সীমান্তে খুন হওয়া বাংলাদেশিদের সবাইকে অপরাধী বলে হিন্দুত্ববাদী বিএসএফ মহাপরিচালকের ধৃষ্টতা

1
471

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তসন্ত্রাসী হিন্দুত্ববাদী বাহিনী অসংখ্য বাংলাদেশী মুসলিমদেরকে গুলি করে খুন করছে। সীমান্তে সংযত আচরণে হিন্দুত্ববাদী ভারতের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশিদের খুন করা ঘটনা বেড়েই চলেছে। যুদ্ধাবস্থা ছাড়া কথিত বন্ধু দাবি করা দুই দেশের সীমান্তে এরকম প্রাণহানি অস্বাভাবিক, অমানবিক। অথচ, বাংলাদেশের গাদ্দার প্রশাসন এব্যাপারে হিন্দুত্ববাদী ভারতকে কোন চাপ দিতে পারেনি।

গত ২১ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে পিলখানাস্থ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনের পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের করা প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক(ডিজি) হিন্দুত্ববাদী পঙ্কজ কুমার সিং বলেছে, গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের সবাই অপরাধী। আর তাদের কথিত জুডিশিয়াল সিস্টেমে কোনো অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলতে পারে না- এ কথা সে নিজে স্বীকার করেছে।

তাহলে সীমান্তে গুলিতে নিহত বাংলাদেশিরা সবাই অপরাধী কি ভাবে বললো? একটা দেশে এসে সে দেশের মানুষকে অপরাধী বলা কুটনীতির কোন পর্যায়ে পড়ে? দেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা নতজানু হলে বাংলাদেশে বসেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী’র প্রধান খুনের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সাহস পায়! অথচ,অপরাধী ধরে নিলেও তো গুলি করে খুন করার অধিকার নেই।

দুদেশের মধ্যে সমঝোতা এবং এ সম্পর্কিত চুক্তি অনুযায়ী যদি কোনো দেশের নাগরিক অননুমোদিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে তা অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা এবং সেই মোতাবেক ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের নিয়ম। গুলি করে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা কেন?

সীমান্তে যে কোনো অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে অপরাধীদের কথিত বিদ্যমান আইনে বিচার হবে এবং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। ভারত বারবার বলেছে, তারা সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না। কিন্তু পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, তাতে তাদের এই বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ছে।

গত ১৭ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার পিলখানায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে ৫২তম সীমান্ত সম্মেলনে যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আবারো সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছে দুদেশের সীমান্ত বাহিনী। প্রতি বছর সীমান্ত সম্মেলনে হত্যার বিষয়টি আলোচিত হলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায় না।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সীমান্তে ২০২ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৩৮ জন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সীমান্তে মারা গেছেন পাঁচজন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ জন। ২০২০ সালে ছিল ৪৯ জন। ২০১৯ সালে সীমান্তে নিহত হয় ৩৫ বাংলাদেশি। ২০১৮ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল তিনজন। ২০১৭ সালে ২২ জন। ২০১৬ সালে ৩১ ও ২০১৫ সালে ৪৫ জন নিহত হয়। এই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে কেবল ২০১৮ সালে সীমান্তে হত্যার ঘটনা দুই অঙ্কের নিচে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ওই বছর সরকারি হিসাবে তিনজন হত্যার শিকার হন। ওই সময়ে সীমান্তের পরিবেশও ছিল স্বস্তিদায়ক। অথচ পরের বছরই তা এক লাফে ১৩ গুণ বেড়ে যায়। অথচ বিভিন্ন সময় ভারতীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার নীতিতে কাজ করা হবে। সীমান্ত হত্যা রোধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেয়া হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই।

‘সীমান্তে হত্যার শিকার ব্যক্তিদের কিসের ভিত্তিতে অপরাধী বলছে বা তাঁদের শরীরের ওপরের অংশে গুলি লাগার পরও কেন এটা টার্গেটেড কিলিং হিসেবে গন্ন হবে না- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক সঠিক কোন উত্তর দিতে পারে নি।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতে বিএসএফ আত্মরক্ষার জন্য হত্যা করে। কিন্তু, বাস্তবতা তা বলে না।

বেশ কয়েক বছর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) ‘ট্রিগার হ্যাপি’ নামে একটি প্রতিবেদনে এ ধরনের বেশ কয়েকটি মামলার উল্লেখ করেছে। যাতে বেঁচে যাওয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন যে বিএসএফ তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা না করে বা সতর্ক না করেই নির্বিচারে গুলি চালায়। বিএসএফ আরও দাবি করেছে যে দুর্বৃত্তরা গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের সদস্যরা গুলি চালায়। তবে কোনও অপরাধের সন্দেহে প্রাণঘাতি অস্ত্রের ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত হয় না।

এইচআরডাব্লিউ, অধিকার ও এএসকের প্রতিবেদন এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, অপরাধী হিসেবে সীমান্তে হত্যার শিকার ব্যক্তিরা হয় নিরস্ত্র থাকে অথবা তাদের কাছে বড়জোর কাস্তে, লাঠি বা ছুরি থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিঠে গুলি করা হয়েছিল।

এইচআরডাব্লিউ আরও উল্লেখ করেছে, তদন্ত করা মামলার কোনোটিতেই বিএসএফ প্রমাণ করতে পারেনি যে হত্যার শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া গেছে; যার দ্বারা তাদের প্রাণ সংশয় বা গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

সুতরাং, বিএসএফের মেরে ফেলার জন্য গুলি চালানোর দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় ও কথিত আন্তর্জাতিক আইনেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর এই মুসলিমবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি কেবল মাত্র মারাঠা বর্গিদের সাথেই মিলে। মারাঠা বর্গিদের এই উত্তরসূরিরা ২০১৮ সালে যেখানে সীমান্তে হত্যা করেছে ১১ জন মুসলিমকে, সেখানে ২ বছরের ব্যবধানে ২০২০ সালেই তা চারগুণ বেড়েছে। মোটকথা খুনের পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ঐ তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকারের সবুজ সংকেত ছাড়া এভাবে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার কথা নয়।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে সাবেক BDR মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএলএম ফজলুর রহমান বলেছেন, “ভারত মনে করে যে বাংলাদেশের কোন নাগরিককে সীমান্তে হত্যা করলে তাদের কিছু হবে না।… কাশ্মীর সীমান্তে যে BSF সদস্যরা থাকে, তাদেরকেই সরাসরি নিয়ে এসে বাংলাদেশ সীমান্তে এনে দেওয়া হয়।”

সারা দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এ প্রশ্নে তাই একমত যে, বন্ধু রাষ্ট্রের গালগল্প ভুলে কেবল ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাংলাদেশের সরকার বাধ্য করতে পারলেই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভম! কারণ এদেশের রাজনৈতিক নেতারা তো হিন্দুত্ববাদীদের দালাল হিসেবেই কাজ করছে।



প্রতিবেদক :  উসামা মাহমুদ



তথ্যসূত্র :

১. সীমান্তে গুলিতে নিহত বাংলাদেশিরা সবাই অপরাধী: বিএসএফ মহাপরিচালক
https://tinyurl.com/2p88k4k3
২. ‘২০২১ সালে বাংলাদেশ সীমান্তে ২৪৪ বার গুলি চালিয়েছে বিএসএফ’
৩. বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা
https://tinyurl.com/4zyj437c
৪. সীমান্তে হত্যা বেড়েই চলছে—আবারও বিএসএফের গুলিতে নিহত দুই বাংলাদেশি যুবক
https://tinyurl.com/3fb4py2z

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন