
নিজস্ব পণ্য উৎপাদন, দেশীয় কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে আফগান পণ্যের প্রবেশ বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশজুড়ে শিল্পনগরী গড়ে তুলছে ইমারাতে ইসলামিয়া। বালখ, বাগলান ও কুন্দুজে বৃহৎ পরিসরের শিল্পনগরী ও শিল্পপার্ক নির্মাণের মাধ্যমে শিল্পপতিদের জন্য কারখানা স্থাপনের সুযোগ, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উৎপাদন সম্প্রসারণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ইমারাতে ইসলামিয়ার অর্থনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী মৌলভী আব্দুল গনি বারাদার আখুন্দ হাফিযাহুল্লাহ এসব প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
একটি শিল্পনগরী শুধু কারখানা স্থাপনের জন্য জমি নয়। এখানে শিল্পকারখানা পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিভিন্ন সেবা এবং বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ থাকে। আফগানিস্তানে কৃষি, খনিজ ও প্রাণিসম্পদের বিপুল সম্পদ থাকলেও এসব কাঁচামালকে শিল্পপণ্যে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো সীমিত। দেশে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে পণ্যের মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানির চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বালখে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা
বালখে প্রায় ১০ হাজার ৮৭২ একর জমিতে ‘ইমাম শাকিক বলখি’ শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বালখের হাইরাতান বন্দর। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে হাইরাতানকে শুধু বিদেশি পণ্য আমদানির পথ নয়, আফগানিস্তানের নিজস্ব পণ্য রপ্তানির পথ হিসেবেও গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বারাদার হাফিযাহুল্লাহ।
এর জন্য মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, প্রতিযোগিতামূলক দাম, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন। এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে হাইরাতানকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তানের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাগলানে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ
বাগলানে প্রায় ৮৩০ একর জমিতে ‘কুতাইবা ইবনে সাঈদ বাগলানি’ শিল্পপার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। বারাদার হাফিযাহুল্লাহ অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করা।
বাগলানের শিল্পপার্কে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মানুষের আয় বৃদ্ধির পথও তৈরি হবে।
কুন্দুজে বহুমুখী শিল্পকেন্দ্র
কুন্দুজে ৪ হাজার ৯৪২ একর জমিতে ‘আবদুর রহমান ইবনে সামুরাহ’ শিল্পপার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে বস্ত্র, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণসামগ্রী এবং লোহা ও ইস্পাতসহ বিভিন্ন খাতের শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পকারখানার পাশাপাশি মসজিদ, হাসপাতাল, ব্যাংক, বিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কুন্দুজের এই শিল্পপার্ক উত্তর আফগানিস্তানে উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন
আফগানিস্তানের সামনে বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং সীমিত শিল্পভিত্তির মতো বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিল্পপার্কে শুধু কারখানাই গড়ে ওঠে না; এর সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন, প্যাকেজিং, বিপণন ও যন্ত্রপাতি মেরামতের মতো বহু ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তৈরি হয়।
বস্ত্রশিল্পের বিকাশ হলে তুলা ও কাপড়ের বাজার সম্প্রসারিত হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য আরও ভালো বাজার তৈরি করতে পারে। একইভাবে ওষুধ ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন বাড়লে এসব পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তরুণদের জন্য শুধু কর্মসংস্থান নয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং ব্যবসার সুযোগও প্রয়োজন। শিল্পপার্কের সঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির পথ আরও শক্তিশালী হবে।
ইমারাতে ইসলামিয়ার শিল্পনগরীভিত্তিক এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নতুন কারখানা স্থাপন নয়; বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রপ্তানিকে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। বালখ, বাগলান ও কুন্দুজের নতুন শিল্পনগরীগুলো কার্যকরভাবে গড়ে উঠলে দেশীয় শিল্পের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এসব শিল্পনগরী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন ভিত্তি তৈরি করবে। ধারাবাহিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশীয় শিল্প শক্তিশালী হলে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর বাজার থেকে আরও উৎপাদনমুখী ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
তথ্যসূত্র
1. The Foundation of Industrial Afghanistan: From Economic Self-Sufficiency to a Bright Future
– https://tinyurl.com/3yrx55c2


