ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা : হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)

0
605
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা : হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)

فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِنَّ الشَّيْطَانَ لَيَخَافُ مِنْكَ يَا عُمَرُ

* রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে উমর! নিশ্চয়ই শয়তান তোমাকে ভয় পায়। [তিরমিজি : ৩৬৯০]


হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:)। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং প্রধান সাহাবীদের অন্যতম। আবু বকর (রাঃ) এর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফত ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়। এ সময়ে তাওহীদের অভিযান যেভাবে এবং যে গতিতে কুফরী শাসন ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

নাম ‘উমার, লকব ফারুক এবং কুনিয়াত আবু হাফস। পিতা খাত্তাব ও মাতা হান্তামা। কুরাইশ বংশের আ’দী গোত্রের লোক। পিতা খাত্তাব কুরাইশ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মাতা ‘হানতামা’ কুরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি হিশাম ইবন মুগীরার কন্যা। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এই মুগীরার পৌত্র।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) জন্মের তের বছর পর তাঁর জন্ম। মৃত্যুকালেও তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বয়সের সমান ৬৩ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও ইসলাম গ্রহণের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

গায়ের রং উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, টাক মাথা, গন্ডদেশ মাংসহীন, ঘন দাড়ি, মোঁচের দু’পাশ লম্বা ও পুরু এবং শরীর দীর্ঘাকৃতির। হাজার মানুষের মধ্যেও তাঁকেই সবার থেকে লম্বা দেখা যেত। তাঁর জন্ম ও বাল্য সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না।

তাঁর যৌবনের অবস্থাও প্রায় অনেকটা অজ্ঞাত। কে জানতো যে এই সাধারণ একরোখা ধরনের যুবকটি একদিন ‘ফারুকে আযমে’ পরিণত হবেন। কৈশোরে ‘উমারের পিতা তাঁকে উটের রাখালী কাজে লাগিয়ে দেন। তিনি মক্কার নিকটবর্তী ‘দাজনান’ নামক স্থানে উট চরাতেন। তিনি তাঁর খিলাফতকালে একবার এই মাঠ অতিক্রমকালে সঙ্গীদের কাছে বাল্যের স্মৃতিচারণ করেছিলেন এভাবে: ‘এমন এক সময় ছিল যখন আমি পশমী জামা পরে এই মাঠে প্রখর রোদে খাত্তাবের উট চরাতাম। খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নীরস ব্যক্তি। ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিলে পিতার হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত হতাম। কিন্তু আজ আমার এমন দিন এসেছে যে, এক আল্লাহ ছাড়া আমার ওপর কর্তৃত্ব করার আর কেউ নেই।'(তাবাকাত : ৩/২৬৬-৬৭)

যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য-শিক্ষণীয় বিষয়গুলি যথা : যুদ্ধবিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা ও বংশ তালিকা শিক্ষা প্রভৃতি আয়ত্ত করেন। বংশ তালিকা বা নসবনামা বিদ্যা তিনি লাভ করেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়ে ছিলেন এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। আরবের ‘উকায’ মেলায় তিনি কুস্তি লড়তেন।

আল্লামা যুবইয়ানী বলেছেন : ‘উমার ছিলেন এক মস্তবড় পাহলোয়ান।’ তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের এক বিখ্যাত ঘোড় সওয়ার। আল্লামা জাহিয বলেছেন : ‘উমার ঘোড়ায় চড়লে মনে হত, ঘোড়ার চামড়ার সাথে তাঁর শরীর মিশে গেছে।’ (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন)

তাঁর মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল । তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মুখস্থ ছিল। আরবী কাব্য সমালোচনার বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতপক্ষে তিনিই। ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মতামতগুলি পাঠ করলে- এ বিষয়ে তাঁর যে কতখানি দখল ছিল তা উপলব্ধি করা যায়। বাগ্মিতা ছিল তাঁর সহজাত গুণ। যৌবনে তিনি কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। বালাজুরী লিখেছেন : ‘রাসূলে কারীমের (সাঃ) নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় গোটা কুরাইশ বংশে মাত্র সতের জন লেখা-পড়া জানতেন। তাদের মধ্যে ‘উমার একজন।

ব্যবসা বাণিজ্য ছিল জাহিলী যুগের আরব জাতির সম্মানজনক পেশা। ‘উমারও ব্যবসা শুরু করেন এবং তাতে যথেষ্ট উন্নতিও করেন। ব্যবসা উপলক্ষে অনেক দূরদেশে গমন এবং বহু জ্ঞানী-গুণী সমাজের সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন। মাসউদী বলেন : “উমার (রা) জাহিলী যুগে সিরিয়া ও ইরাকে ব্যবসা উপলক্ষে ভ্রমণে যেতেন। ফলে আরব ও আজমের অনেক রাজা-বাদশার সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন।’

শিবলী নু’মানী বলেন : ‘জাহিলী যুগেই ‘উমারের সুনাম সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে কুরাইশরা সর্বদা তাঁকেই দৌত্যগিরিতে নিয়োগ করতো। অন্যান্য গোত্রের সাথে কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে নিষ্পত্তির জন্য তাঁকেই দূত হিসেবে পাঠানো হত।’ (আল ফারুক : ১৪)

‘উমারের ইসলাম গ্রহণ এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তাঁর চাচাত ভাই যায়িদের কল্যাণে তাঁর বংশে তাওহীদের বাণী একেবারে নতুন ছিল না। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যায়িদের পুত্র সাঈদ ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদ আবার ‘উমারের বোন ফাতিমাকে বিয়ে করেন। স্বামীর সাথে ফাতিমাও ইসলাম গ্রহণ করেন। উমারের বংশের আর এক বিশিষ্ট ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত ‘উমার ইসলাম সম্পর্কে কোন খবরই রাখতেন না। সর্বপ্রথম যখন ইসলামের কথা শুনলেন, ক্রোধে জ্বলতে লাগলেন। তাঁর বংশে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের তিনি পরম শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। এর মধ্যে জানতে পেলেন, ‘লাবীনা’ নামে তাঁর এক দাসীও ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যাঁদের ওপর তাঁর ক্ষমতা চলতো, নির্মম উৎপীড়ন চালালেন। এক পর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ইসলামের মূল প্রচারক মুহাম্মাদকেই (সা) দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। যে কথা সেই কাজ।

আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণিত- ‘তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে ‘উমার চলেছেন। পথে বনি যুহরার এক ব্যক্তির (মতান্তরে নাঈম ইবন আবদুল্লাহ) সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : কোন দিকে ‘উমার?
বললেনঃ মুহাম্মাদের একটা দফারফা করতে।
লোকটি বললেন, মুহাম্মাদের (সা) দফারফা করে বনি হাশিম ও বনি যুহরার হাত থেকে বাঁচবে কিভাবে? একথা শুনে ‘উমার বলে উঠলেন : মনে হচ্ছে, তুমিও পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করে বিধর্মী হয়েছ।
লোকটি বললেন : ‘উমার, একটি বিশ্বয়কর খবর শোন, তোমার বোন ভগ্নিপতি বিধর্মী হয়ে গেছে। তারা তোমার ধর্ম ত্যাগ করেছে। (আসলে লোকটির উদ্দেশ্য ছিল, ‘উমারকে তার লক্ষ্য থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।)
একথা শুনে রাগে উন্মত্ত হয়ে ‘উমার ছুটলেন তাঁর বোন-ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে। বাড়ির দরজায় ‘উমারের (রা) করাঘাত পড়লো। তাঁরা দু’জন তখন খাব্বাব ইবন আল-আরাত-এর কাছে কুরআন শিখছিলেন। ‘উমারের আভাস পেয়ে খাব্বাব বাড়ীর অন্য একটি ঘরে আত্মগোপন করলেন। ‘উমার বোন-ভগ্নিপতিকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের এখানে গুন্‌গুন্‌ আওয়ায শুনছিলাম, তা কিসের?” তাঁরা তখন কুরআনের সূরা ত্বহা পাঠ করছিলেন।
তাঁরা উত্তর দিলেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলাম।“
‘উমার বললেন, “সম্ভবতঃ তোমরা দু’জন ধর্মত্যাগী হয়েছো।“
ভগ্নিপতি বললেনঃ তোমার ধর্ম ছাড়া অন্য কোথাও যদি সত্য থাকে তুমি কি করবে ‘উমার?”

‘উমার তাঁর ভগ্নিপতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং দু’পায়ে ভীষণভাবে তাঁকে মাড়াতে লাগলেন। বোন তাঁর স্বামীকে বাঁচাতে এলে ‘উমার তাঁকে ধরে এমন মার দিলেন যে, তাঁর মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। বোন রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “সত্য যদি তোমার দ্বীনের বাইরে অন্য কোথাও থেকে থাকে, তাহলে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।“

এ ঘটনার কিছুদিন আগ থেকে ‘উমারের মধ্যে একটা ভাবান্তর সৃষ্টি হয়েছিল। কুরাইশরা মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্মম অত্যাচার-উৎপীড়ন চালিয়ে একজনকেও ফেরাতে পারেনি। মুসলমানরা নীরবে সবকিছু মাথা পেতে নিয়েছে। প্রয়োজনে বাড়ী-ঘর ছেড়েছে, ইসলাম ত্যাগ করেনি। এতে ‘উমারের মনে একটা ধাক্কা লেগেছিল। তিনি একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে দোল খাচ্ছিলেন। আজ তাঁর প্রিয় সহোদরার চোখ-মুখের রক্ত, তার সত্যের সাক্ষ্য তাঁকে এমন একটি ধাক্কা দিল যে, তাঁর সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কর্পূরের মত উড়ে গেল। মুহূর্তে হৃদয় তাঁর সত্যের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তিনি পাক-সাফ হয়ে বোনের হাত থেকে সূরা ত্বাহার অংশটুকু নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ করে বললেন, “আমাকে তোমরা মুহাম্মাদের (সা) কাছে নিয়ে চল।“

‘উমারের একথা শুনে এতক্ষণে খাব্বাব ঘরের গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, “সুসংবাদ ‘উমার! বৃহস্পতিবার রাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমার জন্য দু’আ করেছিলেন। আমি আশা করি তা কবুল হয়েছে। তিনি বলেছিলেন: ‘আল্লাহ, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব অথবা ‘আমর ইবন হিশামের দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী কর।“

খাব্বাব আরো বললেন, “রাসূল (সাঃ) এখন সাফার পাদদেশে ‘দারুল আরকামে’।“

‘উমার চললেন ‘দারুল আরকামের’ দিকে। হামযা এবং তালহার সাথে আরো কিছু সাহাবী তখন আরকামের বাড়ীর দরজায় পাহারারত। ‘উমারকে দেখে তাঁরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তবে হামযা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আল্লাহ ‘উমারের কল্যাণ চাইলে সে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলের অনুসারী হবে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য খুবই সহজ হবে। রাসূল (সাঃ) বাড়ির ভেতরে। তাঁর উপর তখন ওহী নাযিল হচ্ছে। একটু পরে তিনি বেরিয়ে ‘উমারের কাছে এলেন। ‘উমারের কাপড় ও তরবারির হাতল মুঠ করে ধরে বললেন, “’উমার, তুমি কি বিরত হবে না?”…… তারপর দুআ করলেন, “হে আল্লাহ্, ‘উমার আমার সামনে, হে আল্লাহ, ‘উমারের দ্বারা দ্বীনকে শক্তিশালী কর।“  “উমার বলে উঠলেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল।“

ইসলাম গ্রহণ করেই তিনি আহ্বান জানালেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, ঘর থেকে বের হয়ে পড়ুন।’ (তাবাকাতুল কুররা/ইবন সা’দ ৩/২৬৭-৬৯) এটা নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা।

ইমাম যুহরী বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ (সা.) দারুল আরকামে প্রবেশের পর ‘উমার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পূর্বে নারী-পুরুষ সর্বমোট ৪০ অথবা চল্লিশের কিছু বেশী লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ‘উমারের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরীল (আ.) এসে বলেন : “মুহাম্মাদ, উমারের ইসলাম গ্রহণে আসমানের অধিবাসীরা উৎফুল্ল হয়েছে।” (তাবাকাত : ৩/২৬৯)

‘উমারের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০/৫০ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে হযরত হামযাও ছিলেন, তথাপি মুসলমানদের পক্ষে কা’বায় গিয়ে নামায পড়া তো দূরের কথা নিজেদেরকে মুসলমান বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। হযরত ‘উমারের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন এবং অন্যদের সংগে নিয়ে কা’বা ঘরে নামায আদায় শুরু করলেন।

হযরত উমার (রা) বলেন : আমি ইসলাম গ্রহণের পর সেই রাতেই চিন্তা করলাম, মক্কাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সবচেয়ে কট্টর দুশমন কে আছে। আমি নিজে গিয়ে তাকে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানাবো। আমি মনে করলাম, আবু জাহলই সবচেয়ে বড় দুশমন । সকাল হতেই আমি তার দরজায় করাঘাত করলাম। আবু জাহল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি মনে করে?’ আমি বললাম, ‘আপনাকে একথা জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের (সাঃ) প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর আনীত বিধান ও বাণীকে মেনে নিয়েছি।’ একথা শোনা মাত্র সে আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল এবং বললো, ‘আল্লাহ তোকে কলংকিত করুক এবং যে খবর নিয়ে তুই এসেছিস তাকেও কলংকিত করুক।’ (সীরাতু ইবন হিশাম)

এভাবে এই প্রথমবারের মত মক্কার পৌত্তলিক শক্তি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন : ‘তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ইসলাম প্রকাশ্য রূপ নেয়।’ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন : ‘উমার ইসলাম গ্রহণ করেই কুরাইশদের সাথে বিবাদ আরম্ভ করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কা’বায় নামায পড়ে ছাড়লেন। আমরাও সকলে তাঁর সাথে নামায পড়েছিলাম।’ সুহায়িব ইবন সিনান বলেন : তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর আমরা কা’বার পাশে জটলা করে বসতাম, কা’বার তাওয়াফ করতাম, আমাদের সাথে কেউ রূঢ় ব্যবহার করলে তার প্রতিশোধ নিতাম এবং আমাদের ওপর যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করতাম। (তাবকাত : ৩/২৬৯)।

উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পর প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ আদায় করাতে মুসলিমরা বাধার সম্মুখীন হয়নি। ইসলাম গ্রহণের পর গোপনীয়তা পরিহার করে প্রকাশ্যে তিনি মুসলিমদের নিয়ে বাইরে আসেন এবং কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি ছাড়াও হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। সেদিন মুহাম্মদ (সা) তাকে “ফারুক” উপাধি দেন। কারণ তারই কারনে ইসলাম ও কুফরের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। রাসুল (সা) বলেছেন, উমরের জ্বিহবা ও অন্তঃকরনে আল্লাহ তাআলা সত্যকে স্থায়ী করে দিয়েছেন। তাই সে ‘ফারুক’, আল্লাহ তাঁর দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করে দিয়েছেন।

মদিনা জীবনঃ

বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, রাসুল (সাঃ) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের সাথে উমরের দ্বীনি ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। আবু বক্কর সিদ্দিক, উয়াইস ইবন সায়িদা, ইতবান ইবন মালিক ও মুয়াজ ইবন আফরা (রাঃ) ছিলেন উমরের দ্বীনি ভাই। তবে এটা নিশ্চিত যে, মদীনায় হিজরাতের পর বনী সালেমের সর্দার ইতবান ইবন মালিকের সাথে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

হিজরী প্রথম সাল হতে রাসুলে কারীম (সাঃ) এর ইন্তিকাল পর্যন্ত উমরের কর্মজীবন প্রকৃত পক্ষে রাসুল (সাঃ) এরই কর্মময় জীবনের একটা অংশ বিশেষ। রাসুল (সাঃ) কে যত যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যত চুক্তি করতে হয়েছিল, কিংবা সময় সময় যত বিধি প্রবর্তন করতে হয়েছিল এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল, তার এমন একটি ঘটনাও নেই- যা উমরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্পাদিত হয়েছে। এই জন্য এই সব ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ লিখতে গেলে তা উমরের (রাঃ) জীবনি না হয়েও রাসুল (সাঃ) এর জীবনিতে পরিণত হয়ে যায়। তাঁর কর্মবহুল জীবন ছিল রাসুল (সাঃ) এর জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

হযরত উমর বদর, ওহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই রাসুল (সাঃ) এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া আরো বেশ কিছু সারিয়্যা (যে সব ছোট অভিযানে রাসুল (সাঃ) নিজে উপস্থিত হননি)- তে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধের পরামর্শদান ও সৈন্য চালনা হতে আরম্ভ করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রাসুল (সাঃ) এর সাথে দৃঢ়ভাবে কাজ করেন। বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর পরামর্শই আল্লাহ পাকের পছন্দ হয়েছিল।

এ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিম্নরুপ-

১. এ যুদ্ধে কুরাইশ বংশের প্রত্যেক শাখা হতে লোক যোগদান করে; কিন্তু বণী আ’দী অর্থাৎ ’উমারের খান্দান হতে একটি লোকও যোগদান করেনি। ’উমারের প্রভাবেই এমনটি হয়েছিল।

২. এ যুদ্ধে ইসলামের বিপক্ষে ’উমারের সাথে তাঁর গোত্র ও চুক্তিবদ্ধ লোকদের থেকে মোট বারো জন লোক যোগদান করেছিল।

৩. এ যুদ্ধে হযরত ’উমার তাঁর আপন মামা আ’সী ইবন হিশামকে নিজ হাতে হত্যা করেন। এ হত্যার মাধ্যমে তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন, সত্যের পথে আত্মীয় প্রিয়জনের প্রভাব প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।

উহুদ যুদ্ধেও হযরত ’উমার (রা.) ছিলেন একজন অগ্রসৈনিক। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম সৈন্যরা যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন এবং রাসূল (সা.) আহত হয়ে মুষ্টিমেয় কিছু সঙ্গী-সাথীসহ পাহাড়ের এক নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেন, তখন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান নিকটবর্তী হয়ে উচ্চস্বরে মুহাম্মাদ (সা.) আবু বকর (রা.), ’উমার (রা.) প্রমুখের নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা বেঁচে আছ কি?”
রাসূলের (সা.) ইঙ্গিতে কেউই আবু সুফিয়ানের জবাব দিল না। কোন সাড়া না পেয়ে আবু সুফিয়ান ঘোষণা করলো, ‘নিশ্চয় তারা সকলে নিহত হয়েছে।‘
এ কথায় ’উমারের পৌরুষে আঘাত লাগলো। তিনি স্থির থাকতে পারলেন না।’ বলে উঠলেন, “ওরে আল্লাহর দুশমন! আমরা সবাই জীবিত।“ আবু সুফিয়ান বললো, ‘উ’লু হুবল-হুবলের জয় হোক।’ রাসূলুল্লাহর (সা.) ইঙ্গিতে ’উমার জবাব দিলেন, “আল্লাহু আ’লা ও আজাল্লু- আল্লাহ মহান ও সম্মানী।“

খন্দকের যুদ্ধেও ’উমার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। খন্দকের একটি বিশেষ স্থান রক্ষা করার ভার পড়েছিল ’উমারের ওপর। আজও সেখানে তাঁর নামে একটি মসজিদ বিদ্যমান থেকে তাঁর সেই স্মৃতির ঘোষণা করছে। এ যুদ্ধে একদিন তিনি প্রতিরক্ষায় এত ব্যস্ত ছিলেন যে, তাঁর আসরের নামায ফউত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রাসূল (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “ব্যস্ততার কারণে আমিও এখন পর্যন্ত নামায আদায় করতে পারিনি।“ (আল-ফারুকঃ শিবলী নু’মানীঃ ২৫)

হুদাইবিয়ার শপথের পূর্বেই হযরত ’উমার যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করে দিলেন। পুত্র আবদুল্লাহকে পাঠালেন কোন এক আনসারীর নিকট থেকে ঘোড়া আনার জন্য। তিনি এসে খবর দিলেন, “লোকেরা রাসূলুল্লাহর (সা.) হাতে বাইয়াত করছেন।’ ’উমার তখন রণসজ্জায় সজ্জিত। এ অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) হাতে বাইয়াত করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তগুলি বাহ্য দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হলো। ’উমার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। প্রথমে আবু বকর, তারপর খোদ রাসূলুল্লাহর (সা.) নিকট এ সন্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত কোন কাজ আমি করিনে।“ ’উমার শান্ত হলেন। তিনি অনুতপ্ত হলেন। নফল রোযা রেখে, নামায পড়ে, গোলাম আযাদ করে এবং দান খয়রাত করে তিনি গোস্‌তাখীর কাফ্‌ফারা আদায় করলেন।

খাইবারে ইহুদীদের অনেকগুলি সুরক্ষিত দুর্গ ছিলো। কয়েকটি সহজেই জয় হলো। কিন্তু দু’টি কিছুতেই জয় করা গেল না। রাসূল (সা.) প্রথম দিন আবু বকর, দ্বিতীয় দিন ’উমারকে পাঠালেন দুর্গ দু’টি জয় করার জন্য। তাঁরা দু’জনই ফিরে এলেন অকৃতকার্য হয়ে। তৃতীয় দিন রাসূল (সা.) ঘোষণা করলেন, “আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ঝাণ্ডা দেব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।“ পর দিন সাহাবায়ে কিরাম অস্ত্র সজ্জিত হয়ে রাসূলুল্লাহর (সা.) দরবারে হাজির। প্রত্যেকেরই অন্তরে এই গৌরব অর্জনের বাসনা। ’উমার বলেন, ‘আমি খাইবারে এই ঘটনা ব্যতীত কোনদিনই সেনাপতিত্ব বা সরদারীর জন্য লালায়িত হইনি।’ সে দিনের এ গৌরব ছিনিয়ে নিয়েছিলেন শের-ই-খোদা আলী (রা.)।

খাইবারের বিজিত ভূমি মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হলো। হযরত ’উমার রা. তাঁর ভাগ্যের অংশটুকু আল্লাহর রাস্তার ওয়াক্‌ফ করে দিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই প্রথম ওয়াক্‌ফ। (আল-ফারুকঃ ৩০)

মক্কা বিজয়ের সময় হযরত ’উমার (রা.) ছায়ার মত রাসূলকে (সা.) সঙ্গ দেন। ইসলামের মহাশত্রু আবু সুফিয়ান আত্মসমর্পণ করতে এলে ’উমার রাসূলুল্লাহকে (সা.) অনুরোধ করেন, ‘অনুমতি দিন এখনই ওর দফা শেষ করে দিই।’ এদিন মক্কার পুরুষরা রাসূলুল্লাহর (সা.) হাতে এবং মহিলারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নির্দেশে ’উমারের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন।

হুনায়িন অভিযানেও হযরত ’উমার অংশগ্রহণ করে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেছিলেন। এ যুদ্ধে কাফিরদের তীব্র আক্রমণে বারো হাজার মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। ইবন ইসহাক বলেন, মুহাজির ও আনসারদের মাত্র কয়েকজন বীরই এই বিপদকালে রাসূলুল্লাহর (সা.) সাথে দৃঢ়পদ ছিলেন। তাদের মধ্যে আবু বকর, ’উমার ও আব্বাসের (রা.) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাবুক অভিযানের সময় রাসূলুল্লাহর (সা.) আবেদনে সাড়া দিয়ে হযরত ’উমার (রা.) তাঁর মোট সম্পদের অর্ধেক রাসূলুল্লাহর (সা.) হাতে তুলে দেন।

মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুঃ

মুহাম্মদ (সা.) মারা যাওয়ার পর উমর প্রথমে তা বিশ্বাস করতে চাননি। রাসুল (সা.) এর ইন্তিকালের খবর শুনে হযরত উমর কিছুক্ষন স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকেন। তারপর মসজিদে নববীর সামনে গিয়ে তরবারী কোষমুক্ত করে ঘোষনা দেন, যে বলবে আল্লাহর রাসুল ইন্তেকাল করেছেন, আমি তার মাথা দ্বিখন্ডিত করে ফেলবো।

এসময় আবু বকর এসে ঘোষণা করেন –

তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদ (সা.) এর পূজা করতে তারা জেনে রাখুক যে মুহাম্মদ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, অবশ্যই আল্লাহ সর্বদাই জীবিত থাকবেন, কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।

আবু বকর কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন-

মুহাম্মদ (সা.) একজন রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে অনেক রাসুল গত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পিঠ ফিরিয়ে পিছু হটবে? আর যে পিঠ ফিরিয়ে সরে পড়ে, সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন।” (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪৪)

এ ঘটনা থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসার পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

খিলাফতের প্রতিষ্ঠাঃ

মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় উমর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মুহাম্মদ (সা.) এর দাফনের প্রস্তুতি চলার সময় কিছু মুসলিম শহরের উপকন্ঠে সাকিফা নামক স্থানে তার উত্তরসুরির বিষয়ে আলোচনায় বসে। এরপর আবু বকর, উমর এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এখানে উপস্থিত হন। এসময় আনসারদের মধ্য থেকে দাবি উঠে যে, উত্তরসুরি আনসারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে। উমর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, উত্তরাধিকার মুহাজিরদের মধ্য থেকে হতে হবে। কিছু গোত্র ইসলামপূর্ব গোত্রীয় নেতৃত্ব ব্যবস্থায় ফিরে যেতে ইচ্ছুক ছিল যাতে প্রত্যেক গোত্রের নেতা গোত্রকে নেতৃত্ব দিত। শেষপর্যন্ত আবু বকরকে খলিফা হিসেবে অধিক যোগ্য বলে দাবি করে তার প্রতি উমর আনুগত্য প্রকাশ করেন। এই সিদ্ধান্ত শেষপর্যন্ত সবাই মেনে নেয়।ফলে খলীফা নির্বাচনের মহা সংকট সহজেই কেটে যায়।

ইসলামি খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় উমরেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ধরা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

খলিফা আবু বকরের যুগঃ

আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে উমর তার একজন প্রধান সচিব ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। রিদ্দার যুদ্ধের সময় প্রথমে তিনি আবু বকরের কিছু মতের সাথে একমত না হলেও, পরে তা মেনে নেন এবং তাকে সহায়তা করেন। শেষপর্যন্ত বিদ্রোহীদের দমন করে আরব উপদ্বীপকে একতাবদ্ধ করা হয়।

ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফিজ শহীদ হলে উমর কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলনের জন্য আবু বকরের কাছে আবেদন জানান। আবু বকর প্রথমে তাতে রাজি না থাকলেও পরে সম্মত হন। এর ফলে কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলিত হয।

খলিফার দায়িত্বগ্রহণঃ

খলীফা হযরত আবু বকর যখন বুঝতে পারলেন তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে, মৃত্যুর পূর্বেই পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যাওয়াকে তিনি কল্যাণকর মনে করলেন। তাঁর দৃষ্টিতে ’উমার (রা.) ছিলেন খিলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি। তা সত্ত্বেও উঁচু পর্যায়ের সাহাবীদের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা সমীচীন মনে করলেন। তিনি আবদুর রহমান ইবন আউফকে (রা.) ডেকে বললেন, ’উমার সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে জানান।’
তিনি বললেন, ‘তিনি তো যে কোন লোক থেকে উত্তম; কিন্তু তাঁর চরিত্রে কিছু কঠোরতা আছে।’ আবু বকর বললেন, ‘তার কারণ, আমাকে তিনি কোমল দেখেছেন, খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে পড়লে এ কঠোরতা অনেকটা কমে যাবে।’ তারপর আবু বকর অনুরোধ করলেন, তাঁর সাথে আলোচিত বিষয়টি কারো কাছে ফাঁস না করার জন্য।
অতঃপর তিনি ’উসমান ইবন আফ্‌ফানকে ডাকলেন। বললেন, ‘আবু আবদিল্লাহ, ’উমার সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে জানান।’ ’উসমান বললেন, ‘আমার থেকে আপনিই তাঁকে বেশী জানেন।‘ আবু বকর বললেন, ‘তা সত্ত্বেও আপনার মতামত আমাকে জানান।‘ ’উসমান বললেন, ‘তাঁকে আমি যতটুকু জানি, তাতে তাঁর বাইরের থেকে ভেতরটা বেশী ভালো। তাঁর মত দ্বিতীয় আর কেউ আমাদের মধ্যে নেই। আবু বকর (রা.) তাঁদের দু’জনের মধ্যে আলোচিত বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করে তাঁকে বিদায় দিলেন।

এভাবে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মতামত নেওয়া শেষ হলে তিনি উসমান ইবনে আফ্‌ফানকে ডেকে ঘোষণা জারি করলেন, “বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবন আবী কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলমানদের প্রতি অঙ্গীকার। আম্মা বাদ’- এতটুকু বলার পর তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। তারপর ’উসমান ইবন আফ্‌ফান নিজেই সংযোজন করেন- ‘আমি তোমাদের জন্য ’উমার ইবনুল খাত্তাবকে খলীফা মনোনীত করলাম এবং এ ব্যাপারে তোমাদের কল্যাণ চেষ্টায় কোন ত্রুটি করি নাই।’ অতঃপর আবু বকর সংজ্ঞা ফিরে পান। লিখিত অংশটুকু তাঁকে পড়ে শোনান হলো।’ সবটুকু শুনে তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ওঠেন এবং বলেন, ‘আমার ভয় হচ্ছিল, আমি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মারা গেলে লোকেরা মতভেদ সৃষ্টি করবে।‘ ’উসমানকে লক্ষ্য করে তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তা’আলা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে আপনাকে কল্যাণ দান করুন।

তাবারী বলেন, অতঃপর আবু বকর লোকদের দিকে তাকালেন। তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতু উমাইস তখন তাঁকে ধরে রেখেছিলেন। সমবেত লোকদের তিনি বলেন, “যে ব্যক্তিকে আমি আপনাদের জন্য মনোনীত করে যাচ্ছি তাঁর প্রতি কি আপনারা সন্তুষ্ট? আল্লাহর কসম, মানুষের মতামত নিতে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। আমার কোন নিকট আত্মীয়কে এ পদে বহাল করিনি। আমি ’উমার ইবনুল খাত্তাবকে আপনাদের খলীফা মনোনীত করেছি। আপনারা তাঁর কথা শুনুন, তাঁর আনুগত্য করুন।“ উত্তরসুরি হিসেবে উমরের ক্ষমতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে আবু বকর অবগত ছিলেন। উমর সম্পূর্ণ বিবাদহীনভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন।

মৃত্যূর পূর্বে আবু বকর উমরকে ডেকে তার অসিয়ত লিখতে বলেন যাতে তিনি উমরকে নিজের উত্তরসুরি ঘোষণা করে যান। অসিয়তনামায় উমরকে ইরাক ও সিরিয়া জয়ের অভিযান চালু রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। এভাবে ’উমারের (রা.) খিলাফত শুরু হয় হিঃ ১৩ সনের ২২ জামাদিউস সানী মুতাবিক ১৩ আগস্ট ৬৩৪ খৃঃ।

আবু বকরের সিদ্ধান্ত ইসলামি খিলাফতকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছিল।

 

খলিফা হিসেবে শাসনঃ

হযরত ’উমারের রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা সম্ভব নয়। দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তাঁর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬ টি শহর বিজিত হয়। ইসলামী হুকুমাতের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা মূলতঃ তাঁর যুগেই হয়। সরকার বা রাষ্ট্রের সকল শাখা তাঁর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে।

ক্ষমতাপ্রাপ্তি পর সকল মুসলিম তাকে বায়াত প্রদান করেন। তার ব্যক্তিত্বের কারণে জনতা তাকে সমীহ করত। মুহাম্মদ হুসাইন হায়কলের মতে উমরের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল তার প্রজা ও মজলিশ আল শুরার সদস্যদের মন জয় করা।

শাসক হিসেবে উমর দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। ফিদাকের জমির ব্যাপারে তিনি আবু বকরের নীতির অনুসরণ করেছেন এবং একে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহারের নীতি চালু রাখেন।

রিদ্দার যুদ্ধে কয়েক হাজার বিদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীকে দাস হিসেবে বন্দী করা হয়েছিল। উমর এসকল বন্দীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং তাদের মুক্তির নির্দেশ দেন।

হযরত ’উমার প্রথম খলীফা যিনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি লাভ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামায জামাআতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জন শাসনের জন্য দুর্রা বা ছড়ি ব্যবহার করেন, মদপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন, বহু রাজ্য জয় করেন, নগর পত্তন করেন, সেনাবাহিনীর স্তরভেদ ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ান নির্দিষ্ট করেন, জাতীয় রেজিষ্টার বা নাগরিক তালিকা তৈরী করেন, কাযী নিয়োগ করেন এবং রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করেন।

’উমার (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহর অন্যতম কাতিব। নিজ কন্যা হযরত হাফসাকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সাথে বিয়ে দেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকরের (রা.) মন্ত্রী উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে ব্যবসা ছিল তাঁর জীবিকার উপায়। খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে পড়ার পরও কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যবসা চালিয়ে যান। কিন্তু পরে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালে হযরত আলী (রা.) সহ উঁচু পর্যায়ের সাহাবীরা পরামর্শ করে বাইতুল মাল থেকে বাৎসরিক মাত্র আট শ’ দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেন। হিজরী ১৫ সনে বাইতুল মাল থেকে অন্য লোকদের ভাতা নির্ধারিত হলে বিশিষ্ট সাহাবীদের ভাতার সমান তাঁরও ভাতা ধার্য করা হয় পাঁচ হাজার দিরহাম।

হযরত ’উমার সব সময় একটি দুর্রা বা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতেন। শয়তানও তাঁকে দেখে পালাতো। (তাজকিরাতুল হুফফাজ) তাই বলে তিনি অত্যাচারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন কঠোর ন্যায় বিচারক। মানুষকে তিনি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন, মানুষও তাঁকে ভালোবাসতো। তাঁর প্রজাপালনের বহু কাহিনী ইতিহাসে পাওয়া যায়।

হযরত ফারুকে আযমের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে এত বেশী ইঙ্গিত ও প্রকাশ্য বাণী রয়েছে যে, সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে তা প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সা. নিকট তাঁর স্থান অতি উচ্চে। এজন্য বলা হয়েছে, ’উমারের সব মতের সমর্থনেই সর্বদা কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে।’ হযরত আলী রা. মন্তব্য করেছেনঃ ‘খাইরুল উম্মাতি বা’দা নাবিয়্যিহা আবু বকর সুম্মা ’উমার- নবীর সা. পর উম্মাতের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি আবু বকর, তারপর ’উমার।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেনঃ ’উমারের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়। তাঁর হিজরাত আল্লাহর সাহায্য এবং তাঁর খিলাফত আল্লাহর রহমত।’ ’উমারের যাবতীয় গুণাবলী লক্ষ্য করেই রাসূলে করীম সা. বলেছিলেনঃ ‘লাও কানা বা’দী নাবিয়্যুন লাকানা ’উমার- আমার পরে কেউ নবী হলে ’উমারই হতো।’ কারণ তাঁর মধ্যে ছিল নবীদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য।

জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ও প্রসারের ক্ষেত্রে ’উমারের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তিনি আরবী কবিতা পঠন-পাঠন ও সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। আরবী ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ; তাঁর সামনে ভাষার ব্যাপারে কেউ ভুল করলে শাসিয়ে দিতেন। বিশুদ্ধভাবে আরবী ভাষা শিক্ষা করাকে তিনি দ্বীনের অঙ্গ বলে বিশ্বাস করতেন। আল্লামা জাহাবী ‘তাজকিরাতুল হুফ্‌ফাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ’উমার ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, একই হাদীস বিভিন্ন সনদের মাধ্যমে বর্ণনার প্রতি তিনি তাকিদ দেন।

বাইতুল মাল ও জনগণের অধিকারঃ

হযরত আবু বকর, হযরত উমর ও হযরত আলী (রা.)-এর আমলে বাইতুল মাল কার্যক্ষেত্রে জনগণের সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হতো এবং ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তি এর থেকে প্রয়োজন অনুসারে ভাতা পেতেন। রাষ্ট্রের আয় বাইতুল মালে জমা হতো, সেখান থেকে সবাই ইনসাফপূর্ণ বণ্টনে সুবিধা ভোগ করতেন।

বাইতুল মালের অর্থের ব্যাপারে হযরত ’উমারের (রা.) দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইয়াতিমের অর্থের মত। ইয়াতিমের অভিভাবক যেমন ইয়াতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করে, ইয়াতীমের ও নিজের জন্য প্রয়োজন মত খরচ করতে পারে কিন্তু অপচয় করতে পারে না। প্রয়োজন না হলে ইয়াতিমের সম্পদ থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে শুধু হিফাজত করে এবং ইয়াতিম বড় হলে তাকে তার সম্পদ ফিরিয়ে দেয়। বাইতুল মালের প্রতি ’উমারের (রা.) এ দৃষ্টিভঙ্গিই সর্বদা তাঁর কর্ম ও আচরণে ফুটে উঠেছে।

যাকাত ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে গরিবদের দেওয়া হতো এবং এটা ছিল বাধ্যতামূলক আইন। ইসলামের প্রথম যুগে সরকারি কর্মচারী মারফত যাকাত আদায় করা হতো এবং তা মসজিদ নির্মাণ, যুদ্ধের ব্যয় ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য উপযুক্ত কাজে ব্যয় করা হতো। অধিকৃত সম্পদও এইভাবে সবার মাঝে বণ্টন করা হতো। যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, আজাদ ও দাস সবাই এই সম্পত্তির ভাগ পেত। (বদরে যারা যুদ্ধ করেন-৫০০০ দিরহাম; মুহাজিরিন ও আনসার-৪০০০ দিরহাম, তাদের ছেলেরা-২০০০ দিরহাম; অন্যরা ৬০০/২০০।)

অধ্যাপক নোল ভেকে বলেছেন, সব চাইতে উল্লেখযোগ্য নীতি ছিল এই যে, যা কিছু অধিকৃত হতো তা সামগ্রিকভাবে সবারই হয়ে যেত; তারপর খরচ ব্যতীত যা কিছু থাকত, সবই ভাগ করে দেওয়া হতো। খলিফা দেখতেন যে, রাষ্ট্রে কোনো ভিক্ষুক বা অসহায় ব্যক্তি না থাকে, কেউ কারোর উপর জুলুম না করে। শাসনকর্তারা পদ গ্রহণের সময় বিলাসিতা বর্জনের প্রতিশ্রুতি দিতেন।

এসব ব্যাপারে মুসলিম ও অমুসলিমে কোনো পার্থক্য ছিল না। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত অমুসলিমরাও এই সুবিধা পেতো। মদিনায় এক অন্ধ ইহুদি জিজিয়া দেবার জন্য ভিক্ষা করছিল। হযরত উমর (রা.) তাকে দেখতে পেয়ে বললেন যে, ‘এইসব মানুষের যৌবনকে কাজে লাগিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় অবহেলা করা সুবিচার নয়। যাকাত গরিব ও অভাবগ্রস্ত লোকদের জন্য, অভাবগ্রস্ত বলতে এদেরকেও বুঝতে হবে।’ গরিব অমুসলিমদেরকে জিজিয়া থেকেও রেহাই দেওয়া হতো। কারণ রাষ্ট্রে যেনো কোনো অসহায় ব্যক্তি না থাকে এটা দেখা ইমামের পক্ষে ফরয।

মুর বলেন- একটা বড় জাতি বিজয়ে অধিকৃত সম্পত্তি সাম্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ভেতরে ভাগ করে নেয়- এমন দৃশ্য পৃথিবীর ইতিহাসে আর চোখে পড়ে না।

ইসলামি সমাজ– মানব স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিকাশঃ

সেই মধ্যযুগেও ইসলাম মানব স্বাধীনতার এমন এক অনুপম চিত্রের বাস্তবরূপ দেখিয়েছিল, যা আজকের দুনিয়াতেও পুরোপুরি পাওয়া কঠিন। নৈরাশ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত বহু জাতিকে ইসলাম মুক্তির মশাল হাতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এর ফলে এমন এক সুসংহত সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যেখানে প্রত্যেকের পক্ষেই তার কার্যদক্ষতা দেখিয়ে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করার পূর্ণ সুযোগ ছিল। এই জন্যই সিরিয়ার অধিবাসী, মিসরের কপট উত্তর আফ্রিকার খৃস্টান ‘বারবার’ ও প্যালেস্টাইনের ‘সামারীয়গণ’ মুসলিম সেনাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। ইসলামের দেয়া মানবিক সাম্য ও সুবিচারের ভাবটুকু সে যুগের শাসকরা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন।

মিসর বিজয়ী আমর ইবনুল আস (রা.) খলিফাকে তার রিপোর্টে জানিয়েছিলেন, কিভাবে মিসরের চাষিরা পিঁপড়ার মতো সারাদিন খাটছে, মালিকের বেতের ঘা সহ্য করছে, অথচ ফসলের সমান ভাগ ভোগ করতে পারছে না। ওয়ালিদ বিন মুগিরা (রা.) তার পাশেই বসেছিলেন; এবং এতে উপস্থিত সকলে বিস্ময় প্রকাশ করলে। তিনি বলেন, ‘কেউ পূজা পাবার জন্য উপরে সিংহাসনে বসবে আর কেউ নিচে মাথা নিচু করে বসবে- আমাদের ভেতরে এ রেওয়াজ নেই।’ আবার সিরিয়ার দরবারে মুয়াজ (রা.) কে যখন সুদৃশ্য কার্পেটে বসতে দেওয়া হলো, তিনি সেখানে বসলেন না, আর বললেন, ‘গরিবদের লুট করে যে কার্পেট তৈরি হয়েছে, সেখানে আমি বসতে চাই না।’
জেরুজালেমের সন্ধির সময় খলিফাকে তার ছেঁড়া কাপড় ছেড়ে ভালো কাপড় পরতে অনেকে অনুরোধ করে। খলিফা জবাব দেন, ‘একজন মুসলিমের সম্মান পোশাকের ওপর নির্ভর করে না।’

