বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৩।। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [দ্বিতীয় কিস্তি]

3
1078
বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ।।পর্ব-৩।। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [দ্বিতীয় কিস্তি]

যুদ্ধের সূচনা

দ্বিতীয় হিজরীর ১৭-এ রমাদান মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩-এ মার্চ। দিনটি ছিল শুক্রবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপর যুদ্ধের কাতার সোজা করার প্রতি  মনোনিবেশ করলেন। সে সময় রাসূলের হাতে একটি তীর ছিল যা দিয়ে তিনি কাতার সোজা করছিলেন। হযরত সাওয়াদ ইবনে গাযিয়্যাহ (রাঃ) অন্যদের থেকে কিছুটা অগ্রবর্তী ছিলেন। হাতের তীরটি দিয়ে রাসূল তার পেটে আলতো ছুঁয়ে দিয়ে বললেন, “সোজা হও সাওয়াদ!” সাওয়াদ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল!  আপনি আমাকে তীর দিয়ে কষ্ট দিলেন; অথচ আল্লাহ তা’আলা আপনাকে ইনসাফের ঝাণ্ডা দিয়ে প্রেরণ করেছেন!! আমি এর বদলা নিতে চাই!’

দয়ার নবী তাঁর পেট মোবারক বস্ত্রহীন করে বললেন, “নাও, সাওয়াদ! তোমার বদলা নাও!”

সাওয়াদ (রাঃ) রাসূলের পেট মোবারকে নিজের গাল লাগালেন, চুম্বন করলেন এবং বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! দুনিয়াতে হয়তো এটাই শেষ মোলাকাত।’ রাসূল অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তার জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন। কাতার সোজা করা শেষ হলো। উভয় বাহিনী এখন মুখোমুখি অবস্থান করছে। একপাশে ১০০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী, অপরদিকে ৩১৩ জনের প্রায় নিরস্ত্র বাহিনী। দেখতে দেখতে যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে এলো।

দ্বন্দ্বযুদ্ধ: উতবাহ,শাইবাহ ও ওয়ালিদ ইবনে উতবাহর মৃত্যু

কাফেরদের সারি থেকে তিন সেনা বেরিয়ে আসল- উতবা ইবনে রাবি’আ, তার ছেলে ওয়ালিদ ইবনে উতবাহ এবং তার ভাই শাইবা ইবনে রবি’আ। ময়দানে এসেই তারা দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য আহ্বান করল। মুসলিম সারি থেকে তিনজন আনসারী সাহাবী এগিয়ে আসলেন। তারা হলেন, আওফ ইবনে হারিস, তার ভাই মুয়াব্বিজ ইবনে হারিস ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদের দেখে উতবাহ জিজ্ঞেস করল “তোমরা কারা?” উত্তরে তারা বললেন, ‘আমরা আনসার সাহাবী।’ উতবা বলল, তোমাদের সাথে আমাদের কীসের সম্পর্ক? স্বগোত্রীয়দের সঙ্গে লড়ব আমরা।

আনসারী তিনজন ফিরে গেলেন সারিতে। রাসূলের নির্দেশ পেয়ে তিনজন মুহাজির সাহাবী ময়দানে আসলেন- হযরত হামজা, আলী ও উবাইদা ইবনুল হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহুম। হযরত হামজা দাঁড়ালেন উতবাহর সামনে, উবাইদা শাইবাহর সামনে আর আলী দাঁড়ালেন ওয়ালিদ ইবনে উতবাহর সামনে। অল্পক্ষণের মধ্যেই লড়াই শুরু হল। হামজা ও আলী মুহূর্তের মধ্যেই নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীকে আজরাইলের হাওয়ালা করলেন। কিন্তু উবাইদাহ তার প্রতিদ্বন্দ্বী উতবাহকে এখনো ঘায়েল করতে  পারেননি। উভয়েই উভয়ের দ্বারা আহত।

হামজা ও আলী উতবাহকে হত্যা করতে উবাইদাহকে সাহায্য করলেন। এরপর উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তুলে নিয়ে রাসূলের কাছে রেখে আসলেন। উবাইদাহ পায়ে আঘাত পেয়েছেন। অঝরে রক্ত ঝরছে৷ শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবনের সফর শেষ হতে যাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা পাব তো? তিনি বললেন, হ্যাঁ উবাইদাহ! এরপর আবু তালিবের একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি আওড়িয়ে শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দিলেন। রাদিয়াল্লাহু আনহু।

শুরু হলো তুমুল লড়াই

দ্বন্দ্বযুদ্ধে কুরাইশদের তিনজন নামকরা সর্দারের এমন করুণ পরিণতি দেখে কুরাইশরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠল। তারা একযোগে হামলে পড়ল মুসলিমদের উপর। মুসলিমরা একটু পেছনে সরে আসলে তারা আহত ব্যাঘ্রের ন্যায় সামনে বাড়তে থাকল। মুসলিমরা আবারও একটু পেছনে সরে আসলেন। কুরাইশরা আরো সামনে আসল। এবার চতুর্দিক থেকে ওদের উপর মুষলধারে তীর-বৃষ্টি শুরু হল।

মূলত এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা কৌশল ছিল। তিনি আশপাশের টিলাগুলির পেছনে তীরন্দাজদের লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং মূল বাহিনীকে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে আসতে বলেছিলেন। যাতে কুরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে সামনে আসে এবং তীরন্দাজদের আওতায় চলে আসে। এতে তীরন্দাজদের জন্য নিশানা করা সহজ হবে। হলোও তাই।

কুরাইশরা অনেক পরে বুঝতে পারল যে, তারা ফাঁদে পা দিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে তাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। সূর্য যতই উপরে উঠছে যুদ্ধের ময়দান ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। ময়দান জুড়ে শুধু তরবারির ঝনঝনানি আর আহতদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে। পুরো ময়দান ধুলোয় ধূসরিত। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। কথা হচ্ছে শুধু তরবারির ভাষায়।  রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বদর উপত্যকা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে নিহতদের লাশ।  এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থায়ী হয় রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ।

বিজয়ের জন্য রাসূলের দোয়া ও ব্যাকুলতা

দ্বন্দ্বযুদ্ধ শেষ হলে মূল যুদ্ধ শুরু হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রিয় সাহাবী হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে নিজ তাবুতে প্রবেশ করেন। হযরত সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান দরজার সামনে।  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’রাকাত নামাজ পড়ে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে বিজয়ের জন্য দোয়া করতে শুরু করেন। কখনো হাত তুলে, কখনো সিজদায় পড়ে তিনি দোয়া করতে থাকেন। ব্যাকুলতার এমন অবস্থা ছিল যে, কাঁধের উপর থেকে বারবার চাদর নিচে পড়ে যাচ্ছিল, আর হযরত আবু বকর (রাঃ) তা উঠিয়ে দিচ্ছিলেন। দোয়ার সেই মর্মস্পর্শী বাক্যগুলো সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

اللَّهُمَّ أَنْجِزْ لي ما وَعَدْتَنِي، اللَّهُمَّ آتِ ما وَعَدْتَنِي، اللَّهُمَّ إنْ تُهْلِكْ هذِه العِصَابَةَ مِن أَهْلِ الإسْلَامِ لا تُعْبَدْ في الأرْضِ،

হে আল্লাহ, আপনি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ করুন! হে আল্লাহ, ইসলামের এই ছোট্ট জামাতটিকে যদি ধ্বংস করে দেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে আপনার গোলামী আর হবে না!!(১) (সহীহ মুসলিম-১৭৬৩)

হযরত আলী (রাঃ) বলেন, আমি কিছুক্ষণ যুদ্ধ করে রাসূলের তাবুতে আসি। তখন তাঁকে আল্লাহ তা’আলার দরবারে দোয়ারত পেয়ে চলে যাই। এভাবে তিনবার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। রাসূলের সীমাহীন অস্থিরতা দেখে হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলের হাত ধরে বলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! যথেষ্ট হয়েছে, আপনি আপনার রবের দরবারে অনেক কাকুতি মিনতি করেছেন! তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে বিজয়ী করবেন!!”

ফেরেশতাদের সাহায্য

কিছুক্ষণ পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিক হন এবং আবু বকরকে বলেন, “হে আবু বকর! বিজয়ের সুসংবাদ গ্রহণ করো, আল্লাহ তা’আলার সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরাইল, সে তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে আছে, আর ঘোড়ার দাঁতে ধুলোবালি লেগে আছে!”

