কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা || পর্ব-৭ || আশিক হুসাইন মাসুদি হত্যা

0
566

১৯৯২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হিন্দুত্ববাদী বিএসএফ বাহিনীর চারটি ব্যাটালিয়ন কাশ্মীরের শ্রীনগরের নারওয়ারা এলাকায় অভিযান শুরু করে। অভিযানের উদ্দেশ্য একটাই- স্বাধীনতাকামীদের খুঁজে বের করে তাদের খুন করা। এজন্য তারা এলাকার সমস্ত মুসলিমদের একটি ঈদগাহে জড়ো হবার নির্দেশ দেয়।

দখলদার সৈন্যরা ‘ম’ (ছদ্দনাম) এবং তাঁর ভাই আশিক হুসাইন মাসুদির (১৯) বাড়িতে এসে তাদের বাইরে বের হতে বলে। আশিক ও তাঁর ভাই বাইরে বের হলে তাদের বাড়িতে তল্লাশি চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। ‘ম’ (আশিকের ভাই) এশিয়া ওয়াচকে বলেন,

“আমি সেই ঈদগাহ মাঠে ছিলাম। প্রথমে বিএসএফের পাঁচটি গাড়ির সামনে এক এক করে লাইন দিয়ে সবাইকে প্যারেড করানো হয়। প্রথম শনাক্তকরণে পাঁচজন মুসলিমকে বাছাই করে তারা। এরপর দ্বিতীয় শনাক্তকরণের সময় আমি আশিককে তাদের গাড়ির সামনে যেতে দেখি। একটি সবুজ গাড়ির সামনে নিয়ে তাঁর পরনের ফেরানটি (কাশ্মীরিদের এক ধরণের কাপড়) মাথার উপর টেনে তাঁকে গাড়িতে তুলে নেয় সেনারা। এরপর রাত ১০টার দিকে আমাদের চলে যাওয়ার অনুমতি দেয় তারা।”

নারওয়ারার আরেক বাসিন্দা ‘জ’ (ছদ্মনাম) ১৯৯২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিকেল ৩টার দিকে তাঁর বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। তখন তিনি দখলদারদের পাঁচটি গাড়ি তাঁর বাসা থেকে প্রায় ২৫ ফুট দূরে অবস্থিত একটি স’মিলের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখেন। এরপর যা ঘটে সে ব্যপারে তিনি এশিয়া ওয়াচকে বলেন,

“সেনারা সবাই সেই স’মিলে ঢুকেই শ্রমিকদের বের করে দেয়। এরপর প্রায় আট থেকে দশজন সেনা ফেরান দ্বারা আচ্ছাদিত একটি ছেলেকে তার মাথা ধরে টেনে নিয়ে যায় মিলের ভেতর। ছেলেটিকে মিলের ভেতরে নেবার পর আমি করাত মেশিনের আওয়াজ পেলাম। এবং সেই সাথে আওয়াজ পেলাম প্রচণ্ড চিৎকারের। এর কিছুক্ষণ পরই সবকিছু নিরব হয়ে গেল। তখন বাজে প্রায় সাড়ে ৩টা। এরপর বিকেল ৫টার দিকে সেনারা চলে গেলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে সেই মিলে যাই। গিয়ে দেখি সেখানে পড়ে আছে আশিকের মৃতদেহ। তার ডান হাত প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, তার ঘাড়ে একটি গভীর ক্ষতের দাগ এবং তার মুখের কোণে রক্ত জমাট হয়ে গেছে।”

এভাবেই বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি মুসলিমদের খুন করে আসছে দখলদার হিন্দুত্ববাদীরা। কাশ্মীরে যখন যাকে খুশি তাকেই খুন কিংবা ধর্ষণ করে এরা। কারণ এরা জানে যে, কাশ্মীরি মুসলিমদের খুন কিংবা ধর্ষণ করলে তাদের কারও কাছে কোন জবাবদিহি করতে হবে না। উল্টো রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের দেওয়া হবে সম্মাননা ও পদমর্যাদা। দেশরত্ন খেতাবে ভূষিত করে তাদের “বীরত্ব” প্রচার করা হবে হিন্দুত্ববাদী মিডিয়ায়।



অনুবাদক ও সংকলক :  আবু-উবায়দা



 

তথ্যসূত্র:

বইঃ
হিউম্যান রাইটস ক্রাইসিস ইন কাশ্মীর (The Human Rights Crisis in Kashmir) [Pg: 50-51];
প্রথম প্রকাশিতঃ জুন ১৯৯৩

প্রতিবেদনকারীঃ
এশিয়া ওয়াচ (হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি বিভাগ) এবং ফিজিশিয়ান্‌স ফর হিউম্যান রাইটস (পিএইচআর)



আগের পর্বগুলো পড়ুনঃ

১। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা ।। পর্ব-১।। চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি
https://alfirdaws.org/2022/09/24/59437/
২। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-২।। ধর্ষণ যাদের সংস্কৃতি
https://alfirdaws.org/2022/09/25/59476/
৩। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা || পর্ব-৩ || নাসরুল্লাহপুরার হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/09/28/59560/
৪। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৪।। সাফাকাদাল হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/04/59692/
৫। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৫।। সোপোর হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/12/59884/
৬। কাশ্মীরে দখলদার হিন্দুত্ববাদীদের অপরাধনামা।। পর্ব-৬।। শ্রাবালা হত্যাকাণ্ড
https://alfirdaws.org/2022/10/21/60088/

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন