ভারতে সেপ্টেম্বরে শতাব্দী-প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদসহ অন্তত ছয়টি মসজিদে উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের বুলডোজার অভিযান

0
0

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ছয়টি মসজিদ সম্পূর্ণ বা আংশিক বুলডোজারে ভেঙে দিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। এগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত শতাব্দী-প্রাচীন মসজিদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিগত মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে সবচেয়ে বেশি মসজিদ ভাঙার খবর পাওয়া গেছে। ২০২৮ সালে উজ্জয়িনীতে সিমহস্থ কুম্ভমেলা নামে হিন্দুদের একটি বড় ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই অজুহাতে সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে অন্তত তিনটি মসজিদ আংশিক নির্মূল করা হয়েছে।

এছাড়া সরকারি জমি দখল, অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মাণ প্রভৃতি ভিত্তিহীন অজুহাত তুলে আরও বেশ কয়েকটি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে।

১. শাহী জামে মসজিদ, উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ; অভিযানের তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে অবস্থিত শাহী জামে মসজিদ প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। ২০২৮ সালে হিন্দু ধর্মীয় সমাবেশের অজুহাত দেখিয়ে মসজিদটি আংশিক নির্মূলের টার্গেট করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন।

অভিযানের আগে স্থাপনাটি রক্ষার্থে মসজিদের ভিতরে ও বাইরে শত শত মুসলমান অবস্থান গ্রহণ করে। ২৮ সেপ্টেম্বর অভিযান শুরু হওয়ার পর ঘটনাস্থলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

মসজিদের বাইরের দিকে প্রায় তিন ফুট অংশ সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও অভিযানকালে একটি মিনার অকস্মাৎ মসজিদের ভিতরের দিকে ভেঙে পড়ে। এতে মসজিদের অভ্যন্তরীণ অংশও উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মিনার ভেঙে পড়ার ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করেছে প্রশাসন। অপরদিকে এ ঘটনাকে হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা।

২. শালিমার বাগ মদিনা মসজিদ, দিল্লি; অভিযানের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে দিল্লির শালিমার বাগের প্রায় তিন দশক পুরোনো মদিনা মসজিদের একাংশ ভেঙ্গে দেয় দিল্লি পৌর কর্পোরেশন (এমসিডি)। এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। প্রশাসনের দাবি, মসজিদটির ভেঙে ফেলা অংশ অবৈধ দখলের আওতায় পড়েছিল।

অভিযান পরিচালনার সময় (মধ্যরাত) ও পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসলমানরা। মসজিদটি রফিক-ই-মিল্লাত ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হতো। তাই উক্ত ট্রাস্ট এমসিডির নোটিশের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করে।

সমাজকর্মী নাদিম খান বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর আদালতে শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওই দিন হিন্দুত্ববাদী সরকার পক্ষের আইনজীবী অনুপস্থিত থাকায় শুনানি হয়নি। কিন্তু এরপরের রাতেই তড়িঘড়ি করে মসজিদে বুলডোজার পাঠানো হয়।

৩. নির্মাণাধীন মসজিদ, ফরিদাবাদ, হরিয়ানা; অভিযানের তারিখ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হরিয়ানা রাজ্যের ফরিদাবাদ পৌর কর্পোরেশনের আওতাধীন গণপতি কলোনিতে একটি নির্মাণাধীন মসজিদ বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। পৌর কর্মকর্তাদের দাবি, অনুমোদিত নকশা ছাড়া স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছিল।

অপরদিকে স্থানীয় মুসলমানরা এই উচ্ছেদের বিরোধিতা করেন। তারা জানান, স্থাপনাটি প্রায় ১৫ বছর ধরে সেখানে ছিল।

বাস্তবতা হলো, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বজরং দলের কর্মীরা উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে মসজিদ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদকারী মুসলিম নারী, হিন্দুত্ববাদী পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় কয়েকজন মুসলিম নারীকে মারধর করা হয়, এমনকি তাদের পোশাকও ছিঁড়ে দেওয়া হয়।

৪. হুসামি মসজিদ, উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ; অভিযানের তারিখ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৮ সালের সিমহস্থ কুম্ভমেলা আয়োজনের প্রস্তুতি ও সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে উজ্জয়িনীতে অবস্থিত হুসামি মসজিদের একটি অংশ ভেঙে দেয় হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসজিদের সড়ক সংলগ্ন প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ ফুট অংশ সড়ক সম্প্রসারণের অজুহাতে ভেঙে দেওয়া হয়।

৫. কালেক্টরেট জামে মসজিদ, সাহারানপুর, উত্তর প্রদেশ; অভিযানের তারিখ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে অবস্থিত প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ বুলডোজার গুঁড়িয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।

কর্মকর্তাদের প্রমাণবিহীন দাবি, সরকারি জমিতে মসজিদটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের সাবেক প্রাদেশিক সমন্বয়ক বিকাশ ত্যাগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মসজিদটি নির্মূলের আইনি প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়।

২০২৬ সালের ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটি সরিয়ে ফেলার প্রথম নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানা করা হয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটি এ আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করে। তাদের দাবি, জমিটি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মালিকানাধীন ছিল। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর জেলা আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন। এর তিন দিন পর প্রশাসন মসজিদটি ভেঙে ফেলে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতের আদেশে স্থাপনাটি অবিলম্বে ভেঙে ফেলার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল না। এরপরও তড়িঘড়ি করে মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই মসজিদটি বিদ্যমান থাকার প্রমাণ মিলেছে। কমিটি তাদের দাবির পক্ষে ১৯১১ সালের নথি দেখিয়েছে। নথিগুলো প্রমাণ করে যে, মসজিদটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেখানে রয়েছে।

৬. মদিনা মসজিদ, উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ; অভিযানের তারিখ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৮ সালের হিন্দুদের সিমহস্থ কুম্ভমেলার প্রস্তুতির অজুহাতে উজ্জয়িনীর কে. ডি. গেটের কাছে মদিনা মসজিদের একাংশ ভেঙে ফেলে স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন।

পৌর কর্মকর্তা ও বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে এ অভিযান চালানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসজিদটির বয়স প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ বছর।

সমালোচকদের অভিযোগ, ভারতে মসজিদ ধ্বংসের পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক অভিযান নয়; বরং মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করে পরিচালিত বৃহত্তর কাঠামোগত দমন-পীড়নের অংশ।

সরকারি জমি দখলের অজুহাতগুলো হিন্দুত্ববাদীদের নিজেদের বানানো উদ্দেশ্য-প্রণোদিত আইনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিবাদকারী মুসলিমদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে, আরও রয়েছে মসজিদ উচ্ছেদকে ঘিরে প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ।


তথ্যসূত্র:
1. https://tinyurl.com/yw6bfcvx

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধবুরকিনা ফাসোয় একদিনে দুটি মিলিশিয়া ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন জেএনআইএম প্রতিরোধ যোদ্ধারা