বদর যুদ্ধে ইবলিস তার দলবল নিয়ে মুশরিকদের সাহায্যে নেমেছিল। সে সুরাকাহ ইবনে মালিকের আকৃতি ধারণ করে এসেছিল আর তার বাহিনী এসেছিল সুরাকাহ ইবনে মালিকের গোত্র বনু মুদলিজের আকৃতি ধারণ করে।

অপরদিকে মুশরিকরা সংখ্যায় ছিল মুসলিমদের তিনগুণ, তাই আল্লাহ তা’আলা খোদ ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলিমদের সাহায্য করেছেন।  হযরত জিবরাইল, মিকাইল ও ইসরাফিল, এই তিনজন জালিলুল ক্বদর ফেরেশতাদের নেতৃত্বে সেদিন ফেরেশতাগণ মানুষের আকৃতি ধারণ করে স্ব-শরীরে যুদ্ধ করেছেন। মুমিনদের সাহায্যে, বিশেষ করে তাদের মনোবল ঠিক রাখতে আসমান থেকে আল্লাহ তা’আলা পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছেন।

সূরা আল-ইমরানের ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

بَلٰۤی ۙ اِنۡ تَصۡبِرُوۡا وَتَتَّقُوۡا وَیَاۡتُوۡکُمۡ مِّنۡ فَوۡرِہِمۡ ہٰذَا یُمۡدِدۡکُمۡ رَبُّکُمۡ بِخَمۡسَۃِ اٰلٰفٍ مِّنَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ مُسَوِّمِیۡنَ.

“অবশ্য তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা যদি তখনই তোমাদের উপর চড়াও হয় তাহলে তোমাদের পালনকর্তা চিহ্নিত ঘোড়ার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা তোমাদের সাহায্যে পাঠাতে পারেন”।

ইকরিমা ইবনে আবু জাহল [২] বলেন, “ঐদিন আমাদের লোকদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যেত, অথচ দেখা যেত না কে মারল।” রাসূলের চাচা আববাস রাঃ, যিনি বাহ্যিকভাবে মুশরিক বাহিনীতে ছিলেন। হযরত উবাইদ ইবনে আউস আল আনসারী রাঃ তাকে বন্দী করে আনলে, তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এই ব্যক্তি আমাকে বন্দী করেনি। যে ব্যক্তি আমাকে বন্দী করেছেন, তাকে এখন দেখতে পাচ্ছি না। তিনি সুন্দর চেহারার মানুষ ছিলেন এবং বিচিত্র বর্ণের একটি সুন্দর ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। [৩]

পরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলা, যিনি ক্বাওমে লূতের মত বিশাল এক সম্প্রদায়কে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন শুধুমাত্র হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের একটি মাত্র পাখা দিয়ে, বদর যুদ্ধে তিনি  এতো অধিক সংখ্যক ফেরেশতা কেনো পাঠালেন? এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম কুরতুবী রাঃ (মৃত্যু-৬৭১ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে, কয়েকটি বরাতে দু’টি কারণ ব্যক্ত করেছেন।

১। যেহেতু এত বড় পরিসরে এটাই সর্বপ্রথম জিহাদ ছিল তদুপরি শত্রুদল সংখ্যায় ছিল মুসলিমদের তিনগুণ এবং অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত, তাই সাহাবায়ে কেরাম রাঃ ঈমানী বলে বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও বাহ্যিকভাবে তাদের ভেতর হতাশা ও হীনম্মন্যতা কাজ করাটা অস্বাভাবিক ছিল না। সেই আশঙ্কা দূরীভূত করে তাদের মনোবল দৃঢ় করতে ও অন্তরসমূহকে প্রশান্ত করতেই আল্লাহ তা’আলা এতো অধিক সংখ্যক ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। [৪]

২। যেনো কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর পথের মুজাহিদদের সাহায্যার্থে এই ফেরেশতাদের পাঠাতে পারেন। অর্থাৎ, তাঁদেরকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত মুজাহিদ হিসাবে নির্বাচন করেছেন। সুতরাং যে মুসলিম বাহিনীই যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্য ধারণ করবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করবে তাদের সাহায্যেই আল্লাহ তা’আলা এ সকল বদরী ফেরেশতাদের অবতীর্ণ করবেন এবং তাঁরা মুজাহিদদের সাথে মিলে কাফেরদের বিরুদ্ধে স্ব-শরীরে যুদ্ধও করবেন। সুবহানাল্লাহ!

প্রখ্যাত দাঈ ও মুজাহিদ, শাইখ আব্দুল্লাহ আযযাম (রাঃ) প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আফগান জিহাদে ঘটে যাওয়া কিছু অলৌকিক ঘটনার সমন্বয়ে একটি কিতাব রচনা করেছেন। যেটার নাম দিয়েছেন “আয়াতুর রহমান ফী জিহাদিল আফগান”(আফগান জিহাদে আল্লাহ তা’আলার নিদর্শনাবলী) [৫] উক্ত কিতাবে উল্লেখিত ঘটনাগুলো পড়লে বোঝা যায়, সে সকল বদরী ফেরেশতাদের আল্লাহ তা’আলা আফগান জিহাদেও অবতীর্ণ করেছেন। ইমাম কুরতুবির উক্ত ব্যাখ্যানুসারে এটা অসম্ভব কিছু না। সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই রাখেন!

উক্কাশা ইবনে মিহসানের হাতে গাছের ডাল তরবারিতে রূপান্তর

হযরত উক্কাশা ইবনে মিহসান (রাঃ) হাতের তরবারিটি দিয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তার তরবারিটি ভেঙে গেল। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার তরবারিটি ভেঙে গেছে। এখন আমি কী দিয়ে যুদ্ধ করব?? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে একটি গাছের ডাল তুলে দিয়ে বললেন, যাও উক্কাশা, এটা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাও!

উক্কাশা (রাঃ) বলেন, গাছের ডালটি দিয়ে আমি যখন যুদ্ধ শুরু করলাম, তখন এটি লম্বা হাতল ওয়ালা একটি ধারালো তরবারিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এটা দিয়ে যুদ্ধ করতে বলেছেন তখন এটা অসম্ভব কিছুই ছিল না।

চলবে, ইনশাআল্লাহ্‌…


 

নোট

[১] এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার দরবারে বিজয়ের জন্য কখন দোয়া করেছেন? তেরো বছরে কষ্ট করে যে কাফেলাকে তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন সেই কাফেলাটিকে কাফেরদের বিশাল এক বাহিনীর সামনে দাঁড় করিয়ে তবেই তিনি বিজয়ের জন্য দোয়ায় লিপ্ত হয়েছেন। সুতরাং, পাশের দেশের মুসলিমদের নির্যাতিত হতে দেখেও চুপ করে বসে থাকা; না আল্লাহর পথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া আর না লড়াইয়ের জন্য সামর্থ্যানুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করা; বরং শুধু দোয়ার মাধ্যমে জালিম কাফিরদের শক্তি খর্ব করার স্বপ্ন দেখা-কখনোই সীরাত ও বদরের শিক্ষা হতে পারে না! সীরাত ও বদরের শিক্ষা এটাই যে, সামর্থ্যের সবটুকু আল্লাহর সামনে পেশ করার পর বিজয়ের জন্য দোয়া করা।

[২] ইকরিমাহ ইবনে আবু জাহল বদর যুদ্ধে  পিতার সাথে শরীক ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলামের দৌলত লাভ করেন। ১৫ তম হিজরিতে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাত বরণ করেন। রাদিয়াল্লাহু আনহু।

[৩] এখানেও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। তা হলো, আল্লাহ তা’আলা আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলিমদের তখনই সাহায্য করেছেন, যখন তারা দ্বীনের জন্য মৃত্যুর সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে এসেছেন। মুসলিমরা নিশ্চিন্তে মদীনায় বসে থেকেছেন আর আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতা পাঠিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে বিজয় এনে দিয়েছেন-এমন ইতিহাস নাই। এটা আল্লাহ তা’আলার সুন্নাহ না।

সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হয়ে ঘরে বসে বসে শুধু দোয়ার মাধ্যমে জালিম-কাফিরকে পরাস্ত করার দৃষ্টান্ত যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে, তৎপরবর্তী সাহাবী ও তাবিঈদের সময়েই স্থাপিত হয়নি, তখন বর্তমান সময়ে এমন স্বপ্নে বিভোর থেকে জিহাদ পরিত্যাগ করার কী সুযোগ থাকতে পারে? শুধু দোয়া করেই নিজের দায়িত্ব শেষ ভাবার কী যুক্তি থাকতে পারে??

এখানে আরও আরেকটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গোটা জীবনের নির্যাস ঢেলে দিয়েছিলেন বদর যুদ্ধে। এখানে যারা ছিলেন তারাই রাসূলের সারা জীবনের মূল অর্জন। তাই এ যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হলে ইসলামের নাম-নিশানাও বাকি থাকবে না; ভূপৃষ্ঠ আর কখনোই আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত হবে না- এ সত্য কুরাইশরা যেমন বিশ্বাস করত, তেমনি বিশ্বাস করতেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও। এ জন্যই তিনি দোয়ার মধ্যে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, ইসলামের এই ছোট্ট জামাতটিকে যদি ধ্বংস করে দেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে আপনার গোলামী আর হবে না!”

এতকিছুর পরও তিনি কথিত হেকমতের দোহাই দিয়ে, দ্বীন মিটে যাবার অজুহাত তুলে জিহাদ পরিত্যাগ করেন নি। সুতরাং, সারা বিশ্বে যখন প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তখন “দ্বীন মিটে যাবে, মসজিদ-মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাবে”-এ জাতীয় খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করিয়ে জিহাদ পরিত্যাগ করা কীভাবে রাসূলের শিক্ষা হতে পারে? বদর আমাদেরকে এ ধরণের কাপুরষতার শিক্ষা দেয় না। দীর্ঘ কয়েক যুগের লড়াইয়েও আফগানিস্তানে দ্বীন মিটে যায়নি, মসজিদ মাদরাসাও বন্ধ হয়ে যায়নি, এখন পূর্বের চেয়ে বরং স্বকীয়তার সাথেই চলছে দ্বীনের তা’লীম-তারবিয়্যাত।

[৪] সূরা আল ইমরানের একটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা নিজেই এই উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন।

وَمَا جَعَلَہُ اللّٰہُ اِلَّا بُشۡرٰی لَکُمۡ وَلِتَطۡمَئِنَّ قُلُوۡبُکُمۡ بِہٖ ؕ  وَمَا النَّصۡرُ اِلَّا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَکِیۡمِ ۙ

 বস্তুত এর মাধ্যমে (বদর যুদ্ধে পাঁচ হাজার ফেরেশতা পঠানোর মাধ্যমে) আল্লাহ তা’আলা তোমাদের সুসংবাদ দান করলেন, যাতে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো আসে কেবল পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে। (সূরা আল ইমরান,আয়াত নং-১২৬)

[৫] বাংলা ভাষায় কিতাবটির অনুবাদ হয়েছে। অফলাইনেও হার্ড কপি পাওয়া যায় এবং অনলাইনেও সফট কপির পিডিএফ ফাইল পাওয়া যায়৷ আগ্রহী পাঠকগণ সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। আশা করি, অনেক ফায়েদা হবে ইনশাআল্লাহ।


লেখক :   মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির


 

আগের পর্বগুলো পড়ুন :

১। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-১ ||
সারিয়্যায়ে হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব: ইসলামের প্রথম যুদ্ধাভিজান
https://alfirdaws.org/2022/04/01/56426/

২। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-২ ||
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিজান [প্রথম কিস্তি]
https://alfirdaws.org/2022/04/05/56473/


 

তথ্যসূত্র

(১) আল কুরআনুল কারীম। (সূরা আল ইমরান ও সূরা আনফাল)

(২) সহীহ বুখারী। (কিতাবুল মাগাযী)

(৩) সীরাতে ইবনে হিশাম।

(৪) মাগাযিল ওয়াক্বিদী।

(৫) যাদুল মা’আদ।

(৬) তাফসীরে কুরতুবী।

(৭) সীরাতে মুস্তফা।

এ ছাড়াও সীরাত ও তারিখের উপর রচিত গ্রহণযোগ্য অন্যান্য কিতাব।

3 মন্তব্যসমূহ

  1. আলহামদুলিল্লাহ অনেক সুন্দর একটি শিক্ষা পেলাম আজকে
    তা হলো হুজুর সাঃ এবং কাফির রা ভালো করেই জানতেন আজকে মুসলমানদের হত্যা করা হলেই
    চিরতরে ইসলাম মিটে যাবে
    কিন্তু ইহার (ইসলাম মিটে যাবে) প্রতিকার হিসেবে
    হুজুর সাঃ জিহাদ কেই বেছে নিয়েছেন ।
    তাদের (কাফেরদের) সাথে নম নম হয়ে “আহারে আজকে যদি আমরা মৃত্যু বরণ করি তাহলে দিনের প্রচার কে করবে ” এ কথাগুলো বলে জিহাদ ছেড়ে দেননি

    কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি,যে আমরা এখন তার (ইসলাম মিটে যাবে ) প্রতিকার হিসেবে
    জিহাদ ছেড়ে দিয়েছি।

    আল্লাহ তাআলা আমাদের কে দিনের গভীর পাকাহাত দান করুন আমীন) ليتفقهو ا فى الدين

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন