
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে সহিংসতা নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় ইথিওপীয় সরকার সোমালিয়ায় মোতায়েন করা ৩,০০০-এরও বেশি সৈন্য প্রত্যাহার করে দেশটির টাইগ্রে, আমহারা এবং আফার অঞ্চলে পুনরায় মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে।
দেশটির উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ায় সোমালিয়ায় মোতায়েন করা ইথিওপীয় সৈন্যদের একটি অংশকে প্রত্যাহারের মাধ্যমে দেশের ভেতরে মোতায়েন করার প্রস্তুতি চলছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাতে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে যে, আগামী দিন বা সপ্তাহগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিম সোমালিয়ার ‘বে’ এবং ‘বাকুল’ রাজ্য থেকে ৩,০০০ এরও বেশি ইথিওপীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হতে পারে। এই সৈন্যদেরকে দেশটির টাইগ্রে, আমহারা এবং আফার অঞ্চলে পাঠানোর কথা রয়েছে, যেখানে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ইথিওপীয় সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানের জবাবে সরকারের একজন মুখপাত্র অভ্যন্তরীণ সংঘাত বা সোমালিয়া থেকে সম্ভাব্য সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
টাইগ্রেতে পুনরায় লড়াই শুরু
সৈন্যদের এই স্থানান্তরের পটভূমি হলো ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলে সম্প্রতি পুনরায় শুরু হওয়া তীব্র লড়াই।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সরকারি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের সময় ‘টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ (টিপিএলএফ)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো কয়েকটি শহর ও বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। জানা গেছে, এই লড়াই টাইগ্রের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী আফার ও আমহারা অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এমন এক সময়ে এই সংঘর্ষগুলো ঘটছে যখন ‘প্রিটোরিয়া চুক্তি’-র মাধ্যমে স্থাপিত ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা আবারও বিঘ্নিত হচ্ছে; উল্লেখ্য, এই চুক্তির মাধ্যমেই ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটানো টাইগ্রে যুদ্ধের অবসান হয়েছিল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে টিপিএলএফ-এর রাজনৈতিক মর্যাদা, নিরস্ত্রীকরণ এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাছাড়া, বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, আমহারা অঞ্চলের ‘ফানো’ মিলিশিয়া এবং ওরোমিয়া অঞ্চলের ‘ওরোমো লিবারেশন আর্মি’ সহ সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে একটি জোট গঠন করেছে।
সোমালিয়ায় নিরাপত্তা-শূন্যতা নিয়ে উদ্বেগ
ইথিওপিয়ার সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি দক্ষিণ সোমালিয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা-শূন্যতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
দখলদার ইথিয়পীয় বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে মোগাদিশু বাহিনীকে সহায়তা দিয়ে আসছে, বিশেষ করে প্রতিরোধ বাহিনী আশ-শাবাবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আগ্রাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ক্রুসেডার আফ্রিকান ইউনিয়নও সোমালিয়ায় মোগাদিশু প্রশাসনকে রক্ষায় ইথিওপিয়ার সামরিক অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে।
সোমালিয়ায় ইথিওপিয়ার উপস্থিতি কেবল আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘আউসম’ (AUSSOM)-এর অধীনে নিয়োজিত সৈন্যদের পাশাপাশি, সোমালি সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় দেশটি সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ফলে, পরিকল্পিত এই প্রত্যাহারের ফলে ঠিক কোন কোন সৈন্যদল বা মোতায়েন ব্যবস্থা প্রভাবিত হবে, তা এখনও অস্পষ্ট।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো উল্লেখ করছে যে, এই সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে সোমালিয়ার ‘বে’ ও ‘বাকুল’ অঞ্চলে মোগাদিশু বাহিনীর সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, ইথিওপিয়ার এই পরিকল্পনার আওতায় ‘আউসম’-এর অধীনে মোতায়েনকৃত সৈন্যরাও অন্তর্ভুক্ত কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এর আগেও ইথিওপিয়া একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল।
২০২০ সালে শুরু হওয়া টাইগ্রের যুদ্ধের সময়, অভ্যন্তরীণ অভিযানে ব্যবহারের লক্ষ্যে আদ্দিস আবাবা সোমালিয়া থেকে তাদের হাজার হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করেছিল। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, বর্তমান পরিকল্পনার লক্ষ্যও একইভাবে বিদেশের মাটিতে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে মনোযোগ দেওয়া।
সোমালিয়া থেকে ইথিওপিয়ার সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি আশ-শাবাবের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ঘটছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন এর আগে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সোমালিয়ায় নিরাপত্তা-শূন্যতা রোধে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ইথিওপিয়া ও উগান্ডার মোতায়েনকৃত বাহিনীর গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদ্দিস আবাবার সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে; একইসাথে দক্ষিণ সোমালিয়ায় মোগাদিশু বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সক্ষমতাও পরিবর্তিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
– https://t.co/iG77Kzy3hN