এই ছিল একজন মুসলিম খলিফা ও ইসলামি খিলাফত। আমাদের পূর্বসূরি ও আমাদের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়। অনাগত ইসলামি সমাজ বিনির্মাণে আমরা যেন এখান থেকে জীবনের পথনির্দেশ খুঁজে নেই।

ইন্তেকালঃ

৬৪৪ সালে উমর (রাঃ) একজন পারসিয়ানের হাতে নিহত হন। হত্যাকান্ডটি কয়েকমাস ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা ইবন শু’বার (রা.) অগ্নি উপাসক দাস পিরুজ নাহাওয়ান্দি (আবু লুলু বলেও পরিচিত) উমরের কাছে তার মনিব মুগিরার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে। তার অভিযোগ ছিল যে তার মুনিব মুগিরা তার উপর বেশি কর ধার্য করেছে। উমর এরপর মুগিরার কাছে এ বিষয়ে জানতে চান। মুগিরার উত্তর সন্তোষজনক হওয়ায় উমর রায় দেন যে, পিরুজের উপর ধার্য করা কর ন্যায্য। পিরুজ বায়ুকল (উইন্ডমিল) তৈরি করতে জানত। উমর তাকে বলেন যে, সে যাতে তাকে একটি বায়ুকল তৈরি করে দেয়। পিরুজ এর উত্তরে বলে যে, এমন এক বায়ুকল তৈরি করবে যা পুরো পৃথিবী মনে রাখবে।

পিরুজ উমরকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ফজরের নামাজের পূর্বে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে। এখানে নামাজের ইমামতি করার সময় উমরকে সে আক্রমণ করে। তাকে ছয়বার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। হামলার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশের লোকেরা তাকে ঘিরে ফেলে। এসময় সে আরো কয়েকজনকে আঘাত করে যাদের কয়েকজন পরে মারা যায়। এরপর পিরুজ নিজ অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করে।

মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় উমর তার উত্তরসুরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে যান। তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। এর সদস্যরা হলেন আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ, উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবি তালিব ও জুবায়ের ইবনুল আওয়াম।

এই কমিটিকে নিজেদের মধ্য থেকে একজন খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা সবাই আশারায়ে মুবাশশারার সদস্য ছিলেন।এসময় জীবিত থাকা সত্ত্বেও আরেক আশারায়ে মুবাশশারা সাঈদ ইবনে যায়িদ বাদ পড়েন। উমরের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিল বিধায় তাকে এর বাইরে রাখা হয়। উমর তার আত্মীয়দেরকে এধরনের কাজে নিয়োগ দিতেন না।

পঞ্চাশ জন সৈনিকের একটি দলকে কমিটির বৈঠক চলার সময় ভবনের বাইরে প্রহরায় রাখার জন্য উমর নিযুক্ত করেন। বৈঠক চলাকালানী সময়ে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ জানান যে তারা উমরকে হামলা করার জন্য ব্যবহৃত ছুরিটি দেখেছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ জানান যে তিনি হরমুজান, জাফিনা ও পিরুজকে হামলার এক রাত আগে সন্দেহজনকভাবে কিছু আলোচনা করতে দেখেন। তাকে দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং একটি ছুরি মাটিতে পড়ে যায় যা উমরের উপর হামলা করার জন্য ব্যবহৃত ছুরির অবিকল অনুরূপ। আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর নিশ্চিত করেন যে, হামলার কয়েকদিন আগে এই ছুরিটি তিনি একবার হরমুজানের কাছে দেখেছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে মদিনায় বসবাসরত পারসিয়ানরা এই হামলার জন্য দায়ী। এতে উমরের সন্তান উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর উত্তেজিত হয়ে মদিনার পারসিয়ানদের হত্যা করতে উদ্যত হন। তিনি হরমুজান, জাফিনা ও পিরুজের মেয়েকে হত্যা করেন। মদিনার লোকেরা তাকে আরও হত্যাকান্ড থেকে নিবৃত্ত করে। উমর এ সংবাদ জানতে পেরে উবাইদুল্লাহকে বন্দী করার আদেশ দেন এবং বলেন যে পরবর্তী খলিফা উবাইদুল্লাহর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।

আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে হিজরী ২৩ সনের ২৭ জিলহজ্জ বুধবার ৬৪৪ সালের ৩ নভেম্বর মারা যান।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর ৭ নভেম্বর উসমান ইবনে আফফান তৃতীয় খলিফা হিসেবে তার উত্তরসুরি হন। দীর্ঘ আলোচনার পর বিচারে সিদ্ধান্ত হয় যে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে না এবং এর পরিবর্তে তাকে রক্তমূল্য পরিশোধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। উমরের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার সন্তানের মৃত্যুদন্ড জনসাধারণকে ক্ষিপ্ত করে তুলতে পারে এমন আশঙ্কায় উবাইদুল্লাহর শাস্তি হ্রাস পায়।

তার ইচ্ছানুযায়ী আয়িশা (রা.) অনুমতিক্রমে তাকে মসজিদে নববীতে মুহাম্মদ (সা.) ও আবু বকরের পাশে দাফন করা হয়।

 

শেষ কথাঃ

ইসলামি সাম্রাজ্যের স্থপতি হিসেবে উমর (রা.) এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মুহাম্মদ (সা.) এর যুগে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।

উমর ছিলেন একজন ন্যায় পরায়ণ শাসক। তিনি বলেছেন, “যদি ইউফ্রেটিসের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মারা যায় তবে উমর সে জন্য দায়ী থাকবে।“

বর্তমানের কথিত শাসকেরা যদি উনার জীবনী থেকে একটু শিক্ষা নেয়, তাহলে পৃথিবী থেকে সকল অশান্তি দূর হয়ে যেত বলেই ইসলামিক চিন্তাবিদগণ মনে করে থাকেন।


লিখেছেন : উসামা মাহমুদ

 

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন