কাবুল সরকারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি

1
1091
কাবুল সরকারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি

দীর্ঘ উনিশ বছর পূর্বে আফগানিস্তান আক্রমণ করে ঐতিহাসিক ভুল করেছে আমেরিকা ও তার মিত্ররা। লাখো মানুষ নিহত হয়েছেন; আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরো কয়েক লাখ। যদি প্রথম দিন থেকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাওয়া হতো, তাহলে এতসব ধ্বংস হতো না। যদিও তৎকালীন আফগান সরকার (ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান) সবরকম আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষ শুধু যুদ্ধ ও আগ্রাসনের পথটিই বেছে নেয়।

বস্তুত, স্বার্থপর গোষ্ঠী ও স্থানীয় দোসরদের জোরালো সমর্থন ও বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা পেয়েছিল আগ্রাসীরা। বিদেশি শত্রুদের গোলামি ও উৎসাহ প্রদান আফগানিস্তানের ইতিহাসে নতুন নয়। এ দেশীয় দালালরা আরো আগে থেকেই আগ্রাসীদের গোলামি করে নিজ দেশের মানুষকে খুন করেছে। ২০০১ সালের পর থেকে পরিস্থিতি এই রকমই চলছে। এখন শান্তি আলোচনার মাধ্যমে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ফলে বিদেশি মদদপুষ্ট দেশীয় চক্রটি এখন ভীতির মধ্যে রয়েছে। যদি আগ্রাসী বাহিনী চলে যায়, তাহলে দেশীয় দালাল চক্রটি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে সক্ষম হবে না। দায়িত্ববোধ নিয়ে জনগণের মুখোমুখি হওয়ার সামর্থ্য নেই এসব দালালের। কারণ, তারা গত উনিশ বছরে বিদেশি আগ্রাসী বাহিনীর সাহায্য নিয়ে দেশের মানুষের সাথে নির্মম আচরণ করেছে।

আগ্রাসী শত্রুদের মদদপুষ্ট চক্রটি তাদের মিত্রদের বলে আসছে যে, ‘আমাদের সাহায্য করুন যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারছি। আর তখন এখানে আপনাদের স্বার্থ আরো সংরক্ষিত হবে।’ কিন্তু তারা কখনোই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ, আফগানিরাও বিদেশি আগ্রাসীদেরকে আপন মনে করে না, তেমনি আগ্রাসীরাও আফগানিদেরকে আপন মনে করে না।

আফগান সরকারের তিনটি বিষয় আন্তর্জার্তিক সম্প্রদায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো, নিরাপত্তা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও মাদক প্রতিহত করা।

কিন্তু, কাবুলে আগ্রাসীদের পুতুল সরকার নিরাপত্তা, দুর্নীতি ও মাদক নির্মূলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তা বিশ্বাস করেছে। ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন অজুহাতে কাবুল সরকারের জন্য বিদেশি সাহায্যের বন্যা বয়েছে। আমরা সবসময় তাদের মুখে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি শুনি। কিন্তু তাদের দুর্নীতির মাত্রা কমে তো নয়-ই , বরং দিনের পর দিন, বছরের পর বছর লজ্জাজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

আফগানিস্তান যখন তালেবানের অধীনে আসে তখন দেশে নানামুখী সমস্যা ছিল। গৃহযুদ্ধের বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা সত্ত্বেও মাদক উৎপাদন এবং পাচার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। দুর্নীতির নামগন্ধও ছিল না। তালেবানের অধীনে কাবুল শান্তি ও স্থিতিশীলতার আদর্শ অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। কাবুলের অধিবাসীদের জন্য তালেবান শাসন ছিল স্বর্ণযুগ। উত্তরাঞ্চলে তিনটি প্রদেশে গোলযোগ থাকা সত্ত্বেও কাবুল বরাবরই নিরাপদ ছিল। কিন্তু আজ সব ধরনের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কাবুল দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে।

বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও আফগান পুতুল সরকারের শাসনের ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মাদকের প্রসার বৃদ্ধি পেয়েছে, আর দুর্নীতিতে আফগানিস্তানের অবস্থান বিশ্বে কখনো দ্বিতীয় আবার কখনো-বা তৃতীয় হয়েছে। এটা অযৌক্তিক কোনো দাবি নয়। বরং এটি তাদেরই বন্ধু আমেরিকার তৈরি করা তথ্য। পত্রপত্রিকায় কাবুল সরকারের কর্মকর্তাদের চুরি কিংবা দুর্নীতি নিয়ে দৈনিক একটা রিপোর্ট থাকেই।

সম্প্রতি Special Inspector General for Afghanistan (SIGAR) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত উনিশ বছরে কাবুল সরকারের কর্মকর্তারা ১৯ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছে। এতে বরাবরই আফগানিস্তানের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। যেসব বিদেশিদের আফগানিস্তান ও কাবুল সরকার সম্পর্কে ধারণা নেই, তারা মনে করবে এই চুরির পেছনে সকল আফগানরাই জড়িত।

নিরাপত্তার বিষয়টি বললে, আশরাফ গনির ছয় বছরের শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর এক লাখ সদস্য নিহত হয়েছে। এসব হত্যার দায়ভার গনি সরকারের উপরই বর্তাবে, কারণ তারা সৈনিকদেরকে প্রতারিত করেছে এবং জোরপূর্বক সম্মুখ সারিতে পাঠিয়েছে। কাবুল সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর যারা প্রতারিত হয়েছে তারা শুধু আর্থিক বাধ্যবাধকতার জন্যই যুদ্ধে এসেছিল। অন্যথায় যুদ্ধের প্রতি তাদের কোনো নিষ্ঠা বা আগ্রহ ছিল না।

আফগানের কোনো গ্রামই এখন আর মাদকমুক্ত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মাদকবিরোধী ও আসক্তদের চিকিৎসার অজুহাতে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা সত্ত্বেও আনুমানিক ত্রিশ মিলিয়নেরও বেশি লোক মাদকে আসক্ত রয়েছে।

সংক্ষেপে বললে, এই হলো তথাকথিত আফগান রাষ্ট্র নির্মাণের নমুনা। এ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যই তারা লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। বর্তমান সরকারের সাথে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের তুলনা করেন এবং বিচার করেন কোন শাসনব্যবস্থা ভালো ছিল? এটি মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে।
দুনিয়ার সবাই এখন কাবুল সরকার ও তার সহযোগীদের দুর্নীতির ফিরিস্তি সম্পর্কে অবগত। তাদের দুর্নীতি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, এমন উঁচু স্তরের দুর্নীতিবাজ পূর্বে কেউ কখনো দেখেনি। এই উনিশ বছরে বারবার দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি দিলেও অতীতের তুলনায় তা কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। গনি সরকারের সময় চুরি ও দুর্নীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গনি প্রশাসনের প্রত্যেক মন্ত্রীই দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের সমস্ত সম্পদ তাদের নিজ নিজ পকেটে ভরেছে। এমন উদাহরণ অনেক।
গত হওয়া তথাকথিত নির্বাচন এবং করোনা ভাইরাসে সাহায্যের নামে ডাকাতি তাদের মুখোশ আরো একবার উন্মোচিত করেছে।

ইতোমধ্যে কাবুল শাসকগোষ্ঠীর দাঁত একটা আরেকটার সাথে আঁটকে গেছে। এখনও তারা দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। তারা অতীতে যেমন বারবার আন্তর্জাতিক দানশীলদের প্রতারিত করেছে এবং দরিদ্র জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তেমনি আবারো তা করার চেষ্টা করছে। তাদের এতসব সুস্পষ্ট চুরি ও প্রতারণা সত্ত্বেও, কেউ যদি এখনও তাদের বিশ্বাস করে এবং আফগানিস্তানের প্রতিনিধি মনে করে, তাহলে তা হবে চরম ভ্রান্তি।

চুরি-ডাকাতির এমন শাসনব্যবস্থা আমরা আমাদের ইতিহাসে কখনো দেখিনি; এমন দুর্নীতিবাজ শাসকদেরও নয়। এ ব্যক্তিরা আফগানিস্তানের নয়, তাদের এ দেশের জন্য কোনো ভালবাসা নেই। এমনকি তারা এ দেশকে নিজেরও মনে করে না। আমরা অনেককেই দেখেছি বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব পেয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের অনেকে সেসব দেশে চলেও গেছে।


[আফগানিস্তান ইসলামি ইমারতের অফিসিয়াল ইংরেজি ওয়েবসাইট থেকে এই আর্টিকেলটি অনুবাদ করা হয়েছে।]

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন