ফিলিস্তিন একদিন মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ

0
4

বছরের ৩৬৫ দিনই ইতিহাসের কোনো না কোনো ঘটনার জন্য স্মরণীয়। কিছু ঘটনা সারা দুনিয়ার জন্য স্মরণীয়, কিছু ঘটনা হয়ত কোনো ব্যক্তি বা সমাজের জন্য। আজকের দিনটি এমন এক দিন যা এই শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বকেই দুই বার চমকে দিয়েছে।

২৫ বছর আগে আজকের দিনে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এক আগ্রাসনের সূচনা হয়। তৎকালীন বৈশ্বিক একক পরাশক্তি আমেরিকার আফগানিস্তানে আক্রমণ ঠিক ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাথে যোগ দেয় ন্যাটোসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ টির মত দেশ। উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া ৯/১১ হামলার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আল কায়দা ও এর আমির শাইখ উসামা বিন লাদেনকে (রহিমাহুল্লাহ) হাতের মুঠোয় আনা, তাঁদেরকে আশ্রয় দেয়া তালেবান সরকারকে ধ্বংস করা এবং আফগানিস্তানকে নিজেদের মনমত ঘৃণ্য পশ্চিমা সংস্কৃতিতে পরিবর্তন করা।

এই আগ্রাসনকে বিপরীত আরেকটি উপমা দ্বারা আমরা সম্বোধন করতে পারি। সেটি হচ্ছে এই দিনটি ছিল আমেরিকা শাসিত একক বিশ্বব্যবস্থার পতনের সূচনা।
কে জানত এই দিনটি থেকে পতনোন্মুখ আমেরিকা এক ২০ বছরের চোরাবালিতে আটকে হাঁসফাঁস করতে থাকবে?
কে জানত ২৫ বছর আগে আজকের দিনটিতে বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ যন্ত্র আমেরিকা এমন এক পরিণতির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়বে, ঠিক যেভাবে পতঙ্গ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহুতি দেয়?
কে জানত আমেরিকা নিজের “ঐশ্বরিক দম্ভের” পরিণতি ভোগ করা শুরু করবে এই দিনটি থেকে?
আমেরিকা কি জানত এই যুদ্ধ তাকে এমন এক দিন দেখাবে যেদিন তার ডাকে একটা “দালাল” রাষ্ট্রও সাড়া দিবে না? মিত্র তো পরের কথা। যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক ইরান- আমেরিকা যুদ্ধের সময় দেখছি।

অন্যদিকে মুজাহিদদের কথা চিন্তা করি আমরা। এই এত সবকিছু কেন হয়েছিল?
কেন ৯/১১?
কেন স্বেচ্ছায় নিজেদের ইমারাহকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়া?
কেন নিজেদের পুরো জীবন, পরিবার আর দুনিয়ার সবকিছু কুরবানি করে দেয়া?
কেন এমন অসম এক যুদ্ধে নিজেদেরকে আল্লাহ তা’আলার অসীম কুদরতের হাতে ছেড়ে দেয়া?

আমরা জানি অন্য সব উদ্দেশ্যের সাথে মুজাহিদদের বড় এক উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা, ফিলিস্তিনের উপর হওয়া প্রতিটি অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়া। এই আমেরিকাই তো ফিলিস্তিনের উপর প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ নির্যাতন চালানো অবৈধ রাষ্ট্র ইজরাইলকে সব ধরনের সাহায্য ও সমর্থন দিয়ে আসছে। এই আমেরিকাই তো নিজের প্রতিটি প্রেসিডেন্টকে ইজরাইলের পায়ে সঁপে দিয়ে ক্ষমতায় আনে। এই আমেরিকাই তো ইজরাইলের নামে আসা সব অভিযোগকে ভেটো দিয়ে দুনিয়ার চোখে টিনের চশমা পরিয়ে রাখে।

আমেরিকা ২০০১ এর ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে তার শুরু করা যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট অবৈধ রাষ্ট্র ইজরাইল ঠিক একই পরিণতির দিকে অগ্রসর হওয়ার দিনটিও অদ্ভুতভাবে আজকেই – ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর! ফিলিস্তিনের গাযায় হামাসের নেতৃত্বে মুজাহিদ সিংহ শাবকেরা এমন এক পদক্ষেপ নেয় যা দুনিয়ার ইতিহাস কখনো ভুলবে না ইনশাআল্লাহ।

গাযা! এক অবরুদ্ধ নগরী!
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কোনো নগরী কি ছিল যার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য নিজেরই শত্রুর উপর নির্ভর করে থাকতে হয়? পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সবকিছুর জন্য গাযাকে তাকিয়ে থাকতে হয় অবৈধ রাষ্ট্র ইজরাইলের দিকে। গাযায় জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশুর তথ্য জমা থাকে জায়োনিষ্টদের হাতে। গাযায় ঢোকা বা বের হওয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ ইজরাইলের হাতে। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির নতুন কিছু আবিষ্কার হয়েছে আর তা গাযায় নেই, এমন কোনো প্রযুক্তি সম্ভবত বাকি নেই।

অসংখ্য পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, বেকার, ইয়াতীম আর স্বপ্নবিহীন মানুষের নগরী গাযা। “অসংখ্য” শব্দটি ভুল বলেছি, সংখ্যাটা আসলে অজানা নয়, অন্তত ইজরাইলের কাছে। গাযাবাসীকে সে রেখেছে সার্বক্ষণিক নজরদারির অধীনে। আর “স্বপ্নহীন” শব্দটিও ভুল হয়েছে। গাযার মানুষের চেয়ে স্বপ্নচারী মানুষ এই দুনিয়াতে আর কে আছে? এমন অসম্ভব অবরুদ্ধ এক নগরে থেকে নিজেদেরকে স্বাধীন হতে দেখা, নিজেদেরকে আল্লাহ তা’আলার স্বাধীন বান্দা হিসেবে বাঁচতে দেখার চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কি হতে পারে?

এমন এক নগরীতে বসে বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত, সবচেয়ে প্রযুক্তির দিক থেকে অগ্রগামী অবৈধ রাষ্ট্র ইজরাইলে হামলার ছক কষতেও যে অন্য রকম সাহস ও মনোবল লাগে। মুজাহিদ সিংহ শাবকেরা শুধু ছক কষেই ক্ষান্ত থাকে নি, আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছায় আজকের দিনে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। ইজরাইলের সমস্ত নজরদারি, সমস্ত প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিয়ে “তুফানুল আকসা” নামক অসাধারণ ও অভূতপূর্ব এক আক্রমণের সূচনা করে হামাসের কাসসাম ব্রিগেড, ইসলামী জিহাদসহ আরো কিছু জিহাদী সংগঠন। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর যোদ্ধারা নিশ্চিতভাবেই এই হামলা ও পরবর্তী ২ বছর ধরে চলা অসম যুদ্ধের কৌশল নিয়ে ব্যাপকভাবে পড়াশুনা করতে বাধ্য হবে।

তুফানুল আকসা ফিলিস্তিনকে বা অন্তত গাযাকেও স্বাধীনতা এনে দিতে পারে নি। পারে নি গাযার মানুষকে মুক্ত করতে। বরং এরপর পুরো দুনিয়া সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে ও করছে জায়োনিষ্টদের গণহত্যা। কিন্তু তুফানুল আকসা সফলভাবে আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে মুনাফিকদের নিফাক, সক্ষমদের কুমিরের কান্না আর কোটি কোটি মুসলিমের ঈমানী ও দায়বদ্ধতার দুর্বলতা। তুফানুল আকসা আমাদেরকে ভুলে যাওয়া ফিলিস্তিন নামক অন্তরের ক্ষতকে নতুন করে রক্ত প্রবাহ দিয়ে সিঞ্চিত করেছে, মুসলিম উম্মাহকে করেছে ঐক্যবদ্ধ। দুনিয়ার স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের সামনে তুফানুল আকসা এই দুনিয়ার মেকি মানবতার বুলি আর ক্রুসেডার- জায়োনিস্টদের ফাঁদ স্পষ্ট করে দিয়েছে।

একটি তারিখ- দুটি ইতিহাস, একটি জাতির মুক্তির লড়াইয়ে শামিল ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর হাজার হাজার মুজাহিদ। একটি জাতির জন্য, একটি ভূমির জন্য জান দিতে প্রস্তুত লাখ লাখ ইসলামপ্রিয় জনগণ! ইতিহাস ৯/১১ তে শুরু হয় নি, শুরু হয় নি ৭ অক্টোবরেও। কিন্তু ইনশাআল্লাহ উম্মাহর জাগরণের তারিখগুলো আমাদের সামনে বারবার আসবে আর বারবার উদ্বুদ্ধ করবে নতুন আরেকটি তারিখ তৈরি করার জন্য। এটাই ৭ অক্টোবরের সার্থকতা।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধউত্তর প্রদেশে ‘ধর্ম জাগরণ যাত্রা’ মিছিলে মুসলিমবিদ্বেষী উসকানিমূলক স্লোগান