‘দ্য কেরালা স্টোরি’: মুসলিম গণহত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির নতুন ইস্যু

    উসামা মাহমুদ

    1
    525

    ইসলাম ও মুসলিমদের ব্যাপারে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিতে সিনেমাকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ভারতের বিজেপি, আরএসএস সহ অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলো। গত বছর ইতিহাস বিকৃত করে নির্মিত কাশ্মীর ফাইলস সিনেমার মাধ্যমে হিন্দুদের মাঝে লুকায়িত মুসলিম বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী দলগুলো, এমনকি স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই সিনেমার খুব ভূয়সী প্রশংসা করেছিল।

    সিনেমার মাধ্যমে মিথ্যা ও প্রোপাগান্ডা মূলক তথ্য ভারত জুড়ে প্রচার করার যে পরিকল্পনা আরএসএস নিয়েছে, তারই অংশ ছিল কাশ্মীর ফাইলস। তারই ধারাবাহিকতায় নির্মিত হয়েছে ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ সিনেমাটি। বাঙালি পরিচালক সুদীপ্ত সেনের এই ছবির ট্রেলার প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই চলছে বিতর্ক। অবশেষে ৫ মে ভারতে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি।

    এই সিনেমায় হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ ও লাভ জিহাদের মতো মনগড়া বিষয়বস্তুকে মানুষের মনে গেঁথে দেওয়ার প্রয়াস চালানো হয়েছে। সিনেমার গল্পে বলা হয়েছে, কেরালার এক হিন্দু কলেজ ছাত্রী শালিনী উন্নিকৃষ্ণাকে টার্গেট করে তারই এক মুসলিম সহপাঠিনী, যার যোগাযোগ আছে ‘মৌলবাদীদের’ সঙ্গে।

    তাদের পরিকল্পনায় ওই হিন্দু ছাত্রীর সাথে এক মুসলিম যুবকের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। পরবর্তিতে তাদের বিয়ে হয় এবং ওই ছাত্রীটিকে মৌলবাদে দীক্ষিত করা হয়। নাম বদলে ফাতিমা হয়ে যাওয়া শালিনীকে তারপর ইসলামিক স্টেটে পাচার করে দেওয়া হয়। শেষে ফাতিমা প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ে। জেরার মুখে সে জানায়, কেন ও কীভাবে সে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটে যোগ দিয়েছিল।

    সিনেমায় আরও বলা হয়েছে এভাবেই ৩২,০০০ হিন্দু নারী লাভ জিহাদের কারণে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে। পরে তাদেরকে আইএস (ইসলামিক স্টেট) এর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    ভারতের একজন আইনজীবী আলিম আলবুহারি বলেন, সুদীপ্ত সেন যেটাকে সত্য কাহিনী বলে বর্ণনা করছেন, তার কোনও ভিত্তিই নেই।

    কেরালা পুলিশের তৎকালীন ডিজি জ্যাকব পুন্নুশের দাবি, ৩২ হাজার হিন্দু মেয়েকে মুসলিম ছেলেরা বিয়ে করেছে বলে সিনেমায় যা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

    একটা মিথ্যা কথা শতবার বললে মানুষ সেটাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলোও ঠিক সেটাই করছে। মিথ্যা বানোয়াট কাহিনীকে সিনেমায় রূপ দিয়ে সাধারণ হিন্দুদের মনে অবচেতন ভাবেই মুসলিম বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

    আর এসব আয়োজন সবই করা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। ফলে পুরো ভারত জুড়েই মুসলিম বিদ্বেষ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সাধারণ হিন্দুদের মনেও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হচ্ছে।

    দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক চারু গুপ্তা জানিয়েছেন, যখন কোনো মুসলিম নারী হিন্দু কোনো পুরুষকে বিয়ে করে তখন হিন্দু এই গোষ্ঠীগুলো সেটাকে দেখায় স্বর্গীয় ভালবাসা হিসেবে। কিন্তু যখন তার উল্টোটা ঘটে, তখন সেটা হয়ে যায় প্রতারণা, জবরদস্তি, লাভ জিহাদ। । কথিত লাভ জিহাদের উপর গবেষনা করে তিনি ‘মিথ অব লাভ জিহাদ’ নামে একটি বই লিখেছেন।

    দেখা যাচ্ছে, এসব সিনেমাগুলো প্রোপাগান্ডামূলক হওয়ার কথা হিন্দুরাই স্বীকার করেছে। সুস্থ বিবেক বুদ্ধির যে কেউ এটা বুঝতে পারবে। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল সিপিআইএম বলছে ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ আসলে ধর্মান্তরকরণ, লাভ জিহাদ ইত্যাদি নিয়ে আরএসএস এর মিথ্যা প্রোপাগান্ডারই চিত্রায়ন। মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন এই ছবিকে প্রোপাগান্ডামূলক ছবি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে।

    এদিকে হিন্দুত্ববাদী আরএসএস ও বিজেপি’র সদস্যরা ব্যাপকভাবে এই সিনেমার প্রচার-প্রসার-প্রশংসা করছে। ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ এর মত এই সিনেমারও পক্ষ নিয়েছে স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এ ছবির পক্ষে সাফাই গেয়ে বক্তব্যও দিয়েছে মোদি। মূলত এসব ছবির মাধ্যমে ভারতে মুসলিমদের ভিটে মাটিতে আগুন লাগাতে চাইছে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি সরকার।

    মুসলিম গণহত্যার পথ সহজ করতেই একের পর এক মুসলিম বিদ্বেষী ইস্যু তৈরী করছে হিন্দুত্ববাদীরা। সাধারণ হিন্দুদের মনেও ক্রমাগত মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। আর এই প্রোপাগান্ডমূলক সিনেমাগুলো সেই পালে জোর হাওয়া দিচ্ছে।



    তথ্যসূত্র :

    1. ‘The Kerala Story’ exposed terror ploys in state, says Narendra Modi at Karnataka rally (Scroll)
    https://tinyurl.com/yfp5jd39
    2. ‘The Kerala Story’ review: All about Islamophobia (Scroll)
    https://tinyurl.com/bd2hhxpd
    3. ভারতে হাজার হাজার নারী ‘ইসলামিক স্টেটে যোগদানের’ গল্প নিয়ে সিনেমা, বিতর্ক তুঙ্গে
    https://tinyurl.com/2m5mxcj3
    4. the-kerala-story-is-a-made-up-story-says-former-police-chief/
    https://tinyurl.com/54e7yzjm

    ১টি মন্তব্য

    মন্তব্য করুন

    দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
    দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

    পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশে ফিরতে শুরু করেছেন আফগান শরণার্থীরা
    পরবর্তী নিবন্ধমুজাফফরনগর সহিংসতা ও গণধর্ষণ: ন্যায় বিচার মিলবে কি?