কথিত লাভ জিহাদের মনগড়া অভিযোগে মুসলিম ব্যক্তির বাড়িঘর-দোকানপাটে হিন্দুত্ববাদীদের হামলা

মাহমুদ উল্লাহ

0
654
কথিত লাভ জিহাদের মনগড়া অভিযোগে মুসলিম ব্যক্তির বাড়িঘর-দোকানপাটে হিন্দুত্ববাদীদের হামলা

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ডিন্ডোরি গ্রামে আসিফ খানের পরিবারের বাড়ি এবং দোকানে বুলডোজার দিয়ে ভাঙ্গচুর ও হামলা চালিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। হামলার আগে হিন্দুত্ববাদীরা আসিফ খানের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালানোর জন্য খোলামেলা আহ্বান জানিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ই এপ্রিল। ২৪ বছর বয়সী আসিফ ২২ বছর বয়সী সাক্ষী সাহুর কাছ থেকে একটি ফোন কল পেয়ে তাকে জানায় যে তার বাবা-মা তাকে আসিফের কাছ থেকে দূরে রাখতে তাকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠাচ্ছে। কারণ সে সত্য বুঝে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে।

পরেই সুযোগ বুঝে মেয়েটি আসিফের কাছে আশ্রয় নেয়। এ খবর গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং আসিফের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীরা বিক্ষোভ শুরু করে। হিন্দুত্ববাদীরা একে কথিত লাভ জিহাদের নাম দিয়েছে।

৫৭ বছর বয়সী আসিফের বাবা আব্দুল হালিম বলেছেন, “আমি আমার দোকানে ছিলাম তখন সাক্ষীর ভাই আমার কাছে এসে আমাকে বলে যে সাক্ষী আমার ছেলে আসিফের সাথে পালিয়ে গেছে।”

উভয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরও হিন্দুত্ববাদী পুলিশ আসিফের ও তার আত্মীয়দের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। আসিফের বিরুদ্ধে ৩৩৯ ধারায় এবং ৩৬০ ধারায় অন্যায়ভাবে মামলা দায়ের করেছে।

আসিফের বাবা আব্দুল হালিম আরো বলেছেন, “আমি তাদের দুজনের সাথে ফোনে কথা বলেছিলাম এবং তাদের সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে তাদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাক্ষী বলেছে যে, তারা ফিরে আসছে না। এবং যদি আমরা তাদের বাধ্য করি, তাহলে সে আত্মহত্যা করবে বা ট্রেনের সামনে নিজেকে ছুঁড়ে ফেলবে।” তিনি আরো বলেন, একজন পুলিশ আধিকারিকও সাহুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়।

কয়েকদিন আসিফের পিতা আব্দুল হালিম সাহেবকে পুলিশ আটকে রাখে। পরে বাড়িতে ফিরে আশেপাশে হিন্দুত্ববাদীদের তোড়জোড় দেখে বুঝতে পারেন যেকোন সময় তাঁদের উপর হামলা হবে। তাই ভয়ে পরিবারের লোকেরা পারিবারিক বাড়িটি ছেড়ে চলে যায়।

আব্দুল হালিম বলেন, “হঠাৎ করেই আমি জানতে পারলাম যে হিন্দুত্ববাদী কর্তৃপক্ষ আমার তৈরি করা বাড়িটি ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন যে প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্য তার বাড়ি ঘেরাও করেছিল। ক্র্যাকডাউন আরোপ করে রেখেছিল। এমনকি ধ্বংস সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবেশীদেরকেও তাদের বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। “আমি এই বাড়িটি করতে আমার কষ্টে উপার্জন করা প্রতিটি পয়সা দিয়েছিলাম।”

তাদের বাড়ির পাশাপাশি, ডিন্ডোরি জেলা হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন একটি অনলাইন পরিষেবা কেন্দ্র, একটি মুরগির দোকান এবং একটি চায়ের স্টল সহ খানের পরিবারের তিনটি দোকান ভেঙে দিয়েছে।

সম্প্রতি, হিন্দুত্ববাদীরা বিজেপির অধিনে থাকা রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের দোকান ও বাড়ি ভাঙতে বুলডোজার ব্যবহার করছে। ফলে এটি এখন ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির প্রকাশ্য বৈষম্যের প্রতীক হয়ে উঠছে।

গৃহহীন হয়ে পড়া আব্দুল হালিম অস্থায়ী বাসস্থান ও নিরাপত্তার খোঁজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেছেন, “এই হঠাৎ অসহায়ত্ব এবং বাড়ি হারানো এমন কিছু যা আমরা কল্পনাও করিনি। আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, মানুষ আমাদের জীবন নাশের অপেক্ষা করছে। “আমি মনে করি না এর চেয়ে খারাপ কিছু ঘটতে পারে।”

মুসলিম পরিবারটি ধ্বংসের পরে, সাহুর একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে, যা নিশ্চিত করে যে সে স্বেচ্ছায় আসিফ খানকে বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছিল।

আব্দুল হালিম বলেন, “হাইকোর্ট ওই দম্পতিকে আদালতে বিয়ের অনুমতি দিয়েছে। এ সবের জন্য আমার প্রায় ৩ লক্ষ ভারতীয় রুপি খরচ হয়েছে এবং আমি মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এটি পরিচালনা করেছি।…সেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সাক্ষী তার নিজের ইচ্ছায় আমার ছেলেকে বিয়ে করেছে, কিন্তু হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা এটা সহ্য করতে পারে না।”

সমস্ত কিছু ধ্বংসের পরেও, আব্দুল হালিম শুধুমাত্র তার ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত এবং বিশ্বাস করে যে তারা ধরা পড়লে, আসিফকে হয় জেলে পাঠানো হবে বা হত্যা করা হবে এবং সাক্ষীকে তার পিতামাতার কাছে বাড়িতে পাঠানো হবে।

“ভারতের কথিত সংবিধান অনুযায়ী, আসিফ বা তার পরিবার কোনো অপরাধ করেনি। সাক্ষী স্বেচ্ছায় আসিফের সাথে বসবাস করছে।

তিনি আরো বলেছেন, “অনুচ্ছেদ ৯০-এ, একজন ব্যক্তিকে ১৮ বছরের বেশি বয়সী হলে তারা কার সাথে থাকতে চায় তা বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়।” “যেহেতু এখানে কোনো জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন নেই এবং তাই লাভ জিহাদের কোনো ঘটনা নেই।”

তবুও হিন্দুত্ববাদীদের জিঘাংসার শিকার হতে হলো এই মুসলিম পরিবারটিকে। আসলে ভারত এখন চলছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ইচ্ছামাফিক, তারা আইনের কোন ধার ধারছে না। আর প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থাও আংশিক বা পুরোপুরি হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাবে চলে গেছে।

সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় মুসলিমদেরকে তাই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার দিকে মনোনিবেশ করতে বলেছেন ইসলামি চিন্তাবীদগণ।


 

প্রতিবেদক :   মাহমুদ উল্লাহ


 

তথ্যসূত্র:
——–
1. MP: Marriage with Hindu woman leaves a Muslim family miserable
https://tinyurl.com/5n9ah499
2. ‘Love Jihad’ and conversion discussed at Bajrang Dal arms training event in Karnataka
https://tinyurl.com/6ca26w6r

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন