতে আগ্রহ বোধ করি।

মুমিনের প্রকৃত মানযিল হচ্ছে জান্নাত। আমরা জান্নাতের জন্যই দুনিয়ার জীবনে সদাসর্বদা চেষ্টা রত থাকি। জান্নাতে পৌঁছোনোরও বেশ কিছু পথ আছে। তবে মুমিনের প্রকৃত এবং চিরস্থায়ী মানযিল জান্নাতে পৌঁছোনোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হচ্ছে ‘শাহাদাত’। হ্যাঁ, শাহাদাতই জান্নাতে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ।

প্রখ্যাত তাবেয়ী হাসান আল বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন,

“ان لكل طريق مختصرا، و مختصر طريق الجنة الجهاد.”

“প্রতিটি গন্তব্যের একটি সংক্ষিপ্ত পথ থাকে। জান্নাতের সংক্ষিপ্ত পথ হলো জিহাদ।” [হিলইয়াতুল আউলিয়া : ১৫৭/৬]

নিঃসন্দেহে শাহাদাত মুমিনজীবনে অত্যন্ত দামি এক নি’আমত। জান্নাতের যাওয়ার পর, আপনি কি আল্লাহর কাছে ফের দুনিয়ায় আসার আর্জি জানাবেন? আপনি হয়তো উত্তরে বলছেন, “নাহ! এমনটা কেনো করব? চিরসুখের জান্নাতে যাওয়ার পর এ সংগ্রামমুখর দুনিয়ায় কেনো আসতে চাইব আবার?” কিন্তু আপনি কি জানেন, শহীদরা জান্নাতে যাওয়ার পরও আবার দুনিয়ায় আসতে চাইবেন? হ্যাঁ, শাহাদাত এমন এক নি’আমত, যা পেয়ে জান্নাতবাসী হওয়ার পরও ব্যক্তি বারবার দুনিয়ায় এসে তা আবার পেতে চাইবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“‏ مَا أَحَدٌ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يُحِبُّ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا وَلَهُ مَا عَلَى الأَرْضِ مِنْ شَىْءٍ، إِلاَّ الشَّهِيدُ، يَتَمَنَّى أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الدُّنْيَا فَيُقْتَلَ عَشْرَ مَرَّاتٍ، لِمَا يَرَى مِنَ الْكَرَامَةِ ‏”‏‏.‏

“জান্নাতে প্রবেশের পর আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেওয়া হয়। একমাত্র শহীদ ব্যতীত; সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে যেন দশবার শহীদ হয়। কেননা সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে।” [সহীহ বুখারী : ২৮১৭]

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন,

“وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ…. لَوَدِدْتُ أَنِّي أُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللهِ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ.”

“সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ!…. আমি অবশ্যই কামনা করি যে, আমাকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হয়, আবার জীবিত করা হয়। আবার শহীদ করা হয়, আবার জীবিত করা হয়। আবার শহীদ করা হয়, আবার জীবিত করা হয়। আবার শহীদ করা হয়।” [সহীহ বুখারী : ৭২২৬]

নিশ্চয়ই মৃত্যুর যন্ত্রণা অতীব কঠিন। প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। তবে যারা শহীদ হবেন, পান করবেন শাহাদাতের অমিয় সুধা, তাদের মৃত্য-যন্ত্রণা কেবল চিমটি কাটার যন্ত্রণার সমতূল্য হবে। সুবহানাল্লাহ। দেখুন, আল্লাহর রাসূল ﷺ কী বলছেন,

“‏ مَا يَجِدُ الشَّهِيدُ مِنْ مَسِّ الْقَتْلِ إِلاَّ كَمَا يَجِدُ أَحَدُكُمْ مِنْ مَسِّ الْقَرْصَةِ ‏-“‏

“শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুর কষ্ট শুধু ততটুকুই অনুভব করে, তোমাদের কাউকে একবার চিমটি কাটলে সে যতটুকু কষ্ট অনুভব করে।” [জামেউত তিরমিজি : ১৬৬৮]

মৃত্যু-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এর চেয়ে আর বড় সুযোগ আর কী হতে পারে! আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন।

দুনিয়ায় চলতে গিয়ে আমরা সবাই কমবেশি গুনাহ করি। আল্লাহর রাসূল তো নিজেই বলেছেন, “প্রত্যেক বনী আদমই গুনাহগার।” আল্লাহ যদি নিজ রহমে আমাদের গুনাহ ক্ষমা না করেন, তাহলে আমরা সবাই জাহান্নামি হব। অবশ্য তাওবা করলে আল্লাহ আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। যে ব্যক্তি শহীদ হবেন, তিনি যদি তাওবা না-ও করেন, তবুও আল্লাহ তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন, যদি তাঁর আমলনামায় কোনো শিরক-কুফরের গুনাহ না থাকে। যেমন নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‏”‏ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سِتُّ خِصَالٍ يُغْفَرُ لَهُ فِي أَوَّلِ دَفْعَةٍ وَيَرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ-“

“শহীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ছয়টি পুরস্কার বা সুযোগ রয়েছে। তাঁর প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সাথে সাথে তাঁকে ক্ষমা করা হবে, তাঁকে তাঁর জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হবে।” [জামেউত তিরমিজি : ১৬৬৩]

শাহাদাতের এ অমিয় সুধা যারা পান করবেন, তাদেরকে তো মৃত বলা যাবে না। বরং তাঁরা তো জীবিত। শুধু জীবিতই নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলছেন,

“وَ لَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتٌ ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّ لٰکِنۡ لَّا تَشۡعُرُوۡنَ-“

“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলোনা, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা তা অবগত নও।” [সূরা বাকারা : ১৫৪]

আল্লাহ তাআলা আরো স্পষ্টভাবে বলেন,

“وَ لَا تَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ قُتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتًا ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ یُرۡزَقُوۡنَ-“

“যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনও মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, তারা তাদের রাব্ব হতে জীবিকাপ্রাপ্ত।” [সূরা আলে ইমরান : ১৬৯]

শাহাদাতের এতশত মর্যাদা থাকার পরও আমরা এ থেকে দূরে থাকতে চাই। একদিকে শাহাদাতের এত মর্যাদার বিশদ বর্ণনা আমাদের সামনে স্পষ্ট, অপরদিকে দুনিয়াব্যাপী মাযলুম মুসলিমদের বুকফাটা আর্তনাদ, তবুও আমরা শহীদ হতে আগ্রহ বোধ করি না! কিন্তু কেনো? কোথায় গেলো আমাদের সেই অমিত তেজ? আমরা না উমার রাদিআল্লাহু আনহুর উত্তরসূরি? আমরা না হামযা রাদিআল্লাহু আনহুর উত্তরসূরি? আমাদের পূর্ব পুরুষ না হানযালা রাদিআল্লাহু আনহু? সালাহউদ্দিন আইয়ূবী, উসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর রহিমাহুমুল্লাহদেরকে কি আমরা ভুলে গেছি? হে আল্লাহ, আমাদের ঘুম ভেঙে দাও, আমাদের ভেতর জাগিয়ে দাও শাহাদাতের অদম্য তামান্না। আমীন।


লেখক: আবদুল্লাহ আবু উসামা

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন