কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান এবং আমাদের করনীয়!

1
704

আমরা যদি আজ আমাদের শত্রু-মিত্রকে চিনতে না পারি, তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করি, তাহলে জেনে রাখুন শত্রু বাহিনী আমাকে আপনাকে পরাভূত করতে খুব বেশি সময় নিবে না। আমরা জেগে উঠার আগেই তারা নিজেদের মনজিলে পৌঁছে যাবে, তখন আমাদের হা-হুতাশ কোন কাজেই আসবেনা। তাই, এখনই আমাদেরকে নিজেদের শত্রু-মিত্র চিনতে হবে, বুঝতে হবে কে প্রকৃতপক্ষে আমার ভালো চায়, আর কে আমার ধ্বংস কামনা করে।

বর্তমানে আমি যদি কাশ্মীর ইস্যুতে আপনাদেরকে প্রশ্ন করি যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনটি আমাদের সবচাইতে বড় শত্রু?  তখন নিশ্চয়ই আপনার উত্তর হবে ভারত। আর এই উত্তরটার সাথে আমিও একমত। আমরা যদি কুরআন-সুন্নাহ থেকে আমাদের শত্রুকে চিহ্নিত করতে যাই, তখন দেখবো পবিত্র কুরআনও এমনটিই বলে, কারণ পবিত্র কুরআন মুসলিমদের শত্রুর ক্ষেত্রে ইহুদিদের পরেই মুশরিকদেরকে চিহ্নিত করেছে। আর বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী মুশরিক প্রধান দেশ হল ভারত। তাই ভারত আমাদের প্রকাশ্য শত্রু, এতে কোন সন্দেহ নেই। কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারে, কিন্তু যারা দ্বিমত পোষণ করবে তারা হল- সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের ভাষায় নব্য রাজাকার, যারা পূর্বের রাজাকারদের চেয়েও আমাদের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। ভারত যে আমাদের শত্রু এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন নেই, কারণ নব্য রাজাকার ছাড়া সচেতন প্রতিটি মুসলিম এক বাক্যে এ কথাকে মেনে নিতে বাধ্য।

 

এবার আসুন, মুসলিম নামধারী আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা মুনাফিক শত্রুগুলোকে চিনি! এখানে এসে হয়তো অনেকেই আমার বিপক্ষে চলে যাবেন।  কিন্তু এটা বাস্তব সত্য যে, মুনাফিক শ্রেণির লোকেরা আমাদের শিকড় কাটছে এবং আমাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়ার পথকে মুশরিকদের জন্য সহজ করে দিচ্ছে।

এ বিষয়টি সহজে বুঝার জন্য আমি কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

১) কাশ্মীর পাকিস্তানের মুনাফিক শাসকগোষ্ঠীর অপরাজনীতির বলি। আপনি আমার সাথে একমত হোন বা না হোন এটাই বাস্তব সত্য। এ রাষ্ট্র কখনোই মুসলিমদের অভিভাবক ছিলো না। কারণ এই রাষ্ট্রটির ব্রিটিশদের দালাল মুনাফিক শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে, আর তা এখনো করছে। আমরা যদি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়ের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো- পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ইসলামি রাষ্ট্র ও কুরআনী বিধান প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে, এর পিছনে সবচাইতে বড় অবদান রাখেন আলেম সমাজ। যখন পাকিস্তানী রাজনীতিবিদরা আলেম সমাজকে এ কথার উপর প্রতিশ্রুতি দিল যে, পাকিস্তান হবে ইসলামি রাষ্ট্র যার সংবিধান হবে পবিত্র আল-কুরআন। আলেমরা এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর জনগণকে বুঝাতে থাকেন যে, আমাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ইসলাম। এতে সাধারণ মানুষ আলেমদের ডাকে সাড়া প্রদান করেন এবং পাকিস্তান নামক নতুন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জোরদার দাবি উঠতে থাকে। অবশেষে পৃথিবীর বুকে পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এরপর সম্মানিত আলেমগণ শাসকগোষ্ঠীকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বললেন। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী তা রক্ষা করেনি,  বরং অনেক আলেমকে গোপনে শহিদ করে দেয় এবং ইংরেজদের রেখে যাওয়া সংবিধানকেই নিজেদের রাষ্ট্রের বুনিয়াদ বানিয়ে নেয়। ইতিহাস স্বাক্ষী, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহু উচ্চ পদস্থ সদস্য ছিল ইংরেজদের প্রকাশ্য দালাল। [বিস্তারিত জানতে এই লিংকের লেখাটি পড়তে পারেন-  https://bit.ly/30s4uUd ]

২) রুশ বাহিনী আফগানিস্তানে মুজাহিদদের কাছে লাঞ্চনাকর পরাজয়বরণের পর আরব ও আফগান মুজাহিদরা কাশ্মীর নিয়ে ভাবতে শুরু করেন এবং এর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপও তারা গ্রহণ করে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এখানেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো পাকিস্তান। কেননা সে সাম্রাজ্যবাদপ্রসূত রাষ্ট্র, ইসলামের অনুসারী মুসলিমদের জন্য নয়।

৩) এরপর আফগানিস্তানে আসলো ক্রুসেডার আমেরিকা। কিন্তু আফগানিস্তানে অভিযান চালানোর জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল এক ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের, এর জন্য তাদেরকে খুব বেশি খোঁজাখুজি করতে হয়নি। তারা সহজেই পেয়ে যায় পাকিস্তান নামক তাদের কাংক্ষিত সেই মিত্র দেশটিকে। পাকিস্তান ক্রুসেডারদের জন্য সকল কিছু (বিশেষ করে আকাশপথ) উন্মুক্ত করে দেয়, আর ক্রুসেডাররা পাকিস্তানের সহায়তায় আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেয়।

৪) পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহারকারী ক্রুসেডার মার্কিন বাহিনীর উপর হামলা করার জন্য আল-কায়েদা ও তালেবান তাদের দক্ষ কমান্ডার হাকিমুল্লাহ মেহসুদকে পাঠায় পাকিস্তানে, তিনি এখানে এসে গঠন করেন তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান। তারা সফলভাবে পাকিস্তানে মার্কিনীদের উপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে দুর্বল করতে থাকেন। অতঃপর পাকিস্তানের মুনাফিক শাসকগোষ্ঠী আলোচনার নামে এক প্রতারাণা মূলক বৈঠকে ডাকে পাকিস্তানে তালেবান প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদকে, তিনি এতে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু বৈঠকের পর ফেরার পথে হাকিমুল্লাহ মেহসুদকে ড্রোন হামলার মাধ্যমে শহিদ করে দেয় এই মুনাফিকরা। [এ বিষয়ে আরো কিছু জানতে পড়ুন- https://telegra.ph/kashmir-e-mujahideen-08-23]

৫) কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে থাকে পাকিস্তান, স্বাধীনতাকামী গ্রুপগুলোকে এই শর্তে পাকিস্তান সমর্থন দিতে থাকে যে, তারা পাকিস্তানের অনুমতি ছাড়া ভারতে কোন অভিযান চালাতে পারবেনা,  অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর এ কারণেই কাশ্মীরি স্বাধীনতাকামীরা কমান্ডার জাকির মূসা রহিমাহুল্লাহ এর নেতৃত্বে “আনসার গাজওয়াতুল হিন্দ” নামে নতুন দল গঠন করেন। আনসার গাজওয়াতুল হিন্দ পাকিস্তানী গাদ্দার শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থেকে কাশ্মীরে জিহাদ করে যাচ্ছেন।

৬) কিছুদিন পূর্বে ভারতীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর একটি বাসে সফলভাবে হামলা চালায় কাশ্মীরি মুক্তিকামীরা। এরপর পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট “ইমরান খান” এক ভিডিও বার্তায় মুসলিম হত্যাকারী মোদিকে লক্ষ্য করে বলে- পুলওয়ামা হামলায় আপনি যেমনিভাবে ব্যথিত হয়েছেন তেমনি আমিও ব্যথিত হয়েছি, আসুন আমরা একসাথে এই সন্ত্রাসীদেরকে দমন করি! তাছাড়া, সাংবাদিকের সাথে এক সাক্ষাতকারে ইমরান খান বলেছে, ‘‘আমরা ইতিমধ্যেই কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গী সংগঠনগুলো ধ্বংস করতে কাজ শুরু করে দিয়েছি। এদের মধ্যে জইশে মুহাম্মদও রয়েছে। আমরা তাদের মাদ্রাসা ও তাদের অধীনস্ত অন্যান্য সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। তাদের সামরিক সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করতে এটা আমাদের প্রাথমিক পদক্ষেপ।’’ [ভিডিও দেখুন – https://bit.ly/33QXSAS , https://bit.ly/2Zmusv1 ]

 

কাশ্মীরের সবচাইতে জনপ্রিয় তাওহীদের ভিত্তিতে স্বাধীনতাকামী দল আনসার গাজওয়াতুল হিন্দের শহীদ আমীর জাকির মূসা রহিমাহুল্লাহ হিন্দুত্ববাদী সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত অবস্থায় তাঁর শাহাদাতের পূর্বে দেওয়া এক বক্তব্যে পাকিস্তানের ব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলেন। সেখানে তিনি যা বুঝাতে চেয়েছেন তা মোটামুটি এমন, ‘যখনই ভারত পাকিস্তানের কোন স্বার্থে আঘাত হানে, পাকিস্তান তখন সর্বাত্মক সচেষ্ট হয়ে ভারতের পাল্টা জবাব দেয়। কিন্তু, কাশ্মীরের মুসলিমরা বহু বছর যাবৎ ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতিত হলেও পাকিস্তান সে ব্যাপারে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। যতটুকু পদক্ষেপ নিলে তাদের স্বার্থ রক্ষায় সেইটুকুতেই সীমাবদ্ধ স্বার্থান্বেষী এই দালাল গোষ্ঠী।’

এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, পাকিস্তান কেবলই তার ব্যক্তিগত, অনেক সময় শুধু শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য লড়াই করে। মুসলিমদের জান-মালের ব্যাপারে তারা যত্মশীল নয়।

তাদের রাষ্ট্র মানে স্বার্থবাদের ক্লাব, নানা ডিপ্লোম্যাটিক গেইমের  আঁতুড়ঘর। এ পর্যন্ত কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তান যা করেছে তা তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আর গেইমের বাইরে এক চুলও এদিক ওদিক ছিল না।

এ প্রাচীর ভাঙ্গতে হবে তাওহীদের দৃঢ় আঘাতে। যেখানে সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে শরীয়াত, দালাল শাসকগোষ্ঠী নয়। আর, বর্তমানে সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন কাশ্মীরের আল-কায়েদা শাখা আনসার গাজওয়াতুল হিন্দের মুজাহিদগণ। এই দলের শহীদ আমীর কমান্ডার জাকির মূসা রহিমাহুল্লাহ ছিলেন সেই স্বাধীনচেতা ব্যক্তি যিনি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সেনাদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন, তবে রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ। যা আজ অনুপ্রেরণা জোগায় লাখো কাশ্মীরির হৃদয়ে। একদিন জাকির মূসা, ইলিয়াস কাশ্মীরি আর আফজাল গুরুদের দেখানো পথে হেঁটে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবে কাশ্মীরি মুসলিমরা। তাদের ঈমানের উত্তপ্ততা আগুন জ্বালাবে তাগুতের অন্তরে। হিন্দুত্ববাদীদের প্রাসাদে প্রবল বেগে আঘাত হানবে তাদের তাকবির ধ্বনি। ধ্বসে পড়বে শয়তানের রাজ, ছিনিয়ে আনবে আজাদী, বিইযনিল্লাহ।


লেখক: ত্বহা আলী আদনান

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন