মিয়ানমারে চলছে জান্তার বর্বরতা : পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তায় উদ্বেগ

উসামা মাহমুদ

1
1104
মিয়ানমারে চলছে জান্তার বর্বরতা : পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তায় উদ্বেগ

মিয়ানমারের কাইয়া রাজ্যে নারী ও শিশুসহ ৩০ জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দিয়েছে দেশটির জান্তা সরকার নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনী। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা কারেননি হিউম্যান রাইটস গ্রুপের সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, সামরিক বাহিনীর জ্বালিয়ে দেয়া ট্রাকের মধ্যে পুড়ে যাওয়া নারী শিশুদের লাশ পড়ে রয়েছে।
বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জুলাই মাসে বেসামরিক লোকদের উপর একের পর এক গণহত্যা চালিয়েছে, এসব ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা বলেছেন যে সৈন্যরা, গ্রামবাসীদের জড়ো করে তাদের মধ্য থেকে পুরুষদের আলাদা করে হত্যা করে। এদের মধ্যে অনেকের বয়স মাত্র ১৭ বছরও ছিল।

ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং ছবি দেখে জানা যায় যে, নিহতদের বেশিরভাগকে প্রথমে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং পরে অগভীর কবরে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল।
জি বিন ডুইন গ্রামে জুলাইয়ের শেষের দিকে ১২টি বিকৃত মৃতদেহ অগভীর গণকবরে মাটি চাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ছোট মৃতদেহ রয়েছে যেটি সম্ভবত একটি শিশুর এবং একটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মৃতদেহও ছিল।
সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে বিদেশী সাংবাদিকদের মিয়ানমারে রিপোর্টিং করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। যার ফলে অন-দ্য গ্রাউন্ড রিপোর্টিং বা মাঠ পর্যায়ে থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দূর্গম পাহাড়ে প্রশিক্ষণ:
সেনা সরকার উৎখাতে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমারের অনেক তরুণ-তরুণী। থাইল্যান্ড সীমান্ত গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সামরিক ঘাঁটি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এমন তথ্য উঠেছে।
প্রতিদিনই ট্রাকে করে দুর্গম পথ মারিয়ে গভীর জঙ্গলে গিয়ে যোগ দিচ্ছেন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত কারেন রাজ্যের দূর্গম পাহাড়ে অস্ত্র, গোলা, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন সামরিক কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
তারা বলছেন, সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণে বাস্তচ্যুত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে হাতে তুলে নেয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো সুযোগ ছিল না। বাধ্য হয়ে আমরা আজ বনজঙ্গলে বাস করছি।

মিয়ানমারের সাথে ৫টি দেশের সীমান্ত রয়েছে। দেশগুলো হলঃ বাংলাদেশ, ভারত, চীন , লাওস এবং থাইল্যান্ড। মিয়ানমারের আন্তঃ রাজনৈতিক সংকটের কারণে এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট সীমান্ত নিরাপত্তা ,উগ্র-সন্ত্রাসবাদের তৎপরতা, শরণার্থী সমস্যার সমাধান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মায়ানমারের প্রভাব ভারতে:

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে কয়েক হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করছে। মিজোরাম, মনিপুর ও নাগাল্যান্ডে বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ অবস্থান করছে। আগামী কয়েক মাসে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সবচেয়ে বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে মিজোরামে।
মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। সীমান্তে দিল্লির শাসনবিরোধী কমপক্ষে দুই ডজন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আছে। এই গোষ্ঠীগুলো সীমান্তের উভয় পারে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এতে নাগা ও মনিপুরের বিদ্রোহীরা টিকে থাকার রসদ পাবে। মিয়ানমারের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সীমান্ত অতিক্রম ও সীমান্তে সংঘর্ষ তিন দশকের মধ্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মিয়ানমারে ভারতের ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বন্দর ও মহাসড়ক প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশের উদ্বেগ:
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের বর্বরোচিত জেনোসাইডের শিকার হয়ে প্রায় ১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং কক্সবাজার সীমান্তের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। বিগত চার বছরে বাংলাদেশ থেকে একজন রোহিঙ্গাকেও মায়ানমার ফেরত নেয়নি। গত ০১ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের’ বিষয়টি যতই দীর্ঘ হবে, ততই বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়টি ক্রমেই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে, বাংলাদেশের আপত্তি উপেক্ষা করে সীমান্তে সেনা মোতায়ন করেছে মিয়ানমার। আর যে তিনটি পয়েন্টে তাদের দেখা গেছে সেগুলো হল কা নিউন ছুয়া, মিন গালারগি ও গার খুইয়া।
এছাড়াও বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ শিকারকালে ৪টি ট্রলার সহ ২২ জন বাংলাদেশী জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে উগ্র বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের দেশ মিয়ানমার।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তায় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট যতই দীর্ঘায়িত হবে, ততই আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমস্যার বিষয়টি আরও ঘনীভূত হতে পারে!

তথ্যসূত্র:
——
১। মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি
https://tinyurl.com/yc4a3ern
২। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত: মিয়ানমারের সেনাদের টহল বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের উদ্বেগ
https://tinyurl.com/5faaw9ua
৩। মিয়ানমার: বেসমারকি জনগণকে নির্যাতন করে গণহত্যা হয়েছে, বলছে বিবিসি অনুসন্ধান
https://www.bbc.com/bengali/news-59723187
৪। ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে মিয়ানমারের প্রতিরোধ যোদ্ধারা
https://tinyurl.com/mryby3df
৫। বাংলাদেশের আপত্তি উপেক্ষা করে সীমান্তে সেনা মোতায়ন মিয়ানমারের
https://youtu.be/wPfXxhLk8og

১টি মন্তব্য

  1. ধন্যবাদ মিয়ানমার সেনাকে!
    যার সেনা শাসনের বিরুদ্ধাচার করবে তাদেরকে পুড়িয়ে মারাই শ্রেয়।
    ডেমোক্রেট ও বিদ্রোহীদের হাড় মাংস থেকে আলাদা করে পেলতে হবে। ওদের নারীদেরকে ধর্ষণ কর, শিশুদেরকে জবাই কর

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন