
প্রায় ৩ বছর ধরে চলা দখলদার ইসরায়েলি অবরোধ, বিমান হামলা এবং গণহত্যামূলক আগ্রাসনের মাধ্যমে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে সন্ত্রাসী ইসরায়েল। অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তা কেবল বোমাবর্ষণের গতি কিছুটা কমিয়েছে; কিন্তু মৃত্যুর কারণগুলোকে থামাতে পারেনি। বরং, যুদ্ধের সময়ের তুলনায় এখন দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওষুধের সংকট আরও গভীর হয়েছে— যা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিরতি নয়, বরং নীরব হত্যাযজ্ঞের নতুন অধ্যায়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাহের আল-ওয়াহিদি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, “ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। হাসপাতাল ধ্বংস, ডাক্তারদের আটক এবং ওষুধ আটকে রাখা—এগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত নীতি, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে জীবনধারণের অযোগ্য করে তোলা।”
ওষুধের অভাবে মৃত্যুপুরী গাজা
যুদ্ধ শুরুর আগে গাজায় কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪৪ জন। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬২২-এ। সরাসরি ইসরায়েলি হামলায় যেখানে ৩০ জন শহীদ হয়েছেন, সেখানে বাকি শত শত রোগী ডায়ালাইসিস সেবার অভাবে নীরবে প্রাণ হারিয়েছেন—কারণ হাসপাতালগুলোতে ডায়ালাইসিস মেশিন চালানোর বিদ্যুৎ নেই, নেই প্রয়োজনীয় ফিল্টার বা জীবাণুনাশক।
শুধু কিডনি রোগী নয়, গাজার ৩ লাখ ৫০ হাজার ক্রনিক রোগী (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) এখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। আল-ওয়াহিদি জানান, “যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ওষুধের সংকট ৫২ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধের সময় যা ছিল না, তা এখন হচ্ছে— রোগীরা নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না, যা তাদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
হাসপাতাল ধ্বংস, চিকিৎসক নিপীড়িত
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য বলছে, ইসরায়েলি হামলায় ২২টি হাসপাতাল সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে গেছে এবং ২১১টি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তর গাজার কোনো হাসপাতালই এখন আর সচল নয়। দক্ষিণের আল-শিফা বা আল-আহলি হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের এখন খালি পায়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
গাজায় স্বেচ্ছাসেবক ট্রমা সার্জন মোহাম্মদ তাহির বর্তমান পরিস্থিতিকে দুর্বিষহ আখ্যা দিয়ে বলেন, “গাজার হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসক, নার্সরা হয় নিহত, না হয় আটক কিংবা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আইসিইউয়ের যন্ত্রপাতি, ডায়াগনস্টিক ডিভাইস, এমনকি সাধারণ ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক পর্যন্ত এখন প্রায় অস্তিত্বহীন।”
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসই জাতিগত নিধনের অংশ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়; এটি একটি জাতির অস্তিত্বের প্রাণ। ইসরায়েল সেটাই ধ্বংস করতে চেয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইয়ারা আসি বলেন, “ইসরায়েলি সেনাদের হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ করে যে এটি সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত। এটি ফিলিস্তিনিদের জীবনধারণের অযোগ্য করে তোলার একটি হাতিয়ার। যখন কোনো এলাকার শেষ হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যায়, মানুষ নিজেই নিজের এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়—এটাই বাস্তুচ্যুতির অস্ত্র।”
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লাইথ মালহিস এ প্রক্রিয়াকে ডি-হেলথিফিকেশন (স্বাস্থ্যবিমুখীকরণ) বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ইসরায়েল ডাক্তার ও নার্সদের যোদ্ধা হিসেবে দেখে, কারণ তারা বোঝে যে ফিলিস্তিনিদের জীবন ধরে রাখার খুঁটি যদি ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলেই তাদের প্রতিরোধ ও মাটি হারানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার বর্তমান সংকট শুধু ওষুধ বা হাসপাতালের সংকট নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংসের চিত্র। হাসপাতাল ধ্বংস, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা, চিকিৎসাকর্মীদের সংকট এবং লাখো রোগীর চিকিৎসাবঞ্চিত অবস্থার কারণে গাজা আজ নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার সক্ষমতাকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
1. How Israel destroyed Gaza’s health system ‘deliberately and methodically’
– https://tinyurl.com/2w46s7ee


