রাজস্ব আয়ে বিশাল ঘাটতি, সাড়ে আট মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৯৮ হাজার কোটি টাকা

0
11

রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকখাত থেকে নেওয়া সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের বরাতে দৈনিক আমার দেশ জানায়, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি বাজেটের মাধ্যমে সরকারের ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় ব্যাংকখাত থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চাহিদা পূরণ করছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। প্রতি বছরের মতোই শুল্ক-কর আদায়ের ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না এনবিআর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাস ১৯ দিনে সরকার ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছে, তা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫৫ শতাংশ বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ছয় হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে এ খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র ছাড়া এ সময় সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট এক লাখ পাঁচ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী সাংবাদিকদের জানান, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে রাজস্ব আদায় সে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে এবং আগামী দিনে তা পূরণের সম্ভাবনাও কম।

তিনি আরও জানান, রাজস্ব আয়ের বাইরে বাজেটের ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকেও ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে, যদিও অর্থবছর শেষ হতে এখনো তিন মাসের বেশি বাকি। এতে স্পষ্ট, ঋণ গ্রহণ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মোস্তফা কে মুজেরী জানান, বর্তমানে সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, কিন্তু এ ধারা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। কারণ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়লে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া—এসবের প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।

তিনি বলেন, এ অবস্থায় ভর্তুকি দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে এর পরিমাণ আরও বাড়বে, যা বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই একসময় সরকারকে মূল্য সমন্বয় (অ্যাডজাস্টমেন্ট) করতেই হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সঠিক নীতিমালা গ্রহণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কমানো যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছর শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি ছিল চার লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৬২১ কোটি টাকায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম আট মাস ১৯ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৮১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৮৮ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। ফলে এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছিল।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকখাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৯ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৯৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে নিট ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যা গত চার অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ওই অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা কম ছিল।


তথ্যসূত্র:
১। সাড়ে আট মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৯৮ হাজার কোটি টাকা
– https://tinyurl.com/dwxdn3vd

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধভারতের সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ইস্যুতে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ায় ইলিয়াস আলীকে গুম করে র‍্যাব: মামুন খালেদ
পরবর্তী নিবন্ধআল ফিরদাউস বুলেটিন || ১ম সপ্তাহ, এপ্রিল ২০২৬ ||