রাসুল ﷺ-কে অবমাননায় জেগে উঠেছে আরব বিশ্ব, হিন্দুত্ববাদীরা নিষ্ক্রিয় হবে কি?

0
350

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মুখপাত্র নুপুর শর্মা এবং মিডিয়া সেলের প্রধান নবীন জিন্দাল প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সহধর্মিণী আয়েশা (রাদি.) সম্পর্কে চরম অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় উত্তরপ্রদেশের কানপুরে, হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দল ‘বিজেপির’ মুখপাত্র নুপুর শর্মা একটি টেলিভিশন প্রোগ্রামে ইসলাম ধর্ম এবং প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে নিয়ে কটূক্তি করে। এই ঘটনা এককালের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার পাওয়া ভারতের প্রকৃত হিন্দুত্ববাদী চেহারা এবং ইসলাম বিদ্বেষ প্রচারে রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতের ক্ষমতাসীন সন্ত্রাসী দল বিজেপির মুখপাত্র নুপুর শর্মা মুসলমানদের অযু এবং হজ নিয়ে উপহাস করেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের এই সন্ত্রাসবাদী মুখপাত্র এখানেই থেমে থাকেনি, বরং সে মুসলমানদের প্রাণের স্পন্দন প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর মিরাজ নিয়ে ঠাট্টা করেছে এবং সর্বশেষ্ঠ এই মানবকে নিয়ে প্রকাশ্যে অপমানজনক মন্তব্য করেছে।

এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতের মুসলিমরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেও ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার তাতে পাত্তা দেয়নি। বরং মুসলিমদের উপর হামলা চালায় হিন্দুত্ববাদী পুলিশ। ২০জনেরও অধিক মুসলিমকে আটক করেছে তারা। অগণিত মুসলিমদের নামে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলাও দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু দু’দিন আগে কাতারের দোহাতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি মুখপাত্রের বক্তব্য নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলার পর নরেন্দ্র মোদীর সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে।

এরপর কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব থেকে শুরু করে এক ডজনেরও বেশি মুসলিম দেশ একে একে ক্ষোভ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সেসকল দেশের মুসলিমরাও তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ জানিয়েছেন। তারা ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, প্রকাশ্যে। এরই মধ্যে কুয়েতে দোকানপাটে ভারতীয় পণ্য বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে।

সুন্নী ইসলামের অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান মিশরের আল আজহার আল-শরীফ তাদের এক বিবৃতিতে নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার বক্তব্যকে “সন্ত্রাসী আচরণের” সঙ্গে তুলনা করে বলেছে যে এমন আচরণ “পুরো বিশ্বে ভয়াবহ সংকট তৈরির উস্কানি”।

ভারত নিয়ে এসব শক্ত বিবৃতি আরব বিশ্বের সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও মূলধারার প্রায় সব মিডিয়াতে প্রকাশ পাচ্ছে। এর ফলেই মূলত আরব বিশ্বের তাওহিদবাদীরা এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে, পণ্য বয়কটসহ ভারতীয় হিন্দু কর্মীদের ছাটাই করে দেয়। মোদি ও শর্মার ছবিতে জুতার ছাপ দিয়ে ময়লার গাড়িতে লাগিযে দেয় তাঁরা। এভাবে তাঁরা প্রিয়নবীর প্রতি তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটান।

কুয়েতের আরদিয়া কো-অপারেটিভ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, “মুসলমান হিসেবে আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা মেনে নিতে পারি না। কারণ মুসলিমদের কাছে প্রিয়নবীর সম্মান নিজের জীবনের চেয়েও মূল্যবান।”

তবে হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকার এই জঘন্য অপরাধীদের কোন বিচার করেনি তারা, শুধুমাত্র লোকদেখানো বহিষ্কার করেছে তাদেরকে দল থেকে। এমনকি, উল্টো এখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়িশা (রা.)-কে নিয়ে কটুক্তিকারী বিজেপি মুখপাত্র নূপুর শর্মাকে কড়া নিরাপত্তা দিচ্ছে দিল্লির হিন্দুত্ববাদী পুলিশ। মঙ্গলবার (৭ জুন) থেকে এই নেত্রীকে কড়া নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।

আরব শাসক ও হিন্দুত্ববাদীদের প্রকৃত ন্যারেটিভ :

আরব বিশ্বের ক্ষোভকে বছরের পর বছর ধরে বিজেপির মুসলিম এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ব্যাখ্য করেছেন বিশ্লেষকগণ।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী বিভিন্ন ন্যারেটিভ চালু করে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিতর চেষ্টা করে চলেছে। ভারতে কেন্দ্র এবং রাজ্য পর্যায়ে বিজেপি এবং দলের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কট্টর হিন্দু গোষ্ঠীর নেতা-কর্মীরা ক্রমাগতভাবে মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস, জীবন-জীবিকা টার্গেট করে বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে চলেছে, যার জেরে গত আট বছরে বহু সহিংসতা-হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হিন্দুত্ববাদীদের হাতে খুন হয়েছেন অগণিত মুসলিম।

নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে মে মাস থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র আড়াই বছরে গো-রক্ষার নামে কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের হামলায় ভারতে কমপক্ষে ৪৪ জন মুসলিম খুন হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারও তেমন হয়নি বললেই চলে; বিজেপি নেতারাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব হামলার পক্ষে সাফাই গেয়েছে।

ভারতে বিগত বছরগুলোতে গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা এবং মাংস বহনের সন্দেহে পিটিয়ে মারার বহু ঘটনা সহ স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধ করার মত ঘটনা নিয়ে আরব বিশ্বে মানুষজন তাদের সরকারের ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেনি, তবে এবার সোশ্যাল মিডিয়াতে আর অসন্তোষ চেপে রাখেননি তারা।

গত আট বছরে বিজেপির মধ্যে এক ধরণের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে, শক্তি অর্জন করলে কেউই কিছু করতে পারবে না। কিন্তু এ ঘটনার পর বিপাকে পড়েছে ভারত। কারণ ভারতের তেল-গ্যাসের সিংহভাগই আসে এই সব অঞ্চল থেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোতে অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মূলত ভারত উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সাথে ২০২০-২০২১ সালে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮৭ বিলিয়ন (৮,৭০০ কোটি) ডলার। লাখ লাখ ভারতীয় এসব দেশে কাজ করে, এবং এরা কোটি কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে পাঠায়। যদি আরবরা সকল কর্মীদের ফেরত পাঠিয়ে দেয় তাহলে ভারতের রেমিটেন্স প্রবাহ মাঠেই মারা যাবে।

ইসলামিক চিন্তাবিদগন বরেছেন, আরব বিশ্ব যদি আগেই হিন্দুত্ববাদীদের চাপ দিত, তাহলে তারা মুসলিমদের উপর এতােটা নির্যাতন করার সাহস পেতো না।

আসলে নবীকে নিয়ে এক বিজেপি মুখপাত্রের বক্তব্য এবং আরেক মুখপাত্রের টুইট নিয়ে আরব বিশ্বে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতেই। পরে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। এরপরেই হয়তো চাপের মুখে সরকারগুলো এক এক করে মুখ খুলছে। গত আট বছরে ভারতে মুসলমানদের দুর্দশা ক্রমাগত বাড়লেও সৌদি আরব, কাতার, ইউএই’র মত প্রভাবশালী দেশের গাদ্দার শাসকরা তা নিয়ে টু শব্দও করেনি। এ সময়ে বরঞ্চ মোদী সরকারের সাথে আরব এই শাসকদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

এমনকি, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খর্ব করে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার পরও বাকি বিশ্বের মত এসব আরব মুসলিম দেশ কোনও কথাই বলেনি, যা নিঃসন্দেহে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে।

এই পর্যায়ে এসে বিজেপি, তাদের মাতৃসংগঠন আরএসএস এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনসমূহ প্রকাশ্যে মুসলিম গণহত্যার ডাক দিচ্ছে; হিন্দুদেরকে অস্ত্র কিনে মজুদ করার আহ্বান জানাচ্ছে; মিয়ানমারের মতো মুসলিমদের উপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর ডাক দিচ্ছে; সাধারণ হিন্দুদেরকেও মুসলিম গণহত্যায় শামিল করতে কাশ্মীর ফাইলস-এর মতো সিনেমার প্রচার-প্রচার করছে; উগ্র সাধু-সন্ন্যাসীরা তীব্র বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে হিন্দুদের উত্তেজিত করছে; মুসলিমদেরকে অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করছে, হিজাব ও নামাজের মতো ইবাদতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে; একে মসজিদ ও মুসলিম স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে; মসজিদে মূর্তি স্থাপন ও পূজা করার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে; লাভ জিহাদ ও গো-হত্যার নামে মুসলিমদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে; – এমন পরিস্থিতিতে নুপুর ও জিন্দাল তাদের নেতাদের ইশারা ছাড়াই এমন কাজ করেছেন বলে মানতে নারাজ বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে যখন মুসলিম গণহত্যার মঞ্চ পূর্ণরূপে প্রস্তুত, সেই মুহূর্তে হিন্দুত্ববাদী ভারত শেষ প্রস্তুতি হিসেবে উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যএর মুসলিমদের নার্ভ পরীক্ষা করে নিতে চাইছে; এই উদ্দেশ্যেই তারা নুপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালকে দিয়ে নবী অবমাননার ঘটনা ঘটিয়েছে। এখন হয়তো তারা তাদের চূড়ান্ত কৌশল ঠিক করবে। আর নুপুর ও জিন্দালকে বহিষ্কার করে তারা আপাতত আরব বিশ্বকে ঠাণ্ডা করতে চাইছে; এরপরেই তারা হয়তো নতুন কৌশলে আগাবে। আর আরব শাসকদের এই ক্ষোভ যে কেবলই লোক দেখানো, সে ব্যপারেও উম্মাহকে সজাগ করেছেন ইসলামি চিন্তাবীদগণ।

আবার ইসলামি চিন্তাবীদদের কেউ কেউ আরবের গাদ্দার শাসকদের চরিত্র বিশ্লেষণপূর্বক এমন সম্ভাবনার কথাও বলেছেন যে, তারা হয়তো তাদের মিত্র হিন্দুত্ববাদী ভারতের বিরুদ্ধে তাদের নিজ নিজ জনগণের ক্ষোভকে প্রসমিত করার জন্যেও কিছুটা করা বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে থাকতে পারে। এই ফাঁকে জনগণের কাছেও তাদের ইমেজ কিছুটা উন্নত হল। এছাড়া তারা কেনই বা তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে এমন করা ভাষা প্রয়োগ করতে যাবে, যখনে তারা নিজেদের বাজার ভারতের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন; যেখানে  কেউ কেউ আবার আরব ভূখণ্ডে মন্দির নির্মাণ এবং হিন্দুয়ানী শিরকী পুরাকাহিনী পড়ানোর ব্যবস্থাও করে রেখেছে।

তাই বলা যায়, হিন্দুত্ববাদীরা ইসলাম ও মুসলিমদের নির্মূল করার মিশন থেকে সহসাই নির্লিপ্ত হবে না। যদি না মুসলিমরা সত্যিই জেগে উঠে এবং নববি মানহাজ অনুযায়ী গো-মূত্রপানকারী হিন্দুত্ববাদী সম্প্রদায়ের বিষদাঁত নির্মূল করার প্রয়াস চালায়।


লেখক :   উসামা মাহমুদ

সংকলক :   আব্দুল্লাহ বিন নজর


 

তথ্যসূত্র:

1. After Qatar, Kuwait, Iran summon Indian envoy over remarks against prophet
https://tinyurl.com/2p92eerd
2. Qatar summons Indian ambassador over derogatory comments against prophet Muhammed
https://tinyurl.com/ybdc3rh6
3. BJP’s Nupur Sharma booked for derogatory comments about Prophet Mohammad
https://tinyurl.com/tx8jn4xc
4. মহানবী (স.)-কে অবমাননার জের; কুয়েতের সুপার স্টোর থেকে সরিয়ে ফেলা হলো ভারতীয় পণ্য
https://tinyurl.com/6dskd8v9
6. ইসলামের নবীকে নিয়ে বিজেপির দুই নেতার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ মুসলিম বিশ্ব
https://tinyurl.com/29nfum84
6. নূপুর শর্মা: ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতি কি মুসলিম বিশ্বে ভারতের স্বার্থ ঝুঁকিতে ফেলছে?
https://tinyurl.com/4wwtuc66

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন