মেঘনার ভাঙনে দিশেহারা মানুষ, নেই সরকারি ত্রাণ

0
343
মেঘনার ভাঙনে দিশেহারা মানুষ, নেই সরকারি ত্রাণ

নরসিংদীর রায়পুরায় চরাঞ্চলে গত তিনদশকে মেঘনার ভাঙনে চাঁনপুর ইউনিয়নের ইমামদিরকান্দি গ্রামটি পুরো বিলীন হয়ে গেছে। এতে চার শ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। সর্বশেষ এই গ্রামে ১৫টি পরিবারের বসতি ছিলো। চার দিনের টানা ভাঙনের মানচিত্র থেকে গ্রামটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে চরমধুয়া ইউনিয়নের বীরচরমধুয়া ও শ্রীনগর ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রাম।

ইমামদিরকান্দির এককালের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান, ফজলু মিয়া, আলকাছ মিয়া ও ফারুক মিয়া জানান, তাদের ঠিকানা এখন মেঘনার ওপারে জেগে ওঠা চরে। মেঘনা তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারি সহযোগিতা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। চরের খাসজমি বন্দোবস্তর পেলে ওই চার’শ পরিবারের পুনর্বাসন ব্যবস্থা হতো।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত চারদিনে শ্রীনগরের পলাশতলী গ্রামে একটি মসজিদসহ ত্রিশটি বাড়িঘর মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছ। একই পরিস্থিতি চরের আরো দুই ইউনিয়নে। চাঁনপুরে ১৫টি বাড়িঘরসহ ইমামদিরকান্দি গ্রামটি পুরো বিলীন হয়ে গেছে। একই ইউনিয়নের কালিকাপুর ও সদাগরকান্দি গ্রামে ২৫টি বসতভিটা ও অনেক ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। চরমধুয়া ইউনিয়নের বীরচরমধুয়া গ্রামে নতুন করে ২০টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে গ্রামটির একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রাইমারি স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ও ঈদগাঁ। গত বছর চরমধুয়া ও বীরচরমধুয়া দুটি গ্রামের এক’শ পরিবার মেঘনার ভাঙনে গৃহহীন হয়েছেন। প্রতিবছর নদী ভাঙনের মির্জাচরে কয়েকটি গ্রামের অর্ধশত পরিবারের ভিটামাটি ও বহু ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। মেঘনার ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে, স্কুল, মসজিদ ও বাজার। রায়পুরার আরেক ইউনিয়ন চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নের মহেষভেড় গ্রামেও দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ত্রিশ বছরে রায়পুরার পাঁচটি ইউনিয়ন চাঁনপুর, শ্রীনগর, মির্জাচর, চরমধুয়া ও চরসুবুদ্ধির প্রায় দেড় হাজার পরিবার ভিটামাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছেন। নতুন করে ওই পাঁচ ইউনিয়নে কয়েক হাজার মানুষের দিন কাটছে মেঘনার ভাঙন আতঙ্কে। অনেক পরিবার আগে থেকেই তাদের টিনের ঘর, আসবাপত্র, গরু-ছাগল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

ভোক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, প্রাইমারি স্কুল, আত্মীয়-স্বজন ও খোলা আকাশের নিচে কিছু পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। বাকিরা পরিবার নিয়ে শহরের উদ্দেশে গ্রাম ছেড়েছে। করোনা মহামারী সময়ে গৃহহীন এই মানুষগুলো জানেন না আগামীকাল তাদের মুখে দুমুঠো ভাত জুটবে কিনা।

ইমামদিরকান্দি গ্রামের বৃদ্ধা সুখিনা খাতুন জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর একটি দুচালা টিনের ঘরে থাকছিলেন। গতরাতের ভাঙনে সেই বসতভিটাও বিলীন হয়ে গেছে। তার গন্তব্য এখন শহরে থাকা দুই ছেলের ভাড়াবাসায়। একই গ্রামের জাহের আলী জানেন না স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবেন।

বীরচরমধুয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য জামেদুল হক জানায়, চোখের সামনে এক শ বছরে বসতি বিলীন হয়ে গেছে। চারদিনের টানা ভাঙনে ২০টি বসতভিটা, গাছপালা নদীগর্ভে চলে গেছে। পলাশতলী গ্রামের ভোক্তভোগীদের অভিযোগ, এখনো ঘটনাস্থলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসেননি। সরকারি ত্রাণও পাননি তারা। জরুরি ভিত্তিতে তাদের খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন।

তারা আরো জানান, গ্রামটির ৮০ ভাগ মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি অংশটুকু ভাঙনের আশংঙ্কা করছেন তারা। ওই সময় গ্রামরক্ষায় বাঁধ নির্মাণসহ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভুগীরা।

কালিকাপুরে বাসিন্দা ইয়াছিন হোসাইন ফুল মিয়া বলেন, চাঁনপুরে নদী ভাঙনের জন্য কিছু অসাধু বালু ব্যবসায়ী দায়ী। ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই বাড়ছে নদী ভাঙন। এতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। ওই সময় বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার অর্ধশত পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণকালে চাঁনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোমেন সরকার বলেন, ক্রমাগত ভাঙনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। তিন দশকে চাঁনপুরের পাঁচ হাজার একর জমি মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজারো পরিবার। মেঘনার ওপারে রায়পুরার সীমানায় জেগে উঠেছে বিশাল চর। ইমামদিরকান্দি বহু বাসিন্দা সেখানে বসতি স্থাপন করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়ির সাথে নরসিংদীর আন্তজেলা সীমানা নির্ধারণ হলে ওই চরের বাসিন্দারা বসবাসের বৈধতা পাবেন।

তিনি আরো বলেন, চরের খাসজমি বন্দোবস্তর পেলে স্বাভাবি জীবনে ফিরতে পারবে তারা। আড়াই শ নদী ভাঙন পরিবারের ঘর চেয়ে আবেদন করেছি। ঘরগুলো পেলে মাথা খোঁজার ঠাঁই পাবেন তারা। কালের কন্ঠ

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন