মুসলিম হত্যাকারী গো-রক্ষক মনু মানেসরের নেপথ্যে কারা?

0
853
সুবিধামত ফন্ট ছোট বড় করুনঃ

ভারতের হরিয়ানার নুহ এলাকায় ওয়ারিস নামে একজন মুসলিম ব্যক্তিকে খুন করার পরে আলোচনায় উঠে আসে এক কুখ্যাত সন্ত্রাসী মনু মানেসর নাম। ওয়ারিসের পরিবার জানায় ২৮ জানুয়ারী ভোরে ওয়ারিস এবং তার সহযোগী নাফিস ও শওকিনকে গরু চোরাচালানের সন্দেহে ধাওয়া করে মনু মানেসর দল। পরে তাদের আটক করে নির্মমভাবে মারধর করে। এতে ওয়ারিস গুরুতর আহত হয়ে মারা যান।

ওয়ারিস খুনের একমাসের মধ্যেই গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলায় মনু মানেসর নেতৃত্বে জুনায়েদ ও নাছির নামের দুইজন মুসলিমকে নৃশংসভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে খুন করা হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, নিহতদেরকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অপহরণ করে বজরং দলের সদস্যরা। এরপর তাঁদের খোঁজ মিলে ১৭ ফেব্রুয়ারি। তাদের গ্রাম থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে বনের মধ্যে একটি গাড়িতে তাদেরকে মৃত ঝলসানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, অপহরণের শিকার জুনায়েদ ও নাছিরকে হিন্দুদের একটি উগ্র দল নৃশংসভাবে পিটিয়ে প্রথমে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরে তাদেরকে গাড়িতে ঢুকিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে।

মনু মানেসর গত ২০২১ সালের ৪ জুলাই, হরিয়ানার পতৌদিতে হিন্দু মহাপঞ্চায়েতে মুসলিমদের উপর সহিংসতা চালানোর জন্য খোলাখুলি আহ্বান জানায়। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানানো হয় এবং উপস্থিত উগ্র হিন্দুরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। উপস্থাপক তার পরিচয় হিসাবে বলে, ‘মনু গুরুগ্রাম-রেওয়ারি-নুহ অঞ্চলে প্রায় ৫০টি গো-রক্ষক দলের নেতৃত্ব দেয়। এরা গরু রক্ষা করতে গিয়ে গুলি করতেও দ্বিধা করে না।’

এরপর একই বছর নভেম্বরে, সে গুরুগ্রামের সেক্টর ১২-তে স্লোগানের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। “হিন্দু কে গাদ্দারো কো, গোলি মারো সালো কো” (অর্থ: হিন্দু ধর্মের বিশ্বাসঘাতকদের গুলি কর)। এই মনুর গুণ্ডারাই গুরুগ্রামে শুক্রবারে মুসলিমদের নামাজে বাঁধা দিয়েছিল ও হামলা চালিয়ে ছিল।

সে তার ভাষণে বলেছে, “ভাইরা, এখানে একটা সমাধান হওয়া উচিত। যারা লাভ জিহাদ করে, তাদের তালিকা দাও। আমি এবং আমার দল তাদের প্রকাশ্যে পেটাবো, হত্যা করবো। আমরা পুলিশ আর মামলাকে ভয় পাই না। কারণ আমাদের বড় ভাই এখানে বসে আছে। আমি তার নাম বলতে চাই না। সে আমাদের পিছনে থাকবে। যারা ‘লাভ জিহাদে’ লিপ্ত হবে, যারা আমাদের মেয়েদের টিজ করবে, আমি — আমাদের দল এবং আমাদের তরুণ সহযোগীরা তাদের শেষ করে দিব। তাই যারা আমাদের ধর্মের দিকে আঙুল তুলবে তাদের সাথে আপোষ নেই। একমাত্র সমাধান হল তাদেরকে মারতে হবে। এছাড়া আর কোন সমাধান নেই। এগুলো ভাষণ-বক্তৃতা দিয়ে সমাধান হবে না। তাদেরকে মারতে হবে। জয় শ্রী রাম!”

কে এই মনু মানেসর?

পলিটেকনিক কলেজের ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট ধারী মানেসরের বাসিন্দা মনু (২৮) নিজেকে ‘গো-রক্ষক’ এবং সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। ২০১১ সালে মানেসর জেলায় বজরং দলের জেলা সংযোজক হিসেবে সে পরিচিতি লাভ করে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সে বলেছে, ‘আমি গরুদের নিয়েই বেড়ে উঠেছি। গোমাতার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। আর, ধর্ম রক্ষা করা আমার কাজ। এটা আমার কাছে একটা বিশ্বাসের ব্যাপার। এ কারণে গরুর ওপর অত্যাচার দেখে আমি তাদের উদ্ধারের সংকল্প নিই। আর গরু পাচার বন্ধ করার চেষ্টা করছি। মেওয়াত বা নুহ এবং অন্যান্য জায়গা থেকে আমরা প্রায়ই গরু পাচারের অভিযোগ পাই। সেসব বন্ধ করার চেষ্টা করি।’

মনু বর্তমানে মানেসর জেলা গো-রক্ষক বাহিনীর প্রধান। পাশাপাশি, মানেসর জেলা প্রশাসনের অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের সদস্য। এছাড়াও মনু বজরং দলের জেলা সমন্বয়কারী। ২০১৩ সালে কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন সময়, সে বজরং দলে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে কেন বজরং দলে যোগ দিতে চায় – এই প্রশ্নের উত্তরে মনু আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিয়েছিল, “দেশ কা বল, বজরং দল”।

প্রায়শই, মনু এবং তার দল গবাদি পশু বহনকারী সন্দেহভাজন গাড়িকে তাড়া করার প্রক্রিয়া লাইভ-স্ট্রিম করে। ‘পাচারকারীদের’ ধরার পরে, মনু এবং তার দল উদ্ধারকৃত গবাদি পশু এবং অভিযুক্তদের মারধরের ছবি তাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘বিজয়’ হিসাবে পোস্ট করে। তাদের দলের সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমন ছবিও রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। অথচ ভারতীয় প্রশাসন এমন উগ্রদের বিরুদ্ধেও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

গো-রক্ষার নামে হামলা:

২০১৬ সালের জুন মাসে, গরুর গোশত পরিবহন করার অভিযোগ এনে দুইজন মুসলিমকে গোবর, গো-মূত্র খেতে বাধ্য করেছিল গো-রক্ষক দল। মনু মানেসরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। মারধরের কারণে মুসলিম ব্যক্তিদের মুখ রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল, এবং ফুলে গিয়েছিল।

২০২২ সালের এপ্রিলে, সাংবাদিক আলিশান জাফরি মনু মানেসরের ইনস্টাগ্রাম আইডি থেকে একটি ভিডিওর স্ক্রিন রেকর্ডিং টুইট করেছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন হিন্দু একজন স্ক্র্যাপ বাছাইকারীকে আক্রমণ করছে। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা আছে, “এরা সেই স্ক্র্যাপ-পিকার যারা আমাদের সৈন্য এবং হিন্দুত্ব সমর্থকদের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারে।”

হিন্দুত্বওয়াচ এর টুইটার পেজ মনু মানেসরের নেতৃত্বে বজরং দলের সদস্যদের একটি ভিডিও টুইট করেছে। ভিডিওতে কিছু সন্ত্রাসীকে বন্দুক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সেই টুইট অনুসারে, ২০ বছর বয়সী স্থানীয় একজন মুসলিম বাসিন্দা মহিন খান এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন হিন্দু সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলি মহিনের পেটে লাগে।

এছাড়াও মনু মানেসরের ফেসবুক পেজে ‘গরু পাচারকারী’দের হাই-স্পিডে ধাওয়া করার বেশ কিছু ভিডিও রয়েছে। গরু পাচারের সন্দেহে গুলি চালানোরও বেশ কয়েকটি ভিডিও রয়েছে। ভিডিওতে নোংরা গালাগালিও শোনা যায়।

গুরুগ্রাম এবং মানেসরের অন্তত পাঁচজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলেছে অল্ট নিউজ। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, কথিত গরু চোরাচালানকারীদের যানবাহনে গুলি করে মুসলিমদের খুন করার জন্য মনু মানসেরের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে – এমন প্রশ্ন করা হলে, তারা হয় কল সংযোগ কেটে দেয় বা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে।

৫ মে, ২০২২-এ আপলোড করা একটি ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, নূহের ফিরোজপুর ঝিরকা এলাকার শেখপুরের সাহেব হুসেন নামে এক যুবকের বাবা বলেন, তার ছেলে মনু মানেসরের দল দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিল। মুসলিমদের মারধরের অনেক ভিডিও আছে এবং অভিযোগে মনু মানেসরের নাম উল্লেখ করা সত্ত্বেও, পুলিশ মনুর নাম বাদ দিয়ে কিছু অজানা ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে।

মনু মানেসরের ইউটিউব চ্যানেল:

গো-রক্ষার নামে মুসলিম হত্যাকারী এই হিন্দুর ‘মনু মানেসর বজরং দল’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে, যার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা দু’লক্ষেরও বেশি। ইতোমধ্যে সিলভার প্লে বাটনও পেয়েছে এই চ্যানেল। মনু ও তাঁর সহযোগীরা প্রায়ই গো-রক্ষা নিয়ে ছবি পোস্ট করে। সেই সব পোস্টে দেখানো হয়, তাঁরা কীভাবে গরু কারবারীদের আটক করছে। পাশাপাশি, তারা উদ্ধার করা গবাদি পশু এবং আটকদের আহত ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে থাকে।

মুসলিমদের হত্যা করে, মারধর করে হিন্দু সমর্থকদের কাছে মনু মানেসর এক নায়ক বনে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে হাজার হাজার হিন্দুরা গভীরভাবে অনুসরণ করে। ইউটিউবে তার কিছু ভিডিও প্রায় এক কোটি বার ভিউ হয়েছে।

মনুর পেছনে কারা:

ভারতের বেশিরভাগ আধা-শহুরে এলাকার গো-রক্ষক ও উগ্র হিন্দু সংগঠনগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দু রাজনীতিবিদ ও পুলিশ দ্বারা সমর্থিত। মনুও তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু পুলিশের সাথেই তার ঘনিষ্ঠতা এমন নয়, বরং জেলা সিভিল ডিফেন্স টিম এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাকে এ ধরনের কাজের জন্য পুরস্কৃত করেছে।

স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে গণবিবাহ পর্যন্ত, অনেক অনুষ্ঠানেই সম্মানিত অতিথি হিসাবে মনুর উপস্থিতি প্রায়শই দেখা যায়। গলায় মালা, স্মারক এবং জাফরান পাগড়ি দিয়ে তাকে সম্মান জানাতে দেখা যায়।

একটি ছবিতে মনুকে পুলিশ কর্মকর্তা এবং আমলাদের সাথে দেখা গেছে। পুলিশ সুপার রাজেশ দুগ্গাল, অতিরিক্ত এসপি বিপিন শর্মা, আইপিএস অফিসার ভারতী অরোরা, আইপিএস অফিসার নাজনীন ভাসিন এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসারদের সাথেও তার ছবি আছে৷ এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছবিতে তাকে পুরস্কার ও স্মারক গ্রহণ করতে দেখা গেছে।

মুসলিমদের উপর হামলাকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় হিন্দু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাকে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে। তাদের সাথেও তার অনেক ছবি দেখা গেছে। এই তালিকায় রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী, প্রয়াত অরুণ জেটলি এবং হিন্দু গুরু বাবা রামদেব।

বিজেপি-পন্থী প্রচার চ্যানেল সুদর্শন নিউজের প্রধান সম্পাদক সুরেশ চাভাঙ্কের সাথেও তার ছবি আছে। মজার বিষয় হল, সুদর্শন নিউজ মনু মানেসরের ‘সতর্কতা’ নামে মুসলিমদের প্রতি একটি হুমকি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।

আরো ভয়ংকর বিষয় হলো, একের পর এক মুসলিমদের খুনের সাথে জড়িত থাকার কারণে মুসলিমরা তার বিচারের জন্য বিক্ষোভ করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন তার কোর বিচার করেনি। উল্টো নিহত মুসলিম ব্যক্তিদের আত্মীয় স্বজনদেরকে বিশৃংখলা করার মিথ্যে অভিযোগে হয়রানি করেছে। শুধু তাই নয়, খুনি মনু মানেসর সমর্থনে হিন্দুরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে।

মোটকথা, হিন্দুত্ববাদী নেতা ও ধর্মগুরুরা তাকে ও তার দলকে মুসলিম বিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানো ও হামলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রত্যক্ষ ও প্ররোক্ষভাবে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ফলে সে নিজেই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে, সে কোন ‘প্রশাসন কিংবা মামলার ভয়’ করে না।



প্রতিবেদক : উসামা মাহমুদ



তথ্যসূত্র:
1. Monu Manesar: A story of violent vigilantism in the name of ‘gau-raksha’, armed with state support
https://tinyurl.com/3pnuxyta
2. Bhiwani killings: While Bajrang Dal denies role, at least two accused have strong ties with the outfit
https://tinyurl.com/bdek6xxt
3. Two Muslim men burnt to death in Haryana, “Bajrang Dal killed them,” says family ( Maktoob Media )
https://tinyurl.com/4ddfatr5
4. video link:
https://tinyurl.com/2netfuya

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য করুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

পূর্ববর্তী নিবন্ধফটো রিপোর্ট || ঔপনিবেশিক ইহুদি হামলায় ধ্বংসস্তুপ ফিলিস্তিন
পরবর্তী নিবন্ধড্রাগ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে শাবাবের নতুন অভিযানে নিহত ২, ২টি গুদাম ধ্বংস