ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও গাজায় ২৫০ দম্পতির গণবিবাহ, যুদ্ধের অন্ধকারে নতুন জীবনের স্বপ্ন

0
0
GAZA, PALESTINE - JUNE 28: Newlyweds celebrate as 150 Palestinian couples tie the knot in a mass wedding ceremony organized by a charity organization at the Jabalia Refugee Camp in the northern Gaza Strip, Gaza, Palestine on June 28, 2026. The young couples advanced towards the wedding hall accompanied by traditional songs and dances. (Photo by Ahmed Jihad Ibrahim Al-arini/Anadolu via Getty Images)

দখলদার ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ ও কঠিন মানবিক পরিস্থিতির মধ্যেও জীবন ও নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। যুদ্ধের ক্ষত, স্বজন হারানোর বেদনা এবং বাস্তুচ্যুতির দুর্ভোগ পেছনে ফেলে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ২৫০ ফিলিস্তিনি দম্পতি।

এ গণবিবাহে ২৫০ জন বর ও ২৫০ জন কনে অংশ নেন। ৬ নভেম্বর, শুক্রবার গাজা সিটির উপকূলীয় এলাকায় এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

‘থাউব আল-ফারাহ ৩’ (আনন্দের পোশাক) নামের এ গণবিবাহের আয়োজন করে ‘আল-ফারিস আল-শাহম ৩’ নামক এক সহায়তা কমিটি। এতে সহযোগিতা করে সাকর বিন মুহাম্মদ আল কাসিমি দাতব্য ও মানবিক ফাউন্ডেশন। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যেসব ফিলিস্তিনি তরুণ-তরুণীর পক্ষে বিয়ের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাঁদের নতুন পরিবার গঠনে সহায়তা করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
গাজা সিটির উপকূলীয় সি ক্লাব এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে কয়েক ডজন গাড়ি ফুল, লাল ফিতা ও ফিলিস্তিনের পতাকায় সাজানো হয়।

গাড়িবহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর পাশ দিয়ে উপকূলীয় সড়ক ধরে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায়। বররা আনুষ্ঠানিক পোশাক এবং কনেরা ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী নকশায় সাজানো সাদা বিয়ের পোশাক পরেন। তাঁদের মাথায় ছিল সোনালি অলংকার, হাতে ফুলের তোড়া। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয় বিয়ের আয়োজন।

তবে এই আনন্দের আড়ালেও ছিল যুদ্ধের গভীর ক্ষত। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বর সাঈদ আল-নাজ্জার উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরের বাসিন্দা। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে তাঁদের পরিবারের বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে তাঁকে ইয়েলো লাইনের কাছে একটি তাঁবুতে বসবাস করতে হচ্ছে। আয়োজকদের লটারিতে নির্বাচিত হয়ে তিনি গণবিবাহে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সাঈদ আল-নাজ্জার আনাদোলু নিউজ এজেন্সিকে বলেন, ‘এই আনন্দ শুধু একজন বর বা ২৫০ জন বরের নয়; এটি পুরো গাজার মানুষের আনন্দ।’ তিনি জানান, ইসরায়েলি হামলায় বহু ফিলিস্তিনি তাঁদের বাড়িঘর হারিয়ে তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের মতো তাঁর পরিবারেরও এখন আশ্রয়ের জন্য কোনো বিকল্প নেই।

অন্য বর মুনির আল-তাতারি যুদ্ধের মধ্যে তার মা ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে হারিয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় তাদের বাড়িটিও ধ্বংস হয়েছে। জীবনের বিশেষ এই দিনে মাকে পাশে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর। তিনি বলেন, ‘গাজায় অবরোধ ও যুদ্ধের মধ্যেও আমরা আনন্দ করব এবং আমাদের হৃদয়ে আবার আশা ফিরিয়ে আনব।’ যুদ্ধের আগে তাদের একটি বাড়ি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি তিনি তার মাকেও হারিয়েছেন।

আরেক বর মুহাম্মদ কুয়াইদির জন্য বিয়ের পর নতুন জীবন শুরু করাও বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েলি হামলায় বাড়ি হারানোর পর নতুন করে বাড়ি ভাড়া নেওয়া কিংবা কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। ফলে স্ত্রীকে নিয়ে তাঁবুতেই সংসার শুরু করতে হবে তাকে। গাজায় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের জন্য বিয়ে করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।

বিয়ের পর কোথায় থাকবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁবুতে থাকব।’ তবে এই আয়োজন তাকেসহ আরও ২৪৯ জন বরকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নতুন জীবন শুরুর সুযোগ করে দিয়েছে।

আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ‘থাউব আল-ফারাহ ৩’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে মোট ১১ হাজার ৬২২ জন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণকারী ১ হাজার ৩৩৫ জনকে চূড়ান্ত লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখান থেকে নির্বাচিত হন ২৫০ জন বর। পরে তাঁদের সঙ্গে ২৫০ জন কনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

আল-ফারিস আল-শাহম ৩ অভিযান সহায়তা কমিটির প্রধান মুহাম্মদ ইরবি আনাদোলুকে বলেন, ৫০০ বর-কনের এই গণবিবাহ দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও দুর্ভোগের মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার প্রত্যয় ও জীবনমুখী মানসিকতার এক মানবিক প্রতিচ্ছবি। এ উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের নতুন পরিবার গঠনে সহায়তা এবং তাদের মধ্যে আশার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপ, স্বজন হারানোর বেদনা ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও গাজার তরুণ-তরুণীদের এই নতুন জীবন শুরুর প্রত্যয় ফিলিস্তিনি সমাজের দৃঢ় মনোবল ও ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদের প্রতিফলন। মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে এসব নবদম্পতিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পরিবারগুলো আবারও নিরাপদ আশ্রয়, স্বাভাবিক জীবন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


তথ্যসূত্র :

1. Palestinian couples tie the knot in mass wedding in Gaza

– https://tinyurl.com/5yfdt6m4

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধচুয়াডাঙ্গা সীমান্তে গুলি করে আহত বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গেল সন্ত্রাসী বিএসএফ