বৃষ্টিপাত কমলেও চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, পানিবন্দি মানুষের মানবেতর জীবনযাপন

0
14

চট্টগ্রামে বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাতে প্লাবিত রয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, রাউজান, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, হাটহাজারি, আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়াসহ ১১ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা।

দৈনিক আমার দেশ জানায়, জেলা প্রশাসনের হিসাবে সাত লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি থাকলেও বাস্তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। এক সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ। এই সাতদিনে শুধু চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ও বন্যার পানিতে ভেসে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার (১১ জুলাই) বিকাল তিনটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৭ দশমিক ১ মিলিমিটার (মিমি) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। বৃষ্টির তীব্রতা কমে এলেও পানি বাড়ছে প্লাবিত এলাকাগুলোতে। কারণ ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড় থেকে ঢল নামতে শুরু করেছে। বর্তমানে শুধু ভারতীয় ঢলের কারণেই বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

শুকনো খাবার, সুপেয় পানির অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে এসব এলাকার পানিবন্দি মানুষ। দুর্গম এলাকাগুলোতে আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধার এবং ত্রাণ বিতরণে সাত উপজেলায় কাজ করছে সেনাবাহিনীর একাধিক টিম, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে বন্যাকবলিত এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সিস্টেমও ভেঙে পড়েছে। এতে দুর্গম এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ বিতরণ টিমও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না।

জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়ার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। উপজেলার ১৭ ইউনিয়নের সবকটিই প্লাবিত রয়েছে। সাতকানিয়া পৌরসভাসহ কোনো ইউনিয়নের পুরোটা আবার কোনোটি আংশিক পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। সাতকানিয়া অংশে সাঙ্গু নদীর পানি গতকাল শনিবারও বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এ ছাড়া লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে।

এদিকে বাঁশখালীর উপকূলীয় অন্তত আটটি ইউনিয়নের মানুষ এখনো পানিবন্দি। বিশেষ করে ছনুয়া, বরগুনা, গন্ডামারা, সরল, পুঁইছড়ি, শেখেরখিল, বৈলছড়ি, বাহারছড়া, কাথরিয়া ও আলীপুর ইউনিয়নে মানুষ চরম দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছেন। এলাকাগুলো নিচু হওয়ায় সেখানে গত পাঁচ দিনেও বন্যার পানি কমেনি। ভারতের ঢলের পানিতে বন্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। এরই মধ্যে ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রের সবকটি মানুষে ভরে গেছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও শুকনা খাবার ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে।

পুঁইছড়ির কামাল হোসেন জানান, এর আগে কখনো এমন বন্যা দেখেননি তারা। এবার ভারতের ঢলের পানি আসায় পুরো উপজেলা ভেসে গেছে। ফসল, গবাদিপশু, মাছের ঘের ও লবণের ঘের সবই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বন্যার পানি। খাবার, পানির কষ্টে কয়েকদিন ধরে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কায়কোবাদ নামে বৈলছড়ির আরেক বাসিন্দা সাংবাদিকদের জানান, তার চোখের সামনেই একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতঘরটি ভেসে গেছে। এখন তিনি পরিবারসহ আরেকজনের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়াও ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী উপজেলায়ও এখন পানিবন্দি রয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।

গত এক সপ্তাহের অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় ১১ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিনজন এবং সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও সাতকানিয়ায় একজন করে মারা গেছেন।

বন্যায় জেলার ১৭৬ ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার সাত লাখ ৫৯ হাজার মানুষ এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি আছে। বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড় ধসে মহানগর ও জেলায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এবারের বন্যায় আউশ চাষ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ৯০৪৩ হেক্টর জমির আউশ, ৯৬০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ৫৯০৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে।

এবারের বন্যায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, মহানগরীসহ জেলার ১৬ উপজেলায় এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


তথ্যসূত্র:
১। ভারতীয় ঢলে ডুবে গেছে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা
– https://tinyurl.com/4u7ym6ru

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশে বন্যা ও ভূমিধ্বসে মৃত্যুর ঘটনায় ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের শোক প্রকাশ
পরবর্তী নিবন্ধগুজরাটে বন্যা দুর্গতদের পাশে অগ্রগণ্য ভূমিকায় মুসলিম সমাজ, আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো