বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ ||পর্ব-২|| ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [প্রথম কিস্তি]

0
878
বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ ||পর্ব-২|| ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয়াভিযান [প্রথম কিস্তি]

প্রারম্ভিকা:

বদর যুদ্ধ। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ও গুরুত্ব বিবেচনায় সর্ববৃহৎ যুদ্ধ। ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল এই যুদ্ধ। এর মাধ্যমেই ইসলামের ইতিহাস বিজয়ের দেখা পেয়েছিল। সেই সাথে কাফেরদের পরাজয় ও অপদস্ততারও সূচনা হয়েছিল এ যুদ্ধের মাধ্যমেই।

কুরাইশদের বড় বড় দাপুটে নেতারা সব, এ যুদ্ধেই নিহত হয়েছিল। আবু জাহল, উতবাহ, শাইবাহ, ওয়ালিদ ইবনে উতবাহ,উমাইয়াহ ইবনে খালফের মত প্রতাপশালী খ্যাতিমান বাহাদুররা বদর যুদ্ধেই নিহত হয়েছিল। বদরের পর কুরাইশদের নেতৃত্ব দেওয়ার মত শুধু আবু সুফিয়ান জীবিত ছিল, ফাতহে মক্কার সময় যার ইসলাম গ্রহণের তাওফীক হয়েছিল। মক্কার ১৩ বছরে কুরাইশদের নির্মম নির্যাতনের শিকার মুহাজির সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে প্রতিশোধের যে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল, তা এই যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রশমিত হয়েছিল।

এ ছাড়াও এ যুদ্ধ হক্ব ও বাতিলকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করে দিয়েছিল। কুরআনের ভাষায় বদরের দিনকে বলা হয়েছে “ইয়াউমুল ফুরক্বান” অর্থাৎ, হক্ব ও বাতিল আলাদা হওয়ার দিন। আরো বিভিন্ন কারণে বদর যুদ্ধ ইসলামী ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এক যুদ্ধ এবং এ বিজয় ইসলামী ইতিহাসের যুগান্তকারী এক বিজয়৷

আজকে আমরা তুলে ধরব বদর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, ইনশাআল্লাহ!

 

যুদ্ধের পটভূমি:

যেহেতু মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) নিজেদের বাড়ী-ঘর, ক্ষেত-খামার ও যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে একদম নিঃস্ব অবস্থায় মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তাই তাদের ফেলে আসা সমূহ সম্পত্তি কুরাইশরা দখল করে নেয়। ফলে তাদের আর্থিক অবস্থার তখন রমরমা অবস্থা।

কুরাশদের জীবন ছিল ব্যবসা-নির্ভর। বছরে দুই বা তিনবার কুরাইশরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফর করত।  হিজরতের পর মুহাজিরদের ফেলে যাওয়া সহায়-সম্পদকে অবলম্বন করে কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলা ঘনঘন সিরিয়া সফর করতে লাগল। ভৌগোলিকভাবে মদীনার অবস্থান ছিল মক্কা আর সিরিয়ার মাঝপথে।  মক্কার কোনো কাফেলাকে সিরিয়া যেতে হলে বা ফিরতে হলে অনিবার্যভাবেই মদীনার পাশ কেটে যেতে হত।

সাহাবায়ে কেরামের জন্য এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না যে, মক্কার কুরাইশরা তাদের-ই ফেলে আসা সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করবে এবং সে ব্যবসায়ী কাফেলা তাদের-ই নাকের ডগার উপর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাবে আর তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। উপরন্তু একটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি-ই হল অর্থ। সুতরাং যদি কুরাইশদের অর্থনীতির মূলে আঘাত করা যায়, তাহলে তাদের লম্ফঝম্প এমনি এমনিই বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য।

এরই মধ্যে পবিত্র কুরআনে জিহাদের বিধানও আসতে শুরু করেছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের জন্য তাদের ব্যবসায়িক কাফেলার উপর আক্রমণ করতে আর কোনো বাধা থাকল না। কুরাইশদের ব্যবসায়িক কাফেলা কখন সিরিয়া যায় আর কখন ফিরে, অতি সন্তর্পণে সে খবর নিতে থাকেন বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

 

আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া অভিমুখী বাণিজ্য কাফেলা:

দ্বিতীয় হিজরীর জুমাদাল উলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর পেলেন, সিরিয়া অভিমুখী কুরাইশদের একটি বড় বাণিজ্যিক কাফেলা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনার পাশ কেটে যাচ্ছে। উক্ত কাফেলায় কুরাইশদের অনেক মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী আছে। কালক্ষেপণ না করে দু’শ মুহাজির সাহাবীকে সাথে নিয়ে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা থেকে বের হলেন। যুল-উশাইরাহ নামক স্থান পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে জানতে পারলেন, আবু সুফিয়ানের কাফেলা কয়েকদিন পূর্বেই এ পথ অতিক্রম করে চলে গেছে। ফলে এ যাত্রা তাদের পথরোধ করা গেল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে জুমাদাল আখিরাহর শুরুর দিকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। কুরাইশদের এই পশ্চাদ্ধাবন ইতিহাসে “গাযওয়াতুল উশাইরা” নামে পরিচিতি পায়।

 

কুরাইশ বাহিনীর প্রত্যাগমন:

সিরিয়া অভিমুখী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক কাফেলা যদিও হাতছাড়া হয়েছিল, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চিত জানতেন যে, এ কাফেলা পুনরায় মদীনার পাশ দিয়েই ফিরবে। তাই কাফেলা ফিরে আসার সম্ভাব্য সময়ের কিছুদিন পূর্ব থেকেই কাফেলার খোঁজ-খবর নিতে থাকেন তিনি। তথ্য সংগ্রহের জন্য তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও সাইদ ইবনে যায়েদকে সিরিয়া অভিমুখে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। যেনো, মদীনার কাছে আসার পূর্বেই সিরিয়া প্রত্যাগত বাণিজ্যিক কাফেলার বিস্তারিত বিবরণ মদীনায় পৌঁছে যায়।

উক্ত দুই সাহাবী “হাওরা” নামক স্থানে পৌঁছে কুরাশদের ফিরে আসার অপেক্ষা করতে থাকেন। সিরিয়া প্রত্যাগত কাফেলাটি “হাওরা” নামক স্থানে পৌঁছলে তারা অতি সন্তর্পণে কাফেলার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে দ্রুত মদীনায় ফিরে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারেন, কাফেলাটিতে প্রায় এক হাজার উট, ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও সমমূল্যের মালামাল রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আছে, মাত্র ৪০ জন কুরাইশ সেনা। এটা দ্বিতীয় হিজরীর রমাদান মাসের শুরুর দিককার ঘটনা।

 

মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে ঘটনার বিবরণ শুনিয়ে বললেন, তোমরা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ কর। আল্লাহ চাইলে তোমরা গনীমতপ্রাপ্ত হয়ে ফিরবে। কিন্তু যেহেতু আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলায় মাত্র ৪০ জন সেনা ছিল, তাই কারো উপর কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। যারা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন তাদেরকে নিয়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ রমাদান মদীনা ত্যাগ করেন। সাথে ছিল ৩১৩/৩১৪ জনের একটি ছোট্ট জামাত। সর্বসাকুল্যে যাদের কাছে মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট ছিল। প্রত্যেক তিনজন এক একটি করে উটে পালাক্রমে আরোহন করে পথ চলছিলেন। সে হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলী ও হযরত মারসাদ ইবনে মারসাদ (রাঃ) এক উটে পালাক্রমে আরোহন করে পথ চলছিলেন।

বাহিনীতে মোট তিনটি পতাকা ছিল। মুহাজির ও আনসারদের জন্য ছিল দুটি কালো পতাকা। মু্হাজিরদের পতাকা বহন করছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। আনসারদের পতাকা ছিল হযরত সা’দ ইবনে মু’য়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে৷ আর সার্বিক নেতৃত্বের জন্য একটি সাদা পতাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুস’আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রদান করেছিলেন। পুরো বাহিনীকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে একেক দলের নেতৃত্ব একেক জনের উপর অর্পণ করা হলেও, সমগ্র বাহিনীর নেতৃত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হাতেই রেখেছিলেন।

 

মক্কার বাহিনী:

এদিকে ধূর্ত দলপতি আবু সুফিয়ান আঁচ করতে পেরেছিল যে, ফিরতি পথে তার কাফেলা পুনরায় মুহাম্মাদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হতে পারে৷ তাই রাস্তায় যাকেই দেখছিল তাকেই মুসলিম বাহিনীর কথা জিজ্ঞেস করছিল। এভাবে সে জেনে যায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাফেলাকে ধাওয়া করতে ইতিমধ্যেই মদীনা থেকে বেরিয়ে গেছেন। সাথে সাথেই সে যমযম ইবনে আমর গিফারীকে পারিশ্রমিক দিয়ে বার্তাবাহক হিসেবে দ্রুত মক্কায় পাঠিয়ে দিল। সে কুরাইশ বাহিনীকে জানিয়ে দিল, “তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা আক্রমণের মুখে। তোমরা যথাসম্ভব দ্রুত নিজেদের কফেলার খোঁজ নাও।”

খবর শোনার সাথে সাথে মক্কায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হল। তড়িঘড়ি করে ১৩০০ সৈনিকের একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করা হল৷ যাদের নেতৃত্বে ছিল কুরাইশ নেতা আবু জাহল। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত বাহিনীতে যোগ দিচ্ছিল। কেউ তো এ জন্য যোগ দিচ্ছিল যে, বাণিজ্যিক কাফেলায় তার মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। কেউ যোগ দিচ্ছিল সীমাহীন ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। কতক শুধু এ জন্যই যোগ দিচ্ছিল যে, তারা মনে করেছিল মুসলিম বাহিনী নিশ্চিত পরাজিত হবে৷ সুতরাং যুদ্ধটা ভালোই উপভোগ্য হবে। ব্যাতিক্রম ছিল শুধু উমাইয়া ইবনে খালফ। আবু জাহল কর্তৃক সীমাহীন পীড়াপীড়ির কারণেই সে যুদ্ধে বের হতে বাধ্য হয়েছিল।

কুরাইশদের বাহিনীতে অসংখ্য উট, ১০০ ঘোড়া ও ৬০০ লৌহবর্ম ছিল। গান-বাদ্যের জন্য গায়িকা ও নর্তকীদের সাথে নেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এ বাহিনী বদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

 

উমাইয়া ইবনে খালফের স্বতঃস্ফূর্ত যুদ্ধে শরীক না হওয়ার নেপথ্য কারণ:

ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে মদীনার আউস গোত্রের সর্দার সা’দ ইবনে মুয়াযের সাথে বেশ সখ্যতা ছিল উমাইয়া ইবনে খালফের। ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়ার যাত্রাপথে মদীনায় সা’দ ইবনে মুয়াযের বাড়ীতে মেহমান হত উমাইয়া ইবনে খালফ। তেমনিভাবে সা’দ ইবনে মুয়ায কখনো মক্কায় আসলে উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হতেন।

মদীনায় ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়লে মুস’আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ)। হিজরতের পর একবার সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) মক্কায় আসেন এবং উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হন। সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) উমাইয়ার সাথে বাইতুল্লাহর তওয়াফ করছিলেন, এমন সময় আবু জাহল উমাইয়াকে লক্ষ করে বলে, ‘কী, আবু সাফওয়ান!(উমাইয়ার উপনাম) সা’দ মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছে জান না? তবুও তুমি তার মেহমানদারি করছ? তাকে তওয়াফ করতে সাহায্য করছ?’

এরপর সেই নরাধম আবু জাহল সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ করে বলে, ‘হে সা’দ! আজকে তোমার সাথে  আবু সাফওয়ান না থাকলে তুমি নিরাপদে ফিরতে পারতে না।’ তখন সা’দ (রাঃ) চিৎকার দিয়ে বলেন, “তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ করতে না দাও, তাহলে আমি মদীনা থেকে তোমার সিরিয়া যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিব।” আবু জাহলের সামনে সা’দকে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে, উমাইয়া ধমকের স্বরে বলে,  ‘হে সা’দ! তুমি কি জান না সে মক্কার সর্দার? তার সামনে উচ্চস্বরে কথা বলছ!!’

এবার সা’দ (রাঃ) উমাইয়ার উপরেও ক্ষেপে যান, এবং বলেন, “চুপ কর হে উমাইয়া! খোদার ক্বসম, আমি রাসূলকে বলতে শুনেছি যে, তুমি আমাদের হাতেই নিহত হবে।” যেহেতু সবাই এটা বিশ্বাস করত যে, মুহাম্মাদ কখনো মিথ্যা বলেন না, তাই উমাইয়া সা’দের মুখে রাসূলের এ ভবিষ্যতবাণী শুনে খুব ঘাবড়ে যায় এবং মক্কা থেকে কোথাও বের না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। সুতরাং যখন সবাই বদর যুদ্ধে বের হচ্ছিল, তখন উমাইয়ার দিলে সা’দের মুখে শোনা সেই ভবিষ্যতবাণীর ভয় কাজ করছিল। তাই সে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল যুদ্ধে বের না হতে। কিন্তু মৃত্যু তাকে বদর পর্যন্ত নিয়েই ছেড়েছে।

 

বাণিজ্যিক কাফেলার নিরাপদে বিপদসীমা অতিক্রম:

কাফেলা-সালার আবু সুফিয়ান যমযম ইবনে আমর গিফারিকে মক্কায় পাঠিয়ে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে পথ চলছিল। বদরের নিকটবর্তী এক ঝর্ণার দ্বারে আবু সুফিয়ান মাজদী ইবনে আমর জুহানী নামক এক ব্যক্তির দেখা পায়। তাকে জিজ্ঞেস করে “এখানে কাউকে আসা-যাওয়া করতে দেখেছ?” মাজদী জানায়, কাউকে তো দেখিনি, তবে দু’জন উষ্ট্রারোহীকে ওই টিলার পাশস্থ ঝর্ণার কাছে দেখেছিলাম। তারা সেখানে নিজেদের উট বসিয়ে ঝর্ণা থেকে মশকে পানি পূর্ণ করছিল।

মাজদীর কথা শুনে আবু সুফিয়ান টিলার কাছে যায় এবং উটের গোবর পড়ে থাকতে দেখে। উটের গোবর ভেঙে ভেতরে খেজুরের বিচি দেখতে পায়। যেহেতু মদীনায় খেজুরের বাগান বেশি ছিল, তাই সে বুঝতে পারে এখানে যারা এসেছিল তারা নিশ্চয়ই মুহাম্মাদের বাহিনীর কেউ হয়ে থাকবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, মুহাম্মাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে আশপাশেই কোথাও আছে। ফলে সে যাতায়াতের সাধারণ রাস্তা পরিহার করে, বদরের উত্তর দিকে সমুদ্র উপকূলীয় পথ ধরে বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়৷ মাজদী আবু সুফিয়ানকে যে দু’জন উষ্ট্রারোহীর কথা বলেছিল, তারা ছিলেন বাসবাস ইবনে আমর জুহানী ও আদী ইবনে আবিয যাগবা আল জুহানী (রাঃ)। যাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছিলেন বাণিজ্যিক কাফেলার তথ্য সংগ্রহ করতে।

 

মক্কার বাহিনী থেকে বনু যুহরার প্রত্যাবর্তন:

আবু সুফিয়ান তার কাফেলাকে নিরাপদ স্থানে বের করে নিতে সক্ষম হয়। যেহেতু মক্কার বাহিনী শুধু বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাঁচাতে বের হয়েছিল, তাই আবু সুফিয়ান আবু জাহলের নিকট এই মর্মে বার্তা পাঠায় যে, তোমরা তো আমাদেরকে বিপদমুক্ত করার জন্যই বের হয়েছিলে, আমরা নিরাপদ স্থানে চলে এসেছি। সুতরাং তোমরা মক্কায় ফিরে যাও।

মক্কার বাহিনী যখন “জুহফা” নামক স্থানে অবস্থান করছিল, তখন তাদের কাছে আবু সুফিয়ানের এই বার্তা পৌঁছে। এই বার্তা পাওয়ার পর আবু জাহল দম্ভভরে বলে, আমরা বদর উপত্যকায় তিনদিন আমোদ-প্রমোদ না করে মক্কা ফিরে যাব না। কিন্তু বনু যুহরার সর্দার আখনাস বিন শারীক তার গোত্রকে লক্ষ করে বলে, তোমরা তো তোমাদের সম্পদ বাঁচানোর জন্যই যুদ্ধে বের হয়েছিলে। তোমাদের সম্পদ আল্লাহ বাঁচিয়েছেন, তাই চলো আমরা ফিরে যাই। তার সাথে একমত পোষণ করে গোটা বনু যুহরা মক্কায় ফিরে যায়৷

এরপর মক্কার বাহিনীতে ১,০০০ সৈনিক বাকী ছিল। পরবর্তীতে আখনাস বিন শারীক উক্ত সিন্ধান্তের জন্য নিজ গোত্রে খুব প্রশংসিত হয়েছিল। একই কারণে বনু হাশেমও ফিরে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আবু জাহলের ক্রোধের সামনে তারা বদরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর আবু জাহল তার বাহিনী নিয়ে বদর উপত্যকার একটি টিলার পেছনে অবস্থান গ্রহণ করে।

 

বদর অভিমুখে মুসলিম বাহিনী:

আবু সুফিয়ানের পেছনে ধাওয়া করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাফরা নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন জানতে পারলেন, আবু সুফিয়ান তার কাফেলা নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে। কিন্তু আবু জাহলের নেতৃত্বে মক্কার একটি সশস্ত্র  বাহিনী যুদ্ধের জন্য বদর প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মুসলিম বাহিনীতে মুহাজির সাহাবী ছিলেন ৮২ জন আর আনসার সাহাবী ছিলেন ২৩১ জন।

মক্কার বাহিনীর সংবাদ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত পরামর্শ সভা ডাকলেন। অবস্থার বিবরণ তুলে ধরে করণীয় জানতে চাইলেন৷ যদিও সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এত বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দূরতম কোনো সম্ভাবনা নিয়ে বের হননি এবং সেরকম কোনো প্রস্তুতিও নিয়ে আসেননি। তদুপরি এই মুহূর্তে যুদ্ধ না করে মদীনায় ফিরে যাওয়াটা ছিল কাপুরুষতার পরিচায়ক। কাফেররা এতে আরো বেশি উগ্র হয়ে উঠতে পারে। এমনকি সাহস পেয়ে মদীনাতেও আক্রমণ করার সিন্ধান্ত  নিতে পারে।

তাছাড়া শত্রুকে এতটা কাছে রেখে মদীনায় ফিরে যাওয়াটা অঘোষিত যুদ্ধের ময়দান থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনের নামান্তর। এ কারণে গোটা আরবে ইসলামের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল। যারা ইসলাম গ্রহণ করা না করার মাঝে দোদুল্যমান ছিল তারা মুসলিমদের এই কাপুরুষতাকে অজুহাত বানিয়ে ইসলাম গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যুদ্ধ না করার কোনো বিকল্প ছিল না।

কিন্তু সমস্যা ছিল আনসার সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)।  কারণ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদীনার ভেতরে নিরাপত্তা প্রদানের অঙ্গীকার করেছিলেন। মদীনার বাহিরে এসে যুদ্ধ করতে তারা বাধ্য ছিলেন না৷ আর এই ৩১৩ জনের মধ্যে ২৩১ জন-ই হলেন আনসার সাহাবী।

তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মতামত জানার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন। “তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও, আমি কী করব?” হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমরা আপনার সাথে জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে প্রস্তুত আছি। আপনি বদরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় একই প্রশ্ন ছুড়লেন। এবার হযরত উমর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের পরামর্শ দিলেন।

কিন্তু না, রাসূল আবারও একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। এবার দাঁড়ালেন হযরত মিকদাদ (রাঃ)। তিনি বল্লেন, হে আল্লাহর রাসূল!  আমরা বনী ইসরায়েলের মত বলব না যে, আপনি আর আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে আছি। বরং আমরা বলব, আপনি আর আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সঙ্গে আছি। তাঁর এই বক্তব্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত হন। কিন্তু আনসারদের কেউ কিছুই বলছে না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন।

এবার আনসারদের সর্দার হযরত সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) দাঁড়িয়ে বল্লেন, হে আল্লাহর রাসূল!  আপনি সম্ভবত আনসারদের মতামত জানতে চাচ্ছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি নাতিদীর্ঘ একটি বক্তব্য পেশ করলেন। যার শেষাংশে তিনি বললেন, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্রেও ঝাপিয়ে পড়তে বলেন, তাহলেও আমরা বিন্দুমাত্র পিছু হটব না। আপনি বদর অভিমুখে রওয়ানা হোন, আমরা আপনার সাথে আছি। এই বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারপরনাই আনন্দিত হন এবং বলেন, “আল্লাহর নামে বদরের দিকে রওয়ানা হও এবং বিজয়ের সুসংবাদ গ্রহণ করো। আবু সুফিয়ান বা আবু জাহল, এই দুই বাহিনীর কোনো এক বাহিনীর উপর আল্লাহ তা’আলা আমাকে বিজয়ী করার অঙ্গীকার করেছেন। কাফেরদের, কে কোন স্থানে মারা যাবে সে স্থানও আমাকে দেখানো হয়েছে।”
মুসলিম বাহিনী বদর অভিমুখে কুচ করলেন।

 

যুদ্ধের ময়দান:

বদর উপত্যকায় যেহেতু মুশরিকরা আগে পৌঁছেছিল তাই পানির অংশ এবং শক্ত মাটির অংশ তারা দখল করে নিয়েছিল। এদিকে মুসলিম বাহিনী এসে দেখে তাদের জন্য বালুকাময় অংশটি খালি পড়ে আছে৷ তাদের অংশে পানিরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অগত্যা তাঁরা সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করে।

এতে করে  তাদের দ্বিমুখী সমস্যায় পড়তে হয়। একে তো পানির পিপাসা, অপরদিকে নরম বালুর কারণে চলাচলে অসুবিধা।  কিন্তু আল্লাহর কী ইচ্ছা, হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ হলো। কাফেরদের শক্ত মাটি পিচ্ছিল হয়ে চলাফেরা কষ্টকর হয়ে গেল। অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর বালু জমে শক্ত হয়ে গেল। তারা বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি দিয়ে পাত্র ভরে রাখলেন এবং ছোট ছোট চৌবাচ্চা তৈরী করে স্বচ্ছ পানি মজুদ করে রখলেন।

 

বদর যুদ্ধে প্রথম প্রাণহানি:

বৃষ্টির পানি সঞ্চয় করতে সাহাবীগণ ছোট ছোট চৌবাচ্চা তৈরী করেছেন। নিজেদের যাবতীয় প্রয়োজন সারতেই তাঁরা এমনটি করেছেন। এ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে আসওয়াদ ইবনে আবুল আসাদ আল মাখযুমি নামক এক কুরাইশ সেনা প্রতিজ্ঞা করে, হয়তো মুসলিমদের পানি দখল করবে না হয় নিজের জীবন উৎসর্গ করবে। এই ঘোষণা দিতে দিতে সে এগিয়ে আসে।

তার এই ঘোষণা শুনে রাসূলের চাচা হযরত হামজা (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হন। প্রথম আঘাতেই আসওয়াদের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধপাস করে পড়ে মাটিতে। কার পাল্লায় পড়েছে এতক্ষণে বোঝা শেষ, কিন্তু সময় ফুরিয়ে গেছে। এখন কিছুই করার নেই। তাই যখন বুঝতে পারল হামজার সাথে পেরে উঠবেনা, তখন পানির চৌবাচ্চার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে থাকল।  উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুর পূর্বে নিজের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করা। কিন্তু হামজা তাকে সে সুযোগটাও দিলেন না। সেখানেই তার জীবন উৎসর্গ করার শখ মিটিয়ে দিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে এটিই ছিল বদর যুদ্ধে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।

চলবে… ইনশা আল্লাহ।


 

লেখক :   মুফতি আব্দুল্লাহ মুনতাসির


 

আগের পর্ব পড়ুন :

১। বিজয়ের মাস: মাহে রমাদানের গৌরবদীপ্ত বিজয়-সিরিজ || পর্ব-১ ||
সারিয়্যায়ে হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব: ইসলামের প্রথম যুদ্ধাভিজান
https://alfirdaws.org/2022/04/01/56426/


 

তথ্যসূত্রঃ

(১) সহীহ বুখারী।

(২) সীরাতে ইবনে হিশাম।

(৩) যাদুল মা’আদ।

(৪) সীরাতে মুস্তফা।

এ ছাড়াও সীরাতের প্রায় সকল গ্রন্থেই এই যুদ্ধের বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